25/08/2026
জগৎসমূহের রহমত হযরত রাসুল (সা.)। পর্ব-৪
-ড. কুদরত এ খোদা
প্রাণীকুলের জন্য রহমত: হযরত রাসুল (সা.)-এর গৌরবময় জীবনে বহু ঘটনা প্রাণীকুলের প্রতি তাঁর দয়া ও রহমতের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। হাফিয আবূ নু‘আয়ম আল-ইসপাহানী তাঁর গ্রন্থ ‘দালাইলুন্ নবুওয়াতে’ সুলায়মান ইন্ন আহমদ... আনাস ইবন মালিক সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, “একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) একদল লোককে অতিক্রম করছিলেন, যারা একটি হরিণী শিকার করে তাকে তাদের তাঁবুর খুঁটির সাথে বেঁধে রেখেছিল। (আল্লাহর রাসুলকে দেখে) সে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি ধরা পড়েছি, কিন্তু আমার দুটি শাবক রয়েছে, আপনি আমার জন্য অনুমতি নিন, তাদেরকে দুধপান করিয়ে আমি আবার তাদের কাছে ফিরে আসব। তখন তিনি (সেই লোকদের উদ্দেশে) বললেন, এই হরিণীর মালিক কোথায়? তখন লোকেরা বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরাই এর মালিক। তিনি বললেন, তাকে ছেড়ে দাও, সে গিয়ে তার শাবক দু’টিকে দুধপান করিয়ে তোমাদের কাছে ফিরে আসবে। তখন তারা বলল, আমাদেরকে এর নিশ্চয়তা দেবে কে? তিনি বললেন, আমি। তখন তারা তাকে ছেড়ে দিলো এবং সে গিয়ে তার শাবকদের দুধপান করিয়ে ফিরে আসলো। এরপর তারা তাকে বেঁধে রাখল। এরপর বাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে অতিক্রম করে যাওয়ার সময় বললেন, কোথায় এর মালিকরা? তখন তারা বলল, এই যে আমরা ইয়া রাসুলাল্লাহ! তিনি বললেন, তোমরা কি তাকে আমার কাছে বিক্রি করবে? তারা বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তা আপনার। তিনি বললেন, তাহলে ওকে ছেড়ে দাও। তখন তারা তাকে ছেড়ে দিলো এবং সে চলে গেল।” (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৪ ও ১৫৫)
একদা হযরত রাসুল (সা.) দেখলেন একটি উট অনাহার ও অতিরিক্ত পরিশ্রমে কষ্ট পাচ্ছে। উটটি তাঁর কাছে এসে নিজের কষ্টের কথা বলল! দয়াল রাসুল (সা.) উটের মনিবকে ডেকে বলেন, “এই নির্বাক প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তুমি একে ক্ষুর্ধাত রাখছো এবং অতিরিক্ত কাজ করাচ্ছ।” (আবু দাউদ শরীফ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৫) আরেকটি ঘটনা হযরত রাসুল (সা.) দেখতে পান যে, একটি পাখির বাসার থেকে তার বাচ্চাগুলো নিয়ে আসা হয়েছে, মা পাখিটি ব্যাকুল হয়ে উড়ছিল। হযরত রাসুল (সা.) বলেন, “কে এই পাখিটিকে তার সন্তানদের জন্য কষ্ট দিচ্ছে? পাখির বাচ্চাগুলো ফিরিয়ে দাও।” (আবু দাউদ শরীফ, পৃষ্ঠা ৩৬৩) হযরত রাসুল (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন যে, কোনো প্রাণীকে বিনা কারণে হত্যা করা, লক্ষ্য বানিয়ে তির নিক্ষেপ করা, ক্ষুর্ধাত রাখা বা অযথা কষ্ট দেওয়া মহাপাপ। প্রাণীদের প্রতি দয়া করা শুধু মানবিক গুণ নয়, এটি হযরত রাসুল (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। প্রাণীদের প্রতি যে সমাজ দয়ালু হয়, সেই সমাজে মানুষের প্রতি মানুষের দয়া, ন্যায় ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়।
বৃক্ষরাজির জন্য রহমত: হযরত রাসুল (সা.)-এর দয়া ও মমতা বৃক্ষ, লতাগুল্ম তথা সমগ্র প্রকৃতির মাঝেও বিদ্যমান ছিল। তিনি মানুষকে পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপন ও বৃক্ষের প্রতি সদয় আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও তোমাদের কারো হাতে একটি চারা গাছ থাকে এবং সে তা রোপন করতে সক্ষম হয়, তবে সে যেন তা রোপন করে।” “হযরত রাসুল (সা.) ২৫ বছর বয়সে সিরিয়ার অন্তর্গত বসরা নগরিতে ব্যবসার জন্য সফর করেন। সেখানে একটি বিরাট পুরাতন গাছের নিচে তাঁবু স্থাপন করা হয়। গাছটি বহু দিন যাবৎ পত্রপুষ্প ও ফলবিহীন অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল। হযরত রাসুল (সা.) সে গাছটির শিকড়ে বসে একটু বিশ্রাম করছিলেন। কিন্তু কি আশ্চর্যের বিষয়! তিনি সে গাছের শিকড়ে বসার সাথে সাথেই গাছটি সজীব হয়ে উঠলো এবং তখনই তাতে অসংখ্য পাতা ও ফুল গজিয়ে আশ্চর্য শোভা ধারণ করল।” (তাফসীরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং ২৫৪) “আজও বৃক্ষটি হযরত রাসুল (সা.)-এর স্মৃতি বহন করে বর্তমান জর্ডানের দক্ষিণ মরুভূমিতে একমাত্র জীবন্ত সাহাবি হিসেবে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। আশ্চর্যজনকভাবে এটিই দক্ষিণ জর্ডানের শত শত মাইল জুড়ে বৃক্ষহীন মরুপ্রান্তরে একমাত্র জীবিত বৃক্ষ।” (সূত্র: ওয়েবসাইট) হযরত ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, নবি করিম (সা.) (মসজিদে নববিতে) খেজুরের একটি কাণ্ডের সাথে (হেলান দিয়ে) খুতবা প্রদান করতেন। যখন মিম্বর তৈরি করে দেওয়া হলো। তখন তিনি মিম্বরে ওঠে খুতবা দিতে লাগলেন। খেজুর কাণ্ডটি তখন [নবি করিম (সা.)-এর বিরহে] কাঁদতে শুরু করল। নবি করিম (সা.) খেজুর কাণ্ডটির নিকটে গিয়ে হাত বুলাতে লাগলো। (তখন খেজুর কাণ্ডটি শান্ত হলো)।” (বোখারি শরীফ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০৬) এসব ঘটনা প্রমাণ করে হযরত রাসুল (সা.) বৃক্ষরাজির জন্য রহমতস্বরূপ।
উপসংহার: হযরত মোহাম্মদ (সা.) হলেন রহমতের রাসুল। তিনি অফুরন্ত রহমতের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর রহমত পিতামাতা, শিশু, নারী, এতিম, দরিদ্র, প্রতিবেশী, প্রাণীকুল তথা সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য বিস্তৃত। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ছিল দয়া, ক্ষমা, ন্যায়, মানবতা ও ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর শিক্ষা মানুষকে প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা; বিদ্বেষ নয়, ভালোবাসা; জুলুম নয়, ন্যায়বিচার; বিভেদ নয়, ভ্রাতৃত্ব; ধ্বংস নয়, শান্তি ও মানবকল্যাণের পথ দেখায়। সৃষ্টির প্রতিটি অস্তিত্বে তাঁর অফুরন্ত রহমতের সুধাধারা প্রবাহিত হচ্ছে। হযরত রাসুল (সা.)-এর সুমহান আদর্শ প্রমাণ করে তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ।