18/12/2025
আমি চরম বাস্তববাদী মানুষ। অনেক কঠিন সত্যকে হাসি মুখে মেনে নেয়ার ক্ষমতা আমার আছে।
কাজেই হাদির ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছি। ট্রাই করছি , দৈনন্দিন দরকারি কাজে মন দিতে । পারছি না।
দাঁতের ফাঁকে কাঁটা আটকে থাকলে, যেমন অনুভূতি হয়, আমি সেই ভোতা এবং অস্বস্তিকর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
সবচেয়ে বেশি মন খারাপের কারণ মিডিয়া। মিডিয়ায় হাদিকে যেভাবে দেখানো হয়েছে, সেটা ঠিক না।
হাদি কবিতা লিখতো। সীমান্ত শরীফ ছদ্মনামে। তার একটাই কবিতার বই আছে। । বইটা সে উৎসর্গ করেছিলো তার বাবাকে।
উৎসর্গপত্রে সে লিখেছিলো,
আব্বাকে,
যার ডাকে লাল হয়ে উঠে শিমুলবাগান।
ঝড়ের রাইতে আজও কানে বাজে আব্বার আজান।
যারা কবিতা একটুআধটু বোঝেন, তারা জানেন, এই লাইন দুটো কত শক্তিশালী।
হাদির এই লাইন দুটি পড়ে আমার মনে পড়ে যায় মিরপুরের কথা। আমার বাবা এই একই কাজ করতেন। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। বিজলি চমকাচ্ছে। এর মধ্যে একটি ছাতা নিয়ে তিনি বেরিয়ে যেতে ফজরের নামাজ পড়তে।
আমি যেহেতু রাত জাগতাম, ঘুমাতে যেতাম ভোরের দিকে। কাজেই আব্বুুকে কতবার আমি বাঁধা দিয়েছি। ঘরে নামাজ পড়ো। এই ঝড়ের মধ্যে তোমাকে কেন মসজিদে যেতে হবে?
আব্বুকে ফেরানো যেতো না।
আমি না ঘুমিয়ে বসে থাকতাম। আব্বু ফিরতেন অনেক পরে। নামাজ শেষ করে, কয়েক মাইল ডায়বেটিসের হাটা হেঁটে , তারপর। আমি রেগে আগুন হয়ে যেতাম।
আব্বু হাসতো।
হাদিরও খুব সম্ভবত বাবাকে নিয়ে একই ট্রমা ছিলো। নইলে ঝড়ের রাতে হাদির কানে কেন বাজবে তার আব্বার আজানের স্বর।
উইকিপিডিয়া বলছে, হাদির বাবা ছিলেন মসজিদের ইমাম। যে বা যারা উইকিপিডিয়াতে এই লাইনটা অন্তভুর্ক্ত করেছেন, তাদেরকে কৃতজ্ঞতা।
আজ থেকে দশ বছর পর, হাদির ব্যাপারে কেউ যখন জানতে চাইবে, তখন মিডিয়া আর সোশাল মিডিয়ায় আসবে, হাদি ছিলো গালিবাজ, এনার্কিস্ট, ভারতবিদ্বেষী।
কিন্তু হাদির ভেতর যে একজন কবি নজরুল বাস করতো, এটা আমরা মিডিয়ার রিপোর্ট পড়ে কখনোই জানবো না। ঢাকা শহরের চাদাবাজ মাফিয়াদের বিরুদ্ধে হাদি যে সাহস করে দাঁড়িয়েছিলো, এই খবরও কেউ কোনোদিন খুঁজে পাবে না। বার বার মৃত্যুর হুমকি পেয়েও ঢাকা শহরের বুকে একজন মেরুদণ্ড সোজা করে বক্তৃতা করতো, ঝাকড়া চুল ঝাঁকিয়ে এই শহরে তুলতো দ্রোহের আগুন, মিডিয়া কত সুনিপুনভাবে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলো।
হাদির ঘটনায় আমি ভয় পেয়েছি।
আমার এক ঘনিষ্ট বন্ধু গুম হয়েছিলো, শেখ হাসিনার আমলে। আমি রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোককে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। সেই বন্ধু গুম হবার পর, আমি প্রত্যেকের সাথে যোগাযোগ করি। এবং তারপর ভীষণ চমকে উঠি।
বাংলাদেশকে আমার সব সময় মনে হতো- এটা আমার হাতের তালু। এই দেশের পর্দার সামনে আর পর্দার পেছনের সব চরিত্র আর ঘটনা আমি জানি। সেই প্রথম আমার মনে হয়েছিলো, আমি আসলে বাংলাদেশের কিছুই জানি না।
বাংলাদেশের ভেতরে আরেকটা বাংলাদেশ আছে। এই বাংলাদেশের কে যে প্রধানমন্ত্রী, কে যে প্রেসিডেন্ট, কে যে প্রধান উপদেষ্টা, এটা কেউ জানে না।
শেখ হাসিনা পালিয়ে যাবার পর, আমার মনে হয়েছিলো, এই বাংলাদেশের ভেতরের ''সিক্রেট বাংলাদেশ'' বিলুপ্ত হয়েছে। হাদির ঘটনার পর, আমি অনেক জায়গায় টোকা দিলাম। আমার মেরুদন্ড বেয়ে ঠাণ্ডা একটা শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে। না। ভুল। বাংলাদেশের ভেতরে সেই ''সিক্রেট বাংলাদেশ'' আছে। ডার্ক ওয়েবের মতো, সেই বাংলাদেশের কিছুই আমি জানি না।
হাদিকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, এই রকম নিখুঁত আক্রমনের ঘটনা বাংলাদেশে বিরল। ক থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত পুরো পরিকল্পনা এত নিখুঁতভাবে করা হয়েছে, এটা নিয়ে যত ঘাটাঘাটি করছি, বিস্মিত হচ্ছি।
এবং শেখ হাসিনা আমলের সেই পুরনো ভয়, সেই পুরনো ভোতা অনুভূতি আবার ফিরে আসছে। আমি এটাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবছি না।
হাদির ঠিক সাপের লেজে পা দিয়েছিলো।
কাজেই হাদিকে মরতে দিয়েন না। আমি হাদির শারীরিক আয়ুর কথা বলছি না। হাদি যে আইডোলোজির কথা বলতো, যে দর্শনের কথা বলতো, যে বাংলাদেশের কথা বলতো, সেই ভাবনাগুলোকে মরতে দিয়েন না।
মিডিয়া যতই হাদিকে অন্য রঙ দেয়ার চেষ্টা করুক, আপনারা হাদিকে আরও জানা ও বোঝার চেষ্টা করেন।
আমি মনে করি না, হাদির আততায়ী একজন।
আমি মনে করি, এটা একটা জয়েন্ট ভেনচার।
একটা গ্রুপ ওয়ার্ক। এই গ্রুপে মিডিয়া থেকে মাফিয়া- সবাই আছে। আই রিপিট, ''সবাই'' আছে।
আমি এই গ্রুপের নাম দিয়েছি, শেখ হাসিনা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি।
পুনশ্চ 1: হাদির উপর একটা নিন্মমানের ডকুমেন্টারি আমরা বানিয়েছি। আমি স্বীকার করছি, মানসিক অস্থিরতা আর সাহসের অভাবে, আমি হাদির ব্যাপারে অনেক কিছু বলতে পারি নি। তবুও, যতখানি আমরা বলেছি, তার ১ শতাংশও কেউ বলছে না।
আমরা এই ডকুমেন্টারি হাদির জন্য কপিরাইট ফ্রি করে দিয়েছি। আপনারা শেয়ার করতে পারেন। ডাউনলোড করতে পারেন। যা খুশি তাই করতে পারেন। আমাদের ক্রেডিট দেবারও দরকার নেই।
সময় হলে, দেইখেন।
পুনশ্চ 2: খোদার ম্যাজিকে, হাদি যদি সুস্থ হয়ে ফিরে আসে, তাহলে আমি জানতে চাইবো, এত নাম থাকতে, হাদি কেন তার ছদ্মনাম হিসেবে ''সীমান্ত'' শব্দটাকে বেছে নিয়েছিলো।