06/10/2026
আমি এই কথাগুলো আর কিছুদিন পর প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম, কারণ আমার ইয়ামিনের অবস্থা এখনো ভালো নয়। কিন্তু ছোট শিশু আভান-এর করুণ পরিণতি দেখে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে! অবিকল আমার ইয়ামিনের সাথে কাটানো সেই ভয়াবহ মুহূর্তগুলো আর ভুল চিকিৎসার কথাগুলো বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
আপনারা অনেকেই জানেন যে, ইয়ামিনও প্রায় ১৫ দিনের মতো ইউনিভার্সাল হাসপাতালের আইসিইউ তে ভর্তি ছিলো। অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, সেখানে ইয়ামিনের যে সার্জারিটি করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ভুল সার্জারি ছিল।
এই ভুল চিকিৎসার কারণেই মূলত ওর মেনিনজাইটিস রোগটি পুনরায় ফিরে আসে এবং হাইড্রোসেফালাসের সমস্যাটি সমাধান হওয়ার বদলে আরও মারাত্মক রূপ নেয়। এর ফলে আমাদের বাচ্চার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে।
ICU তে এক রুমের মধ্যে ২০ টা বেড দিয়ে রেখেছে ১-২ হাত দূরে দূরে এক রুমের মধ্যেই হাম, ডেঙ্গু, নিউমনিয়া, নবজাতক সব পেশেন্টের ট্রিটমেন্ট চলছে, চিন্তা করেন ছোয়াচে রোগ হামের পেশেন্টের ২ হাত দূরে আর একটা বাচ্চা শুয়ে আছে। আবার আইসিউ এর মধ্যে মশা, মাছি , যেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত পেশেন্ট আছে এবং আমরা সবাই জানি ডেঙ্গু মশার মাধ্যমে ছড়ায়। শুধু তাই না তাদের আইসিইউ এর মধ্যে আছে তেলাপোকা, যখন তাদেরকে জিগ্যাসা করলাম তেলাপোকা কেন, তারা বলে বাংলাদেশে এমন কোন আইসিউ নাই যেখানে তেলাপোকা নেই 😑।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, যে অ্যান্টিবায়োটিকটি ইয়ামিনের শরীরে কোনো কাজ করবে না মানে Resistant ছিল, সেই অ্যান্টিবায়োটিকই তারা টানা ১৫ দিন ধরে চালিয়ে গেছে সেনসিটিভিটি রিপোর্টে থাকা সত্বেও। তারা যদি বাচ্চার আগের কেস সামারি এবং সমস্ত রিপোর্টগুলো মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে সঠিক চিকিৎসা দিত, তাহলে হয়তো আজকে আমাদের সন্তানকে এই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না।
আমরা যখনই পিআইসিইউতে (PICU) ওর আগের হিস্ট্রি জানাইতে গিয়েছিলাম চিকিৎসকরা তা না শুনে দায়িত্বহীনভাবে বলেছিলেন — "এখন আমাদের কাছে আছে, আমরা আমাদের মতোই চিকিৎসা দেব।" অথচ আমরা আগেই বাচ্চার সমস্ত পূর্ববর্তী রিপোর্ট জমা দিয়েছিলাম। এছাড়াও তারা কতটা অবহেলা করেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
বিষয় টা এরকম ছিলো আইসিউ তে ভর্তির ৭ দিন পরেও ওখানকার নার্স ডাক্তাররা অনেকে জানেই না যে ওর ব্লাড ক্যান্সার। কিন্তু ওরা বাবুর ট্রিটমেন্ট করছে ।
আইসিউ থেকে কয়েক দিনের জন্যে বেডে দিয়েছিলো কিন্তু ওর হার্ট রেট হটাৎ হটাৎ করে অনেক বেড়ে যাওয়ায় আবার আইসিউ তে শিফট করি মাঝ রাতে , সকালে icu তে ভিজিট করতে যেয়ে দেখি ওর মনিটর খুলে অন্য একজন পেশেন্ট কে দিয়ে রেখেছে কারণ তার মনিটর টা নাকি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো । তাহলে বুঝেন যে হার্ট রেট মনিটর করার জন্যে আইসিউ তে নিয়েছি সেই মনিটরই খুলে রেখে দিয়েছে ।
অস্ত্রোপচারের পর তাকে টানা ১২ দিন ক্যাথেটার পরিয়ে রাখা হয়েছিল। সে একজন কেমো থেরাপির রোগী তাই ক্যাথেটার বেশি দিন রাখলে ইনফেকশনের মারাত্মক ঝুঁকি ছিল। আমরা বারবার ডাক্তার ও নার্সদের কাছে গিয়ে জানিয়েছি ক্যাথেটারটি খুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা আমাদের কথায় কোনো গুরুত্ব না দিয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে উত্তর দিত— "১৪ দিন রাখলেও কোনো সমস্যা নেই।"
এমনকি হাসপাতাল থেকে যে দিন ইয়ামিনকে ডিসচার্জ করে নিয়ে আসি, সেদিনও তারা বাচ্চার ক্যাথেটার খুলে দেয়নি! অবশেষে বাধ্য হয়ে, ইউনিভার্সাল হাসপাতালের চরম অবহেলার হাত থেকে বাচ্চাকে বাঁচাতে আমরা অ্যাম্বুলেন্সে করে অন্য হাসপাতালে শিফট করি এবং নতুন করে সার্জারি করাই।
পরদিন যখন আমরা তাকে অন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই, সেখানকার অভিজ্ঞ ডাক্তার ইয়ামিনের ক্যাথেটার দেখেই বলে, ওর তো ইউরিন ইনফেকশন হয়ে গেছে এবং ক্যাথেটারে Puss cell দেখা যাচ্ছে ।পরবর্তী রিপোর্টে চিকিৎসকের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হয়! ওর ইউরিন ইনফেকশন হয় ।
তাহলে আমরা যখন বারবার তাদের সতর্ক করছিলাম, তারা কি অন্ধ ছিল? কানে কি কথা যেত না? একটা অসুস্থ বাচ্চাকে সঠিক চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা তো দূরের কথা, কিভাবে চিকিৎসার নামে আরও অসুস্থ বানিয়ে দেওয়া হয়, তা ইউনিভার্সাল হাসপাতালে না গেলে আমরা বুঝতে পারতাম না! আমাদের কাছে এর সমস্ত প্রমাণ ও রিপোর্ট এখনো রক্ষিত আছে।
এছাড়াও ওখানে ICU তে সকাল বিকাল আমাদেরকে কাউন্সিলিং এর নামে মানসিক টর্চারর করা হতো, ২ বেলা করে আমাদের কে বলা হতো ইয়ামিনের বাচার কোন সম্ভাবনা নেই, যখন তখন যা কিছু হতে পারে, ও বাচলেও স্পেশাল চাইল্ড হিসাবে বেচে থাকবে, ট্রিটমেন্ট করে তেমন লাভ নেই etc etc, আর দুই বেলা করে বন্ড সই নেওয়া হতো, আচ্ছা বাবুর অবস্থা তো এখন আরও খারাপ কই এখানকার ডাক্তার রা তো এক বারও আমাদের কে নিরাশ করার মতো কথা বলেনি বরং বলেছে এখনো ট্রিটমেন্ট আছে , সময় লাগবে কিন্তু আশা করি ইয়ামিন সুস্থ হয়ে যাবে, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
আর আপনি কোন ভাবেই তাদের ICU তে মোবাইল নিয়ে ঢুকতে পারবেন না কারন তাহলে তাদের এই অপচিকিৎসা ফাস হয়ে যাবে।
আর ওখানে দায়িত্বে থাকা প্রধান ডাক্তার মনির স্যারের কথা কি বলবো, উনার রোগি দেখার সর্বোচ্চ সময় ২০ সেকেন্ড, প্রশ্ন করলে উত্তরের থেকে বেশি অপমান আর উপমা শুনতে পাবেন।
অথচ এই হাসপাতালের ICU বাংলাদেশের মধ্যে বেশ সুনামধন্য, তাদের ICU এর প্রতিদিনের বিল আসতো প্রায় ৪০ হাজার টাকা।
আজ মনে হচ্ছে, আমরা যারা ভুল চিকিৎসার ভুক্তভোগী, তারা যদি আগেই প্রতিবাদ জানাতাম এবং শক্ত পদক্ষেপ নিতাম, তাহলে হয়তো আজকে অবহেলার কারণে আভানের মতো নিষ্পাপ শিশুকে জীবন হারাতে হতো না!
আসলে শুধু একটি নির্দিষ্ট হাসপাতাল নয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ ডাক্তার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন (Careless) হয়ে পড়েছে, তা ভুক্তভোগী পরিবার মাত্রই জানে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য:আমি কথাগুলো সবার উদ্দেশ্যে বলছি কারণ আজ আমার ইয়ামিন কিংবা ছোট্ট আভানের সাথে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো প্রতিদিন আরও অনেক শিশুর সাথেই ঘটছে।আসলে সন্তান যখন অসুস্থ হয়, তখন কোনো বাবা-মায়েরই মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকে না। তাও আমি বলবো— বাচ্চার এই কঠিন সময়ে আপনারা মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং চিন্তা-ভাবনা করে সঠিক হাসপাতাল বেছে নেবেন। আপনার সন্তানের সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলে আগে কেস সামারি ও সমস্ত রিপোর্ট নিয়ে প্রয়োজনে আরও ৩-৪ জন অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে গিয়ে যাচাই-বাছাই (Second Opinion) করে নেবেন। দরকার হলে ৫ জন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন, তাও কোনো ঝুঁকি নেবেন না।মনে রাখবেন, সন্তান আপনার এবং আমার। ভুল চিকিৎসার কারণে যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তার যন্ত্রণা শুধু আমাদেরই বয়ে বেড়াতে হবে। সেই ক্ষতির পূরণ করার ক্ষমতা এই পৃথিবীর কারো নেই! আপনি কেঁদে কেঁদে শেষ হয়ে গেলেও সেই ভুল চিকিৎসার ক্ষতিপূরণ কেউ দিতে পারবে না। তাই শুরু থেকেই সচেতন থাকুন এবং সতর্ক পদক্ষেপ নিন।