19/11/2025
“وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ”
উপরের এই আয়াতটি মানুষকে নরম করে না; শিরদাঁড়া সোজা করে। যারা সত্যিকার অর্থে ঈমানের ভার বহন করে, তাদের জন্য এটা সান্ত্বনার বাক্য নয়—এটা শাসন।
এই আয়াতের ব্যঞ্জনা হলো: তোমরা ভেঙে পড়ার অধিকার রাখো না। তোমরা দুঃখে গুঁড়িয়ে যাওয়ার অনুমতি পাও না। কারণ তোমরা ঈমানদার। ঈমানদার মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, ক্ষত থাকে—কিন্তু অপমান থাকে না।
ঈমানদারের মুখে পরাজয়ের ভাষা মানানসই নয়। তার দৃষ্টি পৃথিবীর দিকে হলেও হৃদয় ওঠে আসমানের দিকে। যার রব আসমানের আরশে, তার মনে হীনতার জায়গা নেই।
মানুষ আজ যে সমস্যায় ডুবে আছে, তা কোনো নতুন সমস্যা নয়। বরং যুগ থেকে যুগান্তরের পুনরাবৃত্তি। মানুষ ভাবে, তার দুরবস্থা শুধু তারই জীবনে অনন্য। অথচ সত্য হলো, প্রত্যেক যুগেই মানুষ দুঃখে দাঁড়িয়েছে, ভেঙেছে, আবার দাঁড়িয়েছে।
আল্লাহ তাদের বলেছেন—“হীন হতে নেই।” পৃথিবীর কোনো শক্তিই ঈমানদারকে স্থায়ীভাবে ভাঙতে পারে না। এই কথা শুধু ঝালমুড়ির মতো শব্দ নয়, এর গভীরে আছে বাস্তবতা। মানুষের জীবন যতই কঠিন হোক, ঈমান তাকে পাহাড়ের মতো স্থির করে।
আজ তুমি যে কষ্টে ভেঙে যাচ্ছ, সেই কষ্টের চেহারা হয়তো রোজগারের অনিশ্চয়তা, সংসারের চাপ, নিজের ভিতরের ভাঙচুর, মানুষের অবহেলা, দুনিয়ার নির্দয়তা। সমাজের কাছে তুমি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাও, মানুষ তোমাকে গোনায় ধরে না। এমনকি যে মানুষকে তুমি আঁকড়ে ধরেছ, তার কাছেও তুমি অনেক সময় বোঝা। এর ভেতরেই শয়তান তোমার কানে ফিসফিস করে— “তোমার কোনো দাম নেই।”
অথচ আল্লাহ বলেন— “তোমরাই উচ্চ।” এটি কোনো আশ্বাস নয়; এটি দায়বদ্ধতার ঘোষণা।
মুমিন মানে শুধু নামাজ পড়া নয়। মুমিন মানে সে মানুষ—যার হৃদয় আল্লাহর সামনে নতি স্বীকার করে, কিন্তু দুনিয়ার সামনে নতি স্বীকার করে না। যে মানুষ রাতের অন্ধকারে চোখ ভিজিয়ে সকালে মানুষের সামনে দৃঢ় হয়ে দাঁড়ায়। যার কান্না লুকানো, কিন্তু যার ঈমান প্রকাশ্য। যে মানুষ নিজের ব্যর্থতাকে তোয়াক্কা না করে আবার উঠে দাঁড়ায়। কেননা সে জানে—অসফলতা পরীক্ষা, কিন্তু পরাজয় বেছে নেওয়া দুর্বলতার কাজ।
একটা ঘটনা মনে করো—বদরের ময়দানে মুসলিম বাহিনী সংখ্যায় অল্প। শক্তিতে অল্প। বাহিনীর হাতে যথেষ্ট অস্ত্র নেই। পরিস্থিতি এতই কঠিন যে, দুনিয়ার ভাষায় বললে—এটা অসম যুদ্ধ। কিন্তু আল্লাহর ভাষায় অসম নয়; কারণ সেখানে ছিল ঈমান। যখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং অস্ত্রের চকচকে বর্ম কাজ করে না, তখন ঈমান—মানুষকে এমন মর্যাদায় নিয়ে যায়, যা পৃথিবীর লজিক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আবার ওহুদের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আল্লাহ্ মুমিনদের উদ্দেশ্যে এই আয়াতটি নাযিল করেন: আল্লাহ্ তাদের শেখালেন: “তোমরা দুর্বল নও।”
এই আয়াতটি নাজিল হয়েছিল ওহুদের যুদ্ধের পরে। কারণ মুসলমানেরা তখন ভাবছিল— এতো ক্ষয়ক্ষতি, এতো কষ্ট, তাহলে কি আমরা পিছিয়ে পড়লাম? আল্লাহ তাদের বললেন— “না, তোমরাই উঁচুতে।” কারণ উচ্চতা সংখ্যায় নয়, অবস্থানে। ঈমানদারের অবস্থান পৃথিবীর উপরে নয়—দুনিয়ার মূল্যায়নের উপরে।
আজকের মানুষ ভুলে গেছে—কষ্ট তাকে ছোট করে না, বরং চোখ খুলিয়ে দেয়। যারা পথ হারিয়ে বসে থাকে, তারা শুধু নিজেদের দুঃখকে বড় করে দেখে। অথচ আল্লাহ মানুষের গায়ে এমন শক্তি দিয়েছেন—যা দিয়ে মানুষ পাহাড় ভেঙে পথ করে ফেলতে পারে।
সমস্যা হলো—মানুষ তার হৃদয়ের শক্তি জানে না। সে জানে শুধু দুনিয়ার ওজন; জানে না ঈমানের ওজন। যখন ঈমান হৃদয়ের ভেতর ভারী হয়, তখন কোনো সমস্যা তোমাকে মাটিতে ঠেলে রাখতে পারে না।
তুমি হয়তো ভাবছ, “আমার ব্যথা কেউ বোঝে না।” সত্যি কথা হলো—আল্লাহ ছাড়া কেউ কখনো বুঝবেও না। কারণ মানুষ সহানুভূতি দেখাতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের ভাঙচুর বোঝার ক্ষমতা নেই।
মানুষের মন কতটা দুর্বল—একদিনের প্রশংসায় উঁচু হয়, আরেকদিনের অবহেলায় ভেঙে পড়ে। অথচ আল্লাহর কাছে তোমার মর্যাদা মানুষের চোখে তোমার অবস্থানের ওপর নয়; তোমার হৃদয়ের স্থিরতার ওপর। যতক্ষণ তুমি আল্লাহর প্রতি আস্থায় দাঁড়িয়ে আছ—ততক্ষণ তোমাকে ভাঙার শক্তি কারো নেই।
আজ অনেক তরুণ আছে—যারা দিশেহারা। চাকরি নেই, জীবনে স্থিরতা নেই, ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সমাজ তাদের অবজ্ঞা করে, পরিবারও বোঝে না। তারা নিজেদের চোখে নিজেদের ছোট করে দেখে। অথচ আল্লাহ বলেন—“তোমরাই উচ্চ।”
এই উচ্চতার মানে হচ্ছে—যদি তুমি সত্যিকারের ঈমানদার হও, তবে তোমার ভবিষ্যৎ অন্যের হাতে নয়; আল্লাহর হাতে। যে মানুষ রিজিকের মালিকের ওপর ভরসা করে, সে রিজিককে ভয় পায় কেন? যে মানুষ ভাগ্যের লেখকের ওপর নির্ভর করে, সে ব্যর্থতাকে ভয় পায় কেন?
মানুষের ভেতরে আজ ভয় গেঁথে গেছে। ভবিষ্যতের ভয়, মানুষের কথার ভয়, সমাজের হাসাহাসির ভয়। অথচ ভয় মুমিনের চরিত্র নয়। মুমিন যে ভয় করে—সে শুধু আল্লাহকে। আর যার ভয় আল্লাহ, তাকে কেউ ভয় দেখাতে পারে না। যে ভরসা করে দুনিয়ার ওপর—দুনিয়া তাকে ধোকা দেয়। আর যে ভরসা করে রবের ওপর—রব তাকে রক্ষা করে, কখনো অদৃশ্যভাবে, কখনো দেরিতে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।
অতীতের মানুষের দিকে তাকাও। নবী ইউনুস (আ.) মাছের পেটে বন্দি। পুরো দুনিয়ার অন্ধকার তাকে গ্রাস করেছে—সমুদ্রের অন্ধকার, রাতের অন্ধকার, মাছের পেটের অন্ধকার। তিন স্তরের অন্ধকারে থেকেও তিনি ভেঙে পড়েননি।
তিনি বলেছেন—“লা ইলাহা ইল্লা আনতা, সুবহানাকা, ইন্নী কুনতু মিনাজ্জালিমীন।” অর্থাৎ—“আমি দোষ করেছি, তুমি মহাপবিত্র।”
এই দোয়া অন্ধকার ভেঙে আলো এনেছে। তখন আল্লাহ তাকে বাঁচালেন। এই ঘটনা দেখায়—কষ্ট মানুষকে শেষ করে না; কষ্ট মানুষকে আল্লাহর দিকে ধাক্কা দেয়। যে আল্লাহকে আঁকড়ে ধরে, তাকে অন্ধকার গ্রাস করতে পারে না।
আজ মানুষ নিজের অবস্থাকে এত বড় করে দেখে যে, আল্লাহর শক্তিকে ছোট মনে হয়। দুনিয়ার সমস্যাকে বিশাল মনে করে, আল্লাহর ক্ষমতাকে ক্ষুদ্র মনে করে। ভুল এখানেই। তুমি হয়তো ক্লান্ত, হয়তো দুঃখে ডুবে আছো—কিন্তু তুমি শেষ হয়ে যাওনি। যতক্ষণ তোমার বুকের ভেতর ঈমান আছে, ততক্ষণ আল্লাহ তোমাকে উঁচু রাখবেন। মানুষ হয়তো চিনবে না, মানুষ হয়তো তোমাকে বলে—“তুমি কিছুই না।” কিন্তু আল্লাহ বলেন—“তুমি উচ্চ।”
কী অদ্ভুত! তুমি নিজেকে তুচ্ছ মনে করছ, অথচ আসমানের মালিক তোমাকে বলছেন—“তুমি বিজয়ী হবে।” বিজয় মানে শুধু যুদ্ধ জয় নয়। বিজয় মানে—নিজের নফসকে জয় করা। হতাশাকে জয় করা। পাপের দিকে ধাবিত হওয়ার টানকে জয় করা। দুঃখের জোয়ারে ভেসে না গিয়ে নিজেকে টেনে তোলা। সমাজের অবজ্ঞা সহ্য করে নিজের পথ না ছাড়ার শক্তি। সত্য ও ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো। বেপরোয়া দুনিয়ার ভীড়ে ঈমানকে ধরে রাখা—এটাই সত্যিকারের বিজয়।
আজ তুমি যে দুঃখের ভেতর আছো, তা হয়তো তোমাকে আল্লাহর দিকে ডাকছে। হয়তো তোমার জীবনে আজ এত ধাক্কা এসেছে—কারণ আল্লাহ তোমাকে এমন জায়গায় নিতে চান, যেটা তুমি কল্পনাও করোনি। অনেক সময় আল্লাহ মানুষের জীবন ভেঙে দেন—তার অহং ভেঙে দেন, তার স্বপ্ন ভেঙে দেন, তার নির্ভরতার জায়গা ভেঙে দেন—যাতে মানুষ শুধু তাঁর ওপর নির্ভর করতে শেখে। যে আল্লাহকে ছাড়া কিছু দেখতে পায় না, আল্লাহ তাকে এমন জায়গায় তুলে দেন—যেখানে মানুষের হাত পৌঁছায় না।
তুমি হয়তো আজ ভাঙা, ক্লান্ত, হতাশ। কিন্তু তোমার ভেতর এমন শক্তি আছে—যা দিয়ে তুমি আবার দাঁড়াতে পারবে। তোমার হৃদয়ে ঈমান আছে—যা দুনিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এই ঈমানই তোমাকে নিচে পড়তে দেবে না। এটি তোমাকে তিক্ত অভিজ্ঞতার সাগর থেকে তুলে আনবে। এটি তোমাকে মানুষদের অবজ্ঞা ভুলিয়ে দেবে। এটি তোমাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেবে—আর আল্লাহ যখন কাউকে দিকে নেন, তখন পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ থাকলেও একটিমাত্র দরজা খুলে যায়।
শেষ কথা—দুঃখে ভেঙে পড়ো না। হতাশায় আত্মসমর্পণ করো না। মানুষের কথায় মন খারাপ করো না। আল্লাহর ওয়াদা সত্য। তিনি বলেছেন—“তোমরাই উচ্চ, যদি তোমরা মুমিন হও।”
এ বাক্য আজও ততটাই জীবন্ত, যতটা বদরের ময়দানে ছিল। তুমি শুধু নিজের হৃদয়কে জিজ্ঞেস করো—তোমার ঈমান কি সত্য?
যদি সত্য হয়—তবে তোমাকে কেউ হারাতে পারবে না। তোমার দুঃখ তোমাকে কবর দিতে পারবে না। তোমার কষ্ট তোমাকে থামাতে পারবে না। তোমার ভাঙচুর তোমাকে শেষ করতে পারবে না।
কারণ আল্লাহর কাছে তুমি হার মানোনি—এইটাই তোমার সবচেয়ে বড় বিজয়।
[তুমিই উচ্চ, যদি তুমি মুমিন হও]
লেখা: Syed Mucksit Ahmed