22/08/2026
ফাতিহা — سُورَةُ الْفَاتِحَةِ
তারতীব বিন-নুযূল
নাযিলের ধারাবাহিকতা—তথা কোন সূরার পর নাযিল হয়েছে—তা বিবেচনায় এটি ৫ম সূরা। এর আগে সূরা মুদ্দাসসির ও পরে সূরা লাহাব নাযিল হয়েছে।
তারতীব ফিল-মুসহাফ
বর্তমান কুরআন মাজীদের বিন্যাস অনুযায়ী এটি একেবারে প্রথম সূরা। শুরুতে আনার কারণ, এ সূরাতে অল্পকথায় তুলে ধরা হয়েছে পুরো কুরআনের নির্যাস বা সারকথা।
এক নজরে ফাতিহা
মাক্কি যুগের শুরুতে নাযিল
সূরা নং: ০১
আয়াত: ০৭
মাক্কি
নামের রহস্য
‘ফাতিহা’ মানে ‘শুরু; সূচনা; ভূমিকা’। সূরা ফাতিহার তিনটি নাম আছে:
(১) ফাতিহাতুল কিতাব বা কুরআনের সূচনা। কেননা, কুরআন মাজীদ শুরুই হয়েছে এ-সূরা দিয়ে।
(২) উম্মুল কুরআন বা কুরআনের মূল। কেননা, গোটা কুরআনের মূল ম্যাসেজ এতে অল্পকথায় জায়গা পেয়েছে। আর
(৩) আস-সাবউল মাসানি বা বারবার-পাঠ-করার সাতটি আয়াত। কেননা, সূরা ফাতিহায় সাতটি আয়াত আছে—যেগুলো প্রতি নামাজে বারবার পড়তে হয়।
(দেখুন—তিরমিযি, ৩১২৪; বাগাবি, তাফসীর, ১/৭০; ইবনু কাসীর, তাফসীর, ১/১৮৫)
মেজর থিম
০১ — আল্লাহকে চেনা। তাঁর প্রশংসা ও বড়ত্ব ঘোষণা করা।
০২ — কেবল তাঁরই গোলামি করা। তাঁর দয়াতেই হাত পাতা।
০৩ — দিন-রাত তাঁর কাছে সঠিক পথের দিশা চাওয়া।কথা অ্যান্ড ইফেক্ট
বিশ্বজগত নিয়ে আপনি যত বেশি চিন্তা-ভাবনা করবেন;
আল্লাহ তাআলাকে তত বেশি চিনতে পারবেন।
গতিপথ
সেন্ট্রাল থিম
পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা:
সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সঠিক পথ ও সফলতা চাওয়া
১. আল্লাহর ক্ষমতা ও অনুগ্রহের স্বীকৃতি
আল্লাহ—বিশ্ব-জগতের অধিপতি, রাজাধিরাজ। এই বিশেষণ শুধু তাঁর বেলাতেই সাজে। তবে অসীম ক্ষমতার অধিকারী হলেও, তিনি তাঁর বান্দাদের বেলায় ভীষণ দয়াবান। প্রশংসা কেবল তাঁরই।
২. বিচার দিবসের সত্যায়ন
একমাত্র আল্লাহই এই বিশ্ব-জগৎ সৃষ্টি করেছেন। তিনিই তাঁর বান্দাদের আলো-বাতাস-পানি জুগিয়ে যাচ্ছেন। আর তিনিই কিয়ামতের দিন বান্দার সকল কাজের হিসেব বুঝে নেবেন।
৩. দাসত্বের ঘোষণা ও সাহায্য প্রার্থনা
মহামহিম এই রবের সামনেেই কেবল মানুষ মাথা নোয়াতে পারে। আর সাহায্যও চাইতে পারে শুধু তাঁর কাছেই।
৪. সঠিক পথের দিশা
তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে হবে—তিনি যেন আমাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেন। সেই সাথে বিপথ থেকে যেন আমাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখেন“সঠিক পথ পেয়েছেন লুকমান ও আসহাবে কাহফের যুবকেরা। তাদের ঘটনাগুলো নিয়েও নিবিড় গবেষণা করে দেখতে হবে—আদতে আমরা কতটুকু তাদের অনুসারী হতে পারলাম।”
—দেখুন—তাবারি, তাফসীর, ১/১৭৬; ইবনু কাসীর, তাফসীর, ১/২৫৫
ওভারভিউ
১। আল্লাহর নামে শুরু না-করলে, কোনো কাজেই পূর্ণতা পায় না।
২। জগতে যত প্রশংসা-বাক্য আছে; সব, সবটুকু আল্লাহর জন্য—যিনি সৃষ্টি করেছেন বিশ্ব-জগৎ।
৩। সমস্ত সৃষ্টির প্রতি তাঁর অফুরান ভালোবাসা।
৪। ভালোবাসেন বলে বান্দা যাচ্ছেতাই করবে—তা নয়। বিচার দিনে অন্যায় কাজের শাস্তিও দেবেন তিনি।
৫। তাঁকে রব হিসেবে চেনার পর প্রথম কাজ—তাঁর দাসত্ব করা।
৬। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সর্বোত্তম পথ-প্রদর্শক। তাই তাঁর কাছেই সঠিক পথের দিশা চাইতে হবে।
৭। অনুসরণ করা চাই পূর্বসূরিদের—যারা সঠিক পথের অনুসারী ছিলেন।
৮। জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও যারা বিপথে গেছে—তথা ইহুদিরা—তাদের অনুসরণ নয়।
৯। আর জ্ঞান না-থাকার কারণে যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে—তথা খ্রিস্টানরা—ওদেরও অনুসরণ নয়।
রিফ্লেকশনস / তাদাব্বুর
‘বিসমিল্লাহ’—কথাটি শুনতে খুব ছোট, কিন্তু ভীষণ পাওয়ারফুল। এটা আপনাকে সরাসরি আল্লাহ তাআলার সঙ্গে নেটওয়ার্কিং করিয়ে দেয়। কোনো কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা মানে—কাজটি এখন আর আপনার একার নয়। বরং আপনার সাহায্যে এগিয়ে আসবেন আল্লাহ নিজেই। তখন বসে না থেকে এগিয়ে আসবেন ফেরেশতারাও। এখানেই শেষ নয়, বিশ্ব-জগতের সবকিছু আপনার কাজটি বেগবান করতে হবে উঠে পড়বে। এ ছাড়া বিসমিল্লাহ বলে কোনো সাধারণ দুনিয়াবি কাজ শুরু করলেও, তা নেক আমলের খাতায় জমা হতে থাকবে।
—দেখুন—রবী, আল-আখবার, ১৪৩9সূরা ফাতিহা আমাদেরকে দু‘আর আদব শেখায়। বান্দা যখন দু‘আ করবে, তখন শুরুতে তার দয়ালু রব ও মালিকের প্রশংসা করবে। তাঁর সুন্দর সুন্দর নাম ধরে ডেকে ডেকে তাঁর কাছে চাইবে। তাঁকে ডাকবে ভয় আর আশা নিয়ে। দু‘আতে শুধু ভালো বিষয়গুলোই চাইবে না; মন্দ জিনিস থেকে মুক্তি পাবার জন্যও দু‘আ করবে।
(দেখুন—ইবনু কাসীর, তাফসীর, ১/২০৮)
সূরা ফাতিহায় আমাদেরকে ‘সঠিক পথ’ চাইতে বলা হয়েছে। এখন, সঠিক পথ মানেটা কী আসলে? সহজ উত্তর—ইসলাম। কিন্তু এর অন্য একটি দিকও আছে। ‘সঠিক পথ’ মানে—সকল ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা। ধরুন, আপনি একটা কিছু করতে গিয়ে বেশ খটকায় পড়ে গেছেন। কাজটা করা ঠিক হবে কি হবে না। ভাবতে ভাবতে দিশেহারা। ওই সময় «اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ» / “আমাকে সঠিক পথ দেখাও”—এই ছোট্ট দু‘আটিই আপনার জন্য আঁধার রাতে মশাল হয়ে হাজির হবে। আপনি পরিষ্কার বুঝতে পারবেন—কাজটা করা আদৌ ঠিক হচ্ছে কি না। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেবার আগে একবার হলেও পড়ে নিন—সূরা ফাতিহা।
(দেখুন—তাবারি, তাফসীর, ১/১৭৪)
কিছু শব্দ জানতে হয়
‘আল্লাহ’ শব্দটি এসেছে إله / ইলাহ থেকে। ইলাহ মানে এমন এক সত্তা—যাঁর দাসত্ব করে সবকিছু এবং যাঁর ইবাদাত করে সমস্ত সৃষ্টি।
(দেখুন—তাবারি, তাফসীর, ১/১২১)
রহমান
‘রহমান’ ও ‘রহীম’ শব্দ দুটি রহম থেকে এসেছে। ‘রহম’ মানে মায়ের গর্ভ। মা যেমন তাঁর সন্তানকে এত ভালোবাসেন, সেখান থেকেই করুণা, ভালোবাসা। তবে ‘রহমান’ বলতে সাধারণ অর্থে ভালোবাসা বোঝায়—যেটা ক্ষণস্থায়ী ও সকল সৃষ্টির জন্য।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন: আল্লাহ তাআলার ‘রহমান’ নামটি এই দুনিয়ার বেলায় প্রযোজ্য। তার মানে, দুনিয়াতে তিনি কাউকেই তাঁর করুণা থেকে দূরে ঠেলে দেন না। একজন মুমিনকে যেমন রিযিক দেন—বাতাস, অক্সিজেন, খাবার বা পানি—একজন কাফিরকেও তিনি এসব নিয়ামাত ভোগ করার সুযোগ দেন। কিন্তু পরকালে তিনি তাঁর ‘রহমান’ গুণটি প্রকাশ করবেন না। মানে, অবাধ্য কাফির-মুশরিকদের জন্য সেদিন তাঁর কোনো দয়া বা ভালোবাসার ছিটেফোঁটাও থাকবে না।
(দেখুন—জাজ্জাজ, তাফসীরু আসমায়িল্লাহিল হুসনা, ২৭-২৮)
রহীম
‘রহীম’ বলতে বিশেষ রকমের ভালোবাসা বোঝায়—যেটা চিরস্থায়ী ও কেবল মুমিন বান্দার জন্য। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন: আল্লাহ তাআলার ‘রহীম’ নামটি পরকালের বেলায় প্রযোজ্য। তার মানে, পরকালে কেবল মুমিন বান্দারাই তাঁর করুণা ও ভালোবাসা পেয়ে ধন্য হবেন।
(দেখুন—জাজ্জাজ, তাফসীরু আসমায়িল্লাহিল হুসনা, ২৭-২৮)
ইবাদাত
ইবাদাত মানে আনুগত্য করা। শুধু আনুগত্য নয়, বরং অতি বিনয় ও ভক্তির সাথে আনুগত্য। আল্লাহ যা করতে বলেন, বিনাবাক্যে তা মেনে নেওয়াকেই সত্যিকারের ইবাদাত বলে।
(দেখুন—নাহহাস, মাআনিল কুরআন, ১/১০)