14/10/2025
কিছুদিন আগে আমার এক স্টুডেন্ট আমাকে নিজের কিছু দুঃখের কথা বললেন। নিজের আত্মীয়স্বজনের বিপদেআপদে পাশে ছিলেন কিন্তু নিজের বিপদের সময় কাউকে পান না। আমি তাকে নানা কথা বলে স্বান্তনা দিলাম। হঠাৎ করে আমার একটা ঘটনা মনে পড়লো। যে ঘটনা সাপেক্ষে কুরআনের আয়াত পর্যন্ত নাযিল হয়েছিলো। ঘটনাটা ইফকের। উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার ব্যাপারে অপবাদের ঘটনা মোটামুটি আমাদের সবার জানা আছে। সীরাতের প্রসিদ্ধ ঘটনাগুলোর মধ্যে একটা এই ঘটনা যার বর্ণনা আল্লাহ তায়ালা সবিস্তারে তার কালামে তুলে ধরেছেন। কিন্তু সীরাতে রাসূল ও সীরাতে আসহাবে রাসূলে এরকম টুকটাক অনেক ঘটনা আছে যেগুলো মোটাদাগে আমরা এড়িয়ে যাই বা মৌলিকভাবে সেগুলো আমাদের আলোচনায় আসে না। কিন্তু আপনি যদি গভীরভাবে সীরাত পড়েন এবং পাশাপাশি কুরআনে হাকীমে ঘটনার সাথে রিলেট করে নাযিল হওয়া আয়াতগুলো তাদাব্বুর করেন তবে আপনি আশ্চর্য হয়ে দেখবেন আল্লাহ তায়ালা এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো এত গুরুত্ব সহকারে কেন আমাদের সামনে বয়ান করেছেন তা বুঝতে পেরে। এই আয়াতগুলোর মধ্যে আল্লাহ তায়ালা মানুষের সাইকোলজি ও আচরণ এত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে হয়রান হয়ে যেতে হয়!
ছিদ্দিকে আকবর রাদ্বিয়াল্লহু আনহুর এক গরীব আত্মীয় ছিলো। তার নাম মিসতাহ ইবনে উসাসাহ। মিসতাহ মুসলমান ছিলেন এবং সাহাবীও। গরীব হওয়ায় ছিদ্দিকে আকবর তাকে নিয়মিত কিছু অর্থসাহায্য করতেন। ইফকের ঘটনার সময় মিসতাহ মুনাফিকদের উসকানিতে পড়ে যান। তিনিও আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে নিয়ে ছড়ানো নানা কথায় সায় দিয়ে নিজেও কথা ছড়াতে থাকেন। ছিদ্দিকে আকবর মারাত্মক কষ্ট পেলেন। পাওয়ারই কথা। যাকে তিনি এত সাহায্য করেন সেই কীনা তার মেয়েটাকে নিয়ে বাজে কথায় কান দিচ্ছে। বাবা হিসেবে কেমন লাগে! অন্তরটা একেবারে ছিড়ে যায় আপন মানুষ যখন আঘাত দেয়! ছিদ্দিকে আকবরও কষ্ট পেয়ে কসম করে বললেন: আর কখনো মিসতাহকে এক কানাকড়িও দেবো না।
সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাযিল করলেন:
وَ لَا یَاۡتَلِ اُولُوا الۡفَضۡلِ مِنۡكُمۡ وَ السَّعَۃِ اَنۡ یُّؤۡتُوۡۤا اُولِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡمَسٰكِیۡنَ وَ الۡمُهٰجِرِیۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۪ۖ وَ لۡیَعۡفُوۡا وَ لۡیَصۡفَحُوۡا ؕ اَلَا تُحِبُّوۡنَ اَنۡ یَّغۡفِرَ اللّٰهُ لَكُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ না করে যে তারা আত্মীয়-স্বজন ও মিসকীন এবং আল্লাহর পথের মুহাজিরদের সাহায্য করবে না। তারা যেন তাদেরকে ক্ষমা করে ও তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি উপেক্ষা করে। তোমরা কি আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিক এটা পছন্দ করো না? আল্লাহ তো বড়ই ক্ষমাশীল এবং বড়ই দয়ালু।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার সাথে সাথে ছিদ্দিকে আকবর বললেন:
بَلىٰ وَاللهِ يَا رَبَّنَا إنَّا لَنُحِبُّ أنْ تَغْفِرَ لَنَا
আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। আমি অবশ্যই তা পছন্দ করি। এরপর তিনি মিসতাহর আর্থিক সাহায্য পুনর্বহাল করে দেন এবং বলেনঃ এ সাহায্য কোনদিন বন্ধ হবে না।
দোষ মিসতাহর। ছিদ্দিকে আকবরের মন খারাপ হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা নাসীহা দিচ্ছেন উল্টো ছিদ্দিকে আকবরকে। এই ব্যাপারটায় যে কত বড় হিকমাহ আছে সেটা আরেকটা ঘটনা উল্লেখ করে বোঝাচ্ছি।
লাইস ইবনে সাআদ নামে এক তাবেয়ী ছিলেন। তিনি মধুর ব্যবসা করতেন। পিপেয় ভরে ভরে মধু আমদানি করতেন জাহাজে করে। এরপর স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন। একদিন এমন জাহাজ ভরে মধু আনলেন। এক দরিদ্র মহিলা লাইসের কাছে একটা ছোট শিশিতে ভরে মধু নিতে এলেন। তিনি বললেন: খুচরো মধু বিক্রি করি না। মহিলা চলে গেলো। কিন্তু লাইস তার এক কর্মচারী পাঠালেন মহিলার পেছনে পেছনে তার ঠিকানা জেনে আসার জন্য। কর্মচারী ঠিকানা জেনে এলে তিনি মহিলার জন্য এক পিপে মধু পাঠিয়ে দিলেন। কর্মচারী অবাক হয়ে জানতে চাইলো: হযরত! তার দরকার ছিলো তো এক শিশি। আপনি এক ড্রাম দিলেন কেন?
লাইস বললেন: মুসলমানের কাজই হলো অন্যের জীবন সহজ করে দেয়া। মুসলমান হবে উত্তাল নদীর উপর সেতুর মত। যার উপর দিয়ে ধনী-গরীব সবাই পার হয়ে যাবে।
আল্লাহ তায়ালা ছিদ্দিকে আকবরের শানে ঐ আয়াত এজন্যই নাযিল করেছিলেন। পার্থিব জীবনের চাওয়া পাওয়া ও বিনিময় প্রাপ্তির আশায় অন্যের উপকার করা মুসলমানের শান না। মুসলমান যা করবে সবই আল্লাহর জন্যই করবে। শত্রুর জন্যও তার জীবন সহজ করবে। তার সাথে হুসনে মুআমালাত করবে যেন আল্লাহও মুসলমানকে হুসনে জাযা দেন। মানুষ তো কষ্ট দেয়ই। উপকার ভুলে যায়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ভুলে যান না। সব মনে রাখেন এবং বিনিময় দেন।
সুতরাং যে আল্লাহকে রাজী করতে কারো উপকার করলো সে প্রকারান্তরে আল্লাহকেই পেয়ে গেলো। Hoque