31/08/2026
জীবন যুদ্ধে এক অপরাজেয় নারী মাঝির অজানা গল্পঃ
যাত্রী: নানী করেই বলি (কেননা নানা বাড়ির প্রতিবেশী হবেন ভেবেই বলছি) নৌকাটা কি ওপারে যাবে?
মাঝি: যাবে ভাই, উঠেন। পানি শান্ত আছে, আল্লাহ ভরসা।
যাত্রী:এক পারে কত নেন?
মাঝি: পাঁচ টাকা । যার সামর্থ্য আছে, দশ টাকা দেয়। যার নেই, সে যতটুকু পারে দেয়।
যাত্রী: আপনি একাই নৌকা চালান?
মাঝি: হ ভাই। এই নৌকাই আমার সংসার, এই বৈঠাই আমার উপার্জনের হাতিয়ার।
যাত্রী: আপনার বয়স তো অনেক হয়েছে, নানী। এই বয়সে এত ঝুঁকি নিয়ে নৌকা চালান কেন?
মাঝি: বয়স কি আর পেট বোঝে দাদা? পেট তো বয়সের হিসাব করে না।
সকাল হলে তাকে খাবার দিতে হয়, রাতে ঘরে ফিরলে সংসারের মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকাতে হয়।
যাত্রী: আপনার ছেলে-মেয়ে ?
মাঝি: আছেরে দাদা ভাই আছে। যার যার সংসার হয়েছে। সবাই তো আর নিজের সংসার সামলে মায়ের সংসার চালাতে পারে না।
তাই যতদিন হাত-পা চলে, আমিই চালাই।
যাত্রী: ভয় করে না? বর্ষায় নদী তো ভয়ংকর হয়ে যায়।
মাঝি: ভয় তো করেরে ভাই কী করবো। খুব ভয় করে।
কিন্তু ভয়কে ঘরে রেখে বের হলে চুলায় হাঁড়ি চড়ে না।
যাত্রী: কখনো দুর্ঘটনা ঘটেনি?
মাঝি: নদী কাউকে কথা দিয়ে চলে না ভাই। কখনো পানি শান্ত, কখনো হঠাৎ স্রোত বাড়ে।
তবু বৈঠা হাতে নিই। কারণ আমার জীবনের স্রোতও তো থেমে নেই।
যাত্রী: সারাদিনে কত টাকা আয় হয়?
মাঝি: কখনো একশো, কখনো দেড়শো, কখনো তারও কম।
কোনো কোনো দিন যাত্রী কম থাকে—তখন নৌকা চালিয়ে শুধু শরীরটাই ক্লান্ত হয়, বাকশো খালি থাকে।
যাত্রী: এত অল্প টাকা দিয়ে সংসার চলে?
মাঝি: সংসার কি আর টাকার পরিমাণ বুঝে চলে ভাই?
কম থাকলে কম খাই, ধার করি, পরের দিনের আশায় থাকি।
গরিবের সংসারে চাহিদার চেয়ে প্রয়োজনটাই বড়।
যাত্রী: আপনি কখনো ভেবেছেন, এই কাজটা আর আপনার সাথে চলেনা?
মাঝি: অনেকবার ভেবেছি।
যেদিন শরীর ব্যথায় উঠে বসতে পারি না, সেদিন মনে হয়—আর না! কিন্তু পরদিন যখন ঘরে চাল কম দেখি, তখন আবার নৌকায় উঠে পড়ি।
যাত্রী: আপনার সবচেয়ে কষ্টের বিষয় কী জানেন?
মাঝি: কী?
যাত্রী: আপনার বয়সে আপনার বিশ্রাম নেওয়ার কথা। অথচ আপনি মানুষের জীবন পার করছেন, আর নিজের জীবনটাকেও বৈঠার টানে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন।
মাঝি: (মৃদু হেসে) জীবন ভাই, কাউকে সবসময় নিজের মতো করে চলার সুযোগ দেয় না।
কেউ গাড়িতে চড়ে জীবন পার হয়, কেউ এই নৌকায় চড়ে।
কেউ হাজার টাকা খরচ করে একবেলা খায়, আর কেউ পাঁচ টাকা আয় করে পুরো দিন কাটায়।
যাত্রী: আপনার কখনো মনে হয় না—আপনার জীবনটা অন্যায়ভাবে বেমানান, কঠিন?
মাঝি: মনে হয়।
হবে না কেনো দাদা? তবে কাকে বলব? নদীকে?
নদী তো শুধু পথ দেখায়, ভাগ্য বদলায় না।
যাত্রী: আমরা যারা আপনার নৌকায় উঠি, পাঁচ-দশ টাকা দিয়ে ওপারে চলে যাই—আমরা কি কখনো আপনার জীবনের কথা ভাবি?
মাঝি: সবাই ভাববে এমন তো আর না।
কেউ ভাড়া দেয়, কেউ হাসিমুখে কথা বলে, কেউ আবার এমনভাবে তাকায় যেন আমি মানুষ না—শুধু একটা নৌকার মাঝি।
যাত্রী: আজ আপনার সঙ্গে কথা না বললে আমিও হয়তো শুধু একজন মাঝি হিসেবেই আপনাকে দেখতাম।
মাঝি: মানুষকে দূর থেকে দেখলে সবাইকেই ছোট মনে হয় ভাই। কাছে এলে বোঝা যায়—প্রত্যেক মানুষের বুকের ভেতর একটা করে গল্প আছে।
যাত্রী: আপনার গল্পটা খুব কষ্টের।
মাঝি: কষ্ট তো সবারই আছে দাদা।
আমার কষ্টটা শুধু একটু দৃশ্যমান—এই নদীর পানির মতো।
তোমাদের অনেকের কষ্ট হয়তো ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে থাকে।
যাত্রী: নানী, আজ ভাড়া পাঁচ টাকা নয়—দশ টাকাই রাখুন।
মাঝি: না দাদা, যতটুকু ভাড়া ততটুকুই দেও।
যাত্রী: এটা ভাড়া নয় নানী। এটা আপনার পরিশ্রমের প্রতি আমার সম্মান।
মাঝি: (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) সম্মানটাই টাকার চেয়ে বড় নানা ভাই।
তবে টাকাটা রাখি—আজ ঘরে একটু বেশি চাল যাবে।
যাত্রী: ওপারে এসে গেলাম। আপনার জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগত।
মাঝি:( হেসে)কী করলে ভালো লাগতো? যাইহোক তোমার ভালো লাগা অন্তরে থাকুক। একটা কথা কই মানুষকে ছোট করে দেখো না।
যে মানুষটা তোমাকে পাঁচ টাকায় নদী পার করে দেয়, তার নিজের জীবনটাও হয়তো প্রতিদিন একটা বিশাল নদী পার হওয়ার লড়াই।
যাত্রী: না, নানী আমি অমন নই। আমি মানুষকে অন্তত হৃদয় দিয়ে ভালোবাসি। এটা আমার জন্মগত মানবিক স্বভাব বলতে পারেন। আপনার কথা সত্যিই মনে থাকবে।
মাঝি: আমার কথা মনে রাখার দরকার নেই নানা ভাই( আক্ষেপ করে)।
শুধু মনে রেখো—দারিদ্র্য মানুষকে ছোট করে না, দারিদ্র্যের কাছে মানুষের অসহায়ত্বটাই আমাদের সমাজের বড় আয়না।
আমি নৌকা থেকে নেমে এপারের পথে হাঁটতে থাকি।
বৃদ্ধ নারী মাঝি আবার বৈঠা হাতে নেন।
নৌকাটি ধীরে ধীরে ফিরে যায় ওপারে—
আর নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে যায় পাঁচ-দশ টাকার বিনিময়ে বেঁচে থাকা এক নারীর দীর্ঘ জীবনের অব্যক্ত গল্প।