10/05/2026
গল্প: কালো ছায়ার ডাকে
লেখিকা: সুমাইয়া সরকার
চন্দ্রপুর গ্রামের নাম শুনলেই মানুষ এখন আর আগের মতো শান্তি ভাবে না। একসময় যে গ্রামটা ছিল ধানক্ষেত আর নদীর জন্য পরিচিত, এখন সেটা পরিচিত একটাই কারণে—বটগাছটা।
গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বটগাছটা এত পুরোনো যে গ্রামের কেউ তার বয়স জানে না। শেকড়গুলো মাটির ওপর উঠে এসে চারদিকে ছড়িয়ে আছে, যেন কেউ ইচ্ছে করে মাটির নিচ থেকে কিছু ধরে রেখেছে।
বড়রা ছোটদের সবসময় বলত—“ওই গাছটার দিকে বেশি তাকাবি না।”
কারণ কিছু জিনিস শুধু নিষিদ্ধ না, বিপজ্জনকও হয়।
আদিবা এসব শুনে হাসত। সে শহরে বড় হয়েছে, পড়াশোনা করেছে, যুক্তিতে বিশ্বাস করে। তার কাছে এসব ছিল গ্রাম্য ভয় আর কুসংস্কার ছাড়া কিছুই না।
সে কয়েকদিনের জন্য মামার বাড়িতে এসেছে। শহরের ক্লান্ত জীবন থেকে একটু দূরে থাকা, প্রকৃতি দেখা—এই ছিল তার উদ্দেশ্য।
কিন্তু সে জানত না, এই গ্রামটা শুধু প্রকৃতি নিয়ে না। এখানে কিছু গল্প আছে যেগুলো কখনো শেষ হয়নি।
একদিন বিকেলে আদিবা রিমির সাথে বসে ছিল উঠোনে। রিমি গ্রামের মেয়ে, একটু শান্ত স্বভাবের। হঠাৎ কথার মাঝে রিমি বলল,
“তুই ওই বটগাছটার দিকে যাবি না, আদিবা।”
আদিবা হেসে বলল, “কেন? ওখানে কি রাজা-বাদশা থাকে নাকি?”
রিমি একটু চুপ করে থেকে বলল, “না… ওখানে কিছু ডাকা হয়েছে।”
“ডাকা হয়েছে মানে?”
রিমি চোখ নামিয়ে নিল, “বাবা বলে, অনেক বছর আগে গ্রামের একজন মানুষ ভুল করে একটা জিনিস ডেকে এনেছিল। তারপর থেকে সব বদলে গেছে।”
আদিবা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিসের জিনিস?”
রিমি ধীরে বলল, “যেটা নাম দিয়ে ডাকা যায় না… যেটা শুধু নিজের ইচ্ছায় আসে।”
আদিবা তখনো বিশ্বাস করল না। সে ভেবেছিল এটা গ্রামের পুরনো গল্প।
কিন্তু সেই রাত থেকেই শুরু হলো সব।
রাতে ঘুম ভেঙে গেল অদ্ভুত একটা শব্দে। প্রথমে মনে হলো বাতাস। কিন্তু না—ওটা বাতাস না, ফিসফিস।
“আদিবা…”
সে উঠে বসল।
ঘর অন্ধকার। চারপাশ নীরব।
“রিমি?” সে ডাকল।
কোনো উত্তর নেই।
আবার সেই কণ্ঠ,
“আসো…”
এইবার শব্দটা জানালার বাইরে থেকে আসছে।
আদিবা ধীরে ধীরে জানালার কাছে গেল। বাইরে তাকাল।
দূরে বটগাছটা দেখা যাচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা কালো ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সেটি মিলিয়ে গেল।
সে নিজেকে বোঝাল—“মনের ভুল।”
কিন্তু তার শরীর আর মন এক কথা বলছিল না।
পরদিন বিকেলে সে একাই বের হলো। না বলে, কাউকে না জানিয়ে।
পা আপনাতেই বটগাছটার দিকে নিয়ে গেল।
যতই কাছে গেল, বাতাস ততই ভারী হতে লাগল। পাখির শব্দ নেই, কুকুরের ডাক নেই।
যেন পুরো জায়গাটা নিঃশ্বাস বন্ধ করে আছে।
বটগাছটার নিচে পৌঁছে সে থেমে গেল।
মাটিতে একটা বড় বৃত্ত আঁকা। লালচে দাগ শুকিয়ে গেছে। চারদিকে ছড়িয়ে আছে কিছু অচেনা জিনিস—ছোট হাড়, শুকনো ফুল, কালো মাটি।
মাঝখানে একটা পুতুল রাখা।
কালো কাপড়ে মোড়ানো, চোখ দুটো লাল সুতায় সেলাই করা।
আদিবা নিচু হয়ে তাকাল।
“এটা কে রাখল এখানে?” সে নিজে নিজে বলল।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা কণ্ঠ,
“ওটা ছুঁয়ো না।”
আদিবা ঘুরে দাঁড়াল।
একজন বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। মুখে বয়সের দাগ, কিন্তু চোখ দুটো অস্বাভাবিক গভীর।
“আপনি কে?” আদিবা জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধা ধীরে বলল, “আমি এই গ্রামের সেই মানুষ, যে সব দেখেছে।”
“কি দেখেছেন?”
বৃদ্ধা পুতুলটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই জিনিসটা মানুষ বানায় না। এটা ডাকা হয়।”
“কে ডাকে?”
বৃদ্ধা চোখ তুলে তাকাল, “যে জানে না সে কী করছে।”
আদিবা হেসে ফেলল, “এগুলো শুধু গল্প।”
বৃদ্ধা এবার একটু এগিয়ে এসে বলল, “তুই যদি এটা ছুঁস, তোর ছায়া আর তোর থাকবে না।”
আদিবা কিছু না ভেবে হাত বাড়াল।
“ছোঁয়ার আগে ভাবো,” বৃদ্ধা বলল।
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।
আদিবা পুতুলটা তুলে নিয়েছে।
সাথে সাথে বাতাস থেমে গেল।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
তার হাতে একটা ঠান্ডা শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল, যেন কিছু ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।
সে পুতুলটা ফেলে দিতে চাইল, কিন্তু হাত নড়ছিল না।
তার মাথার ভেতর একটা কণ্ঠস্বর উঠল—
“শেষে তুমি আমাকে ডাকলে…”
আদিবা চিৎকার করে বলল, “কে তুমি?”
কণ্ঠস্বর আবার বলল, “আমি সেই, যাকে ডাকা হয়…”
বৃদ্ধা পেছন থেকে বলল, “শেষ হয়ে গেছে…”
সেই রাতেই আদিবা বাড়ি ফিরে আসে। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক।
কিন্তু ভিতরে কিছু বদলে গেছে।
তার চোখে আগের উষ্ণতা নেই। মুখে অদ্ভুত একটা শান্তি।
রিমি জিজ্ঞেস করল, “তুই ঠিক আছিস?”
আদিবা হেসে বলল, “হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি।”
কিন্তু সে যখন চলে যাচ্ছিল, রিমি খেয়াল করল—তার ছায়া উল্টো দিকে পড়ছে।
রাত গভীর হলে আদিবা আয়নার সামনে দাঁড়াল।
তার মুখ নিজের মতো লাগছে না।
ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ বলল,
“একজন যথেষ্ট না…”
আদিবা ফিসফিস করে বলল, “কে?”
“আরও চাই…”
পরদিন সে রিমিকে ডাকল।
“চল, একটু হাঁটি।”
রিমি রাজি হলো না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে রাজি হয়ে গেল। যেন কেউ তাকে বাধ্য করল।
বটগাছের কাছে পৌঁছে রিমি থেমে গেল।
“এটা ভালো লাগছে না,” সে বলল।
আদিবা শান্ত গলায় বলল, “আমি আছি তো।”
কিন্তু সেই মুহূর্তে মাটি কেঁপে উঠল।
রিমির ছায়া আলাদা হয়ে গেল।
আর ছায়াটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগোতে লাগল।
রিমি চিৎকার করল, কিন্তু তার শব্দ বাতাসে মিলিয়ে গেল।
পরদিন গ্রামে রিমি নেই।
কেউ জানে না সে কোথায় গেছে।
শুধু আদিবা জানে।
সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।
তার পিছনে এখন দুইটা ছায়া।
একটা তার নিজের।
আরেকটা… কিছুটা লম্বা, কিছুটা অচেনা।
তার ঠোঁটে একটা হালকা হাসি।
“আরও একজন…” সে ফিসফিস করল।
গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে আসছে।
আর বটগাছটা যেন আরও বড় হয়ে উঠছে, যেন সে অপেক্ষা করছে।
শেষ কণ্ঠটা আবার শোনা গেল—
“এবার পুরোটা গ্রাম…”
সমাপ্ত
[ বিঃদ্রঃ ভালো না লাগলে ইগনোর করবেন গল্প লেখার মুড নাই তারপরও কি জানি এডা লেখছি আমি নিজেও জানি না 😑]