20/08/2026
# # শেরপুরের দই: মাটির সরায় লেখা আড়াইশ বছরের মিষ্টি ইতিহাস
বগুড়ার নাম শুনলেই যে কয়েকটি জিনিসের কথা সবার আগে মনে পড়ে, তার মধ্যে দই অন্যতম। কিন্তু এই বিখ্যাত দইয়ের গল্পের শুরুটা বগুড়া শহরের কোনো আধুনিক মিষ্টির দোকানে নয়—শুরু হয়েছিল বগুড়ার শেরপুরের মাটিতে, ঘোষ পরিবারের হাত ধরে।
স্থানীয় ইতিহাস ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, শেরপুরের দই তৈরির ঐতিহ্য প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো। প্রচলিত বর্ণনায়, ঘোষ পরিবারের **ঘেটু ঘোষের** হাত ধরে সেখানে দই তৈরির সূচনা হয়। প্রথমদিকে ছিল টক দই; পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে সেই দই ধীরে ধীরে রূপ নেয় আজকের পরিচিত মিষ্টি দইয়ে।
তারপর শুরু হয় এক আশ্চর্য যাত্রা।
দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা, তাতে চিনির মিষ্টতা মেশানো, আর মাটির সরায় ঢেলে ধীরে ধীরে জমিয়ে তোলা—এই সহজ মনে হওয়া প্রক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বহু বছরের কারিগরি অভিজ্ঞতা। দই তৈরির কৌশল একসময় ছিল অনেকটাই পারিবারিক ও গোপনীয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হাতবদল হয়েছে সেই কৌশল, আর তার সঙ্গে তৈরি হয়েছে স্বাদ ও মানের নিজস্ব একটি ঐতিহ্য।
শেরপুরের ঘোষপাড়া হয়ে উঠেছিল এই শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র। আজও সেখানে দই তৈরির ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে শুধু ঘোষ পরিবার নয়, মুসলিম সম্প্রদায়সহ নানা উদ্যোক্তাও এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে শেরপুরে ছোট-বড় বহু দইয়ের কারখানা রয়েছে এবং এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা।
# # # নবাববাড়ি থেকে সাধারণ মানুষের ঘরে
শেরপুরের দইয়ের গল্প শুধু একটি খাবারের গল্প নয়—এটি বগুড়ার সামাজিক ইতিহাসেরও অংশ।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, শেরপুরের দই একসময় বগুড়ার নবাব ও সাতানী পরিবারের কাছে সরবরাহ করা হতো। সেই সময় এটি পরিচিতি পেয়েছিল **“নবাববাড়ির দই”** নামেও। পরে ধীরে ধীরে নবাববাড়ির আঙিনা পেরিয়ে এই দই পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের ঘরে।
বিয়ে, জন্মদিন, ঈদ, পূজা, আকিকা, হালখাতা কিংবা অতিথি আপ্যায়ন—বাঙালির আনন্দের আয়োজনে একসময় দই যেন হয়ে উঠল শেষ পাতে অপরিহার্য একটি নাম।
# # # শেরপুর থেকে বগুড়া, বগুড়া থেকে বিশ্বে
শেরপুরের এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বগুড়ার পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়। বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছায়। বগুড়া জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, **১৯৩৮ সালে তৎকালীন বাংলার গভর্নর স্যার জন অ্যান্ডারসন** বগুড়ার দইয়ের স্বাদ গ্রহণ করেন এবং এর খ্যাতি ইংল্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
সময়ের সঙ্গে বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। একসময় যে দই তৈরি হতো স্থানীয় মানুষের জন্য, সেটিই আজ বাংলাদেশের নানা প্রান্তে পরিচিত একটি ঐতিহ্যবাহী খাদ্য।
আর এই দীর্ঘ যাত্রার শুরুতে যে জায়গাটির নাম বারবার ফিরে আসে, সেটি হলো—**শেরপুর।**
# # # মাটির সরায় শুধু দই নয়, একটি ইতিহাস
শেরপুরের দইয়ের বিশেষত্ব শুধু এর মিষ্টতায় নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে মাটির সরার গন্ধ, দুধ জ্বাল দেওয়ার ধৈর্য, কারিগরের হাতের নিপুণতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা অভিজ্ঞতা।
আজকের দিনে আধুনিক যন্ত্র, প্যাকেজিং আর দ্রুত উৎপাদনের যুগেও সেই ঐতিহ্যের মূল জায়গাটি রয়ে গেছে একই—**ভালো দুধ, সঠিক প্রক্রিয়া, সময়ের সঠিক জ্ঞান এবং স্বাদের যথার্থতা।**
২০২৩ সালে **“বগুড়ার দই” ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়**, যা এই দীর্ঘ ঐতিহ্যকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসম্পদের একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।
তাই বগুড়ার শেরপুরের দই যখন মাটির সরায় পরিবেশন করা হয়, তখন সেখানে শুধু দুধ, চিনি আর সংস্কৃতির সমন্বয়ে তৈরি একটি মিষ্টান্ন থাকে না।
থাকে শত বছরের কারিগরি জ্ঞান।
থাকে মানুষের শ্রম।
থাকে একটি জনপদের পরিচয়।
আর থাকে বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া এক মিষ্টি গল্প—
আজও সেই গল্পের প্রতিটি চামচে যেন শোনা যায় পুরোনো দিনের সেই কথাটাই—
**স্বাদ বদলায়, সময় বদলায়;**
**কিন্তু ঐতিহ্যের আসল স্বাদ বদলায় না।**
**"চিনির দানা" সেই বগুড়া শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী ঘোষ পরিবারের দইয়ের কারখানা থেকে পৌঁছে দিচ্ছে **** সরাসরি **** আপনার হাতে।**