23/07/2026
অপূর্ণ চাওয়া
Written by Tanvir Ahmed
---
ভালোবাসার গল্পের শুরুটা সব সময় খুব সাধারণ হয়। কিন্তু সেই সাধারণ গল্পই কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ স্মৃতি হয়ে থাকে।
তাহসান—২২ বছর বয়সী, রাজশাহী কলেজের একজন শিক্ষার্থী। শান্ত, ভদ্র, আত্মবিশ্বাসী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন তরুণ। অযথা কারও মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা করা তার স্বভাব ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার লেখা, চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিত্বের কারণে অনেক মেয়েই তাকে পছন্দ করত। ইনবক্সে নিয়মিত নক আসত, কিন্তু এসব তার কাছে ছিল একেবারেই সাধারণ বিষয়।
অন্যদিকে তৃষা—১৮ বছর বয়সী, দশম শ্রেণির ছাত্রী। প্রাণবন্ত হলেও ভেতরে ভেতরে অনেকটা একাকী। নিজের অনুভূতিগুলো সহজে কাউকে বলতে পারত না।
ফেসবুকেই প্রথম পরিচয় হয় তাহসান ও তৃষার।
শুরুর দিকে তাদের কথাবার্তা খুব একটা হতো না। তৃষা সব সময় তাহসানকে "তুই" বলেই সম্বোধন করত। বয়সে বড় হলেও তাহসান কখনো এতে বিরক্ত হতো না। সে এটাকে বন্ধুত্বের স্বাভাবিক প্রকাশ বলেই মনে করত।
দিন যেতে লাগল। ধীরে ধীরে তৃষা বুঝতে পারল, তাহসানের সঙ্গে কথা বললে তার মনটা অদ্ভুত শান্ত হয়ে যায়। জীবনের নানা বিষয় নিয়ে তাহসানের ভাবনা, পরিপাটি করে কথা বলার ধরন এবং সমস্যাকে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর অভ্যাস তৃষাকে মুগ্ধ করত।
একদিন তৃষা জিজ্ঞেস করল,
— "তুই এত সুন্দর করে কথা বলিস কীভাবে? আমিও কি স্মার্ট আর ভালোভাবে কথা বলতে শিখতে পারব?"
তাহসান হেসে বলেছিল,
— "স্মার্ট হওয়া মানে শুধু ভালো পোশাক বা ইংরেজি বলা নয়। মানুষের প্রতি সম্মান, আত্মবিশ্বাস আর নিজের চিন্তাগুলো গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারাই আসল স্মার্টনেস।"
সেদিন থেকে তৃষা ছোট ছোট বিষয়েও তাহসানের পরামর্শ নিতে শুরু করল। ক্লাসে কীভাবে সবার সঙ্গে ভদ্রভাবে মিশতে হয়, কোথায় কীভাবে নিজের ব্যক্তিত্ব ধরে রাখতে হয়, এমনকি বাজারে গিয়ে কীভাবে ভালো জিনিস চিনে কিনতে হয়—এসবও তাহসান তাকে বুঝিয়ে দিত।
তৃষা শুধু শুনেই থেমে থাকত না, বাস্তব জীবনেও সেগুলো প্রয়োগ করত। ধীরে ধীরে সে আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। ক্লাসে তার উপস্থিতি সবাই লক্ষ্য করতে শুরু করল।
এভাবেই কেটে গেল সাত মাস।
সময়টা ছিল ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের। সেই সময় তৃষার ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে যাচ্ছিল কঠিন এক অধ্যায়। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কষ্ট তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল। অনেক সময় সে নিজের অনুভূতির কথা কাউকে বলতে পারত না। তখন তাহসানই ছিল তার সবচেয়ে ভরসার মানুষ।
এক রাতে দীর্ঘ নীরবতার পর তৃষা লিখল,
— "তাহসান... একটা কথা বলব?"
— "বল।"
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না। তারপর হঠাৎ একটি মেসেজ—
— "আমি তোকে ভালোবাসি।"
তাহসান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বিষয়টি তার কাছে পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল না। গত কয়েক মাসে তৃষার কথাবার্তা, যত্ন আর অনুভূতিগুলো দেখে সে অনেকটাই বুঝতে পেরেছিল।
তৃষা আবার লিখল,
— "অনেক আগে থেকেই ভালোবাসতাম। কিন্তু বলতে ভয় লাগত। যদি বলার পর আমাদের বন্ধুত্বটাই নষ্ট হয়ে যায়?"
তাহসানের আগে কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না। চাইলে হয়তো সে সহজেই সম্পর্কে জড়াতে পারত, কিন্তু সে কখনো তাড়াহুড়ো করেনি।
অনেক ভেবে সে উত্তর দিল,
— "ঠিক আছে... তবে একটা শর্ত আছে।"
— "কী শর্ত?"
— "যেদিন সামনাসামনি দেখা হবে, সেদিন তুই নিজের হাতে একটা গোলাপ দিয়ে আমাকে প্রপোজ করবি। তারপর আমি তোর ভালোবাসা গ্রহণ করব।"
তৃষার বাড়ি চট্টগ্রামে, আর তাহসানের রাজশাহীতে। প্রায় ৫০০ কিলোমিটারের দূরত্ব।
তাহসান মজা করে বলেছিল,
— "আমি কিন্তু একদিন চট্টগ্রামে আসব। তখন আমাকে কিন্তু তোর শহরটা ঘুরিয়ে দেখাবি।"
তৃষা যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। সেই দিনটার অপেক্ষায় সে দিন গুনতে শুরু করল।
এদিকে তাহসানও বুঝতে পারছিল, তৃষার আন্তরিকতা ধীরে ধীরে তার মন ছুঁয়ে যাচ্ছে। বন্ধুত্বের সীমা পেরিয়ে অনুভূতিগুলো অন্যরকম হয়ে উঠছিল।
তৃষা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সব সময় তাহসানের পাশে থাকার চেষ্টা করত। কখনো মোবাইলে রিচার্জ করে দিত, কখনো ছোটখাটো প্রয়োজনে সাহায্য করত। অর্থের পরিমাণ বড় ছিল না, কিন্তু প্রতিটি সাহায্যের পেছনে ছিল আন্তরিক ভালোবাসা আর বিশ্বাস।
তারা তখনও জানত না—জীবন সব গল্পকে পূর্ণতা দেয় না। কিছু গল্পের নিয়তি হয় অসমাপ্ত থেকে যাওয়া। আর সেই অসমাপ্ত গল্পগুলোর নামই হয়—
"অপূর্ণ চাওয়া"
— চলবে (পর্ব ১ সমাপ্ত)