13/08/2026
সিনেমা দেখবে, সিনেমা....
মাটির ময়না, অন্তর্যাত্রা, মুক্তির গান, কাগজের ফুল.....একোনো সাধারণ ফেরিওয়ালার কথা বলছিনা বলছি সিনেমার ফেরিওয়ালা তারেক মাসুদের কথা।
কাগজের ফুলের গন্ধ দেয়ার জন্যই হয়তো শেষ চেষ্টায় মানিকগঞ্জ এসেছিলেন কাগজের ফুল বিকশিত হয়নি আর! হয়েছে তার দেহের নির্মম বিনাশ। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। হয়তো আমাদের মাধ্যমেই পরবর্তীতে কাগজের ফুল ফুটাবেন বলেই তার এই অকালে চলে যাওয়া।
চোখে জল আর তার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বুকে লালন করে লিখছি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও এক ক্ষণজন্মা চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের পঞ্চদশ প্রয়াণ দিবস নিয়ে অশ্রু সিক্ত লেখা।
#তারেকমাসুদ: পনেরো বছর পরও যে স্বপ্নের চলচ্চিত্র অসমাপ্ত--
১৩ আগস্ট ২০১১—১৩ আগস্ট ২০২৬।
আজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক অনন্য স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ তারেক মাসুদের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী।
মাত্র ৫৪ বছর বয়সে থেমে গিয়েছিল তাঁর জীবন; কিন্তু থেমে যায়নি তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের ভাষা, তাঁর ইতিহাসবোধ কিংবা মানুষের গল্প বলার দায়বদ্ধতা।
আবু তারেক মাসুদ—যিনি চলচ্চিত্রকে নিছক বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং ইতিহাস, সমাজ, মানুষ, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয় সহাবস্থান, অসাম্প্রদায়িকতা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।
ফারিদপুরের ভাঙ্গার নূরপুরে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি মাদ্রাসায় আট বছর পড়াশোনা করার পর মূলধারার শিক্ষায় ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।
১৯৮০-এর দশকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রচর্চার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন এবং ১৯৮৮ সালে দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। চলচ্চিত্রকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে প্রদর্শনী করার কারণে তাঁর পরিচিতি হয়ে ওঠে—‘সিনেমা ফেরিওয়ালা’।
তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’ (১৯৮৯)—শিল্পী এস এম সুলতানের জীবন ও শিল্পসত্তার অনুসন্ধান। এরপর ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে ধারণ করে নির্মাণ করেন ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫)। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের গান, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র বাংলাদেশের প্রামাণ্যচিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে আছে।
এরপর আসে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘মাটির ময়না’ (২০০২)। নিজের শৈশব-অভিজ্ঞতা, মাদ্রাসাজীবন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি এবং মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী অস্থির সময়কে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র তাঁকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করে। কান চলচ্চিত্র উৎসবের Directors’ Fortnight-এ প্রদর্শিত ‘মাটির ময়না’ অর্জন করে FIPRESCI International Critics’ Prize—যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন মর্যাদা দেয়। চলচ্চিত্রটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়।
‘অন্তর্যাত্রা’ (২০০৬)-তে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশি জীবনের আত্মপরিচয় ও শিকড়ের টানকে অনুসন্ধান করেছেন। আর ‘রানওয়ে’ (২০১০)-তে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, হতাশা এবং উগ্রবাদী মতাদর্শের প্রভাবের মতো সমকালীন সংকটকে একজন তরুণের জীবনকাহিনির মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন।
কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্র-যাত্রার সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়টি আসে ১৩ আগস্ট ২০১১। মানিকগঞ্জে তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘কাগজের ফুল’-এর শুটিং লোকেশন দেখে ঢাকায় ফেরার পথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জোকায় একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ এবং প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ কয়েকজন নিহত হন। সেদিন শুধু দুজন মানুষ হারিয়ে যায়নি—বাংলাদেশ হারিয়েছিল তার চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজ করা দুই অসাধারণ সৃজনশীল মানুষকে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়—তারেক মাসুদের শেষ স্বপ্ন ‘কাগজের ফুল’ আর সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি। চলচ্চিত্রটির বিষয় ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের দেশভাগ; আর তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্নও যেন ইতিহাসের এক অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি হয়ে রয়ে গেল।
তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রের শক্তি ছিল তিনি ‘বড়’ গল্পের মধ্যে ‘সাধারণ’ মানুষকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর ক্যামেরা কেবল দৃশ্য ধারণ করত না—একটি জাতির স্মৃতি, সংকট, আত্মপরিচয় ও বিবেককে ধারণ করত।
তাই পনেরো বছর পরও তারেক মাসুদ কেবল একজন প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতার নাম নন; তিনি বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রচর্চার একটি দর্শন, একটি সাহসী নান্দনিক অবস্থান এবং নিজের মাটি ও মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার এক নিরন্তর আহ্বান।
তাঁর মৃত্যু হয়েছে—কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্রের প্রশ্নগুলোর মৃত্যু হয়নি।
বরং সময় যত এগিয়েছে, তাঁর চলচ্চিত্রগুলো তত বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
আজ তাঁর ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি—
চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদকে।
স্মরণ করি তাঁর সহযাত্রী মিশুক মুনীরকেও।
তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র বেঁচে থাকুক।
বেঁচে থাকুক তাঁর স্বপ্ন—একটি মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, ইতিহাসসচেতন বাংলাদেশে।
সবশেষে বলতে চাই প্রতিটি মানুষের এক একটি স্বপ্ন থাকে। তার বৃদ্ধা মায়েরও স্বপ্ন আছে, তারেক মাসুদের জীবন, চলচ্চিত্র কর্ম ও তার মৃত্যু সব কিছুই স্মৃতিতে আজীবন ধরে রাখার জন্য মাননীয় সরকারের প্রতি মায়ের আকুতি যেনো তারেকের জন্মস্থান ভাঙ্গার নূরপুরে একটা চলচ্চিত্র যাদুঘর হোক,আর ভাঙ্গা গোল চত্বরের নাম তার নামানুসারে হয়।
শ্রদ্ধেয় কাকী জানের এই স্বপ্ন পূরণ হোক।