21/04/2026
১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় বড় পরিবর্তন: পরীক্ষা হবে ২২০ নম্বরের
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এক বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। ২০২৫ সালের সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে আর দীর্ঘমেয়াদি 'গণবিজ্ঞপ্তি' বা ধাপে ধাপে আবেদনের প্রয়োজন হবে না। এর বদলে সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমেই শূন্য পদগুলোতে শিক্ষক পদায়ন করা হবে।
এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও হতাশার অবসান হতে চলেছে।
নিয়োগ পদ্ধতিতে কী কী বদল আসছে?
নতুন ও পুরোনো নিয়োগ পদ্ধতির তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
আগের পদ্ধতি (সনদভিত্তিক): প্রথমে নিবন্ধন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের একটি 'শিক্ষক নিবন্ধন সনদ' দেওয়া হতো। এরপর যখন এনটিআরসিএ 'গণবিজ্ঞপ্তি' প্রকাশ করত, তখন সনদধারীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য আবেদন করতেন। চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর নিয়োগের সুপারিশ করা হতো। এতে অনেকেই সনদ পেয়েও নিয়োগ না পেয়ে বছরের পর বছর বেকার থাকতেন।
নতুন পদ্ধতি (সরাসরি নিয়োগ): এখন আর আলাদা করে কেবল সনদের জন্য পরীক্ষা হবে না। এনটিআরসিএ সরাসরি শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। যারা এই নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবেন, তাঁদের সরাসরি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হবে।
কেমন হবে নতুন পরীক্ষার মানবণ্টন?
নতুন নিয়মে পরীক্ষাটি মোট ২২০ নম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে।
এমসিকিউ (MCQ) পরীক্ষা: ২০০ নম্বর
মৌখিক পরীক্ষা (Viva): ২০ নম্বর
পাস নম্বর: উভয় ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে।
কেন এই নতুন পদ্ধতি?
এনটিআরসিএ-এর সচিব এ এম এম রিজওয়ানুল হক সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিবর্তনের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, আগের নিয়মে যারা নিবন্ধন সনদ পেতেন, তাঁদের সবাই চূড়ান্ত নিয়োগ পেতেন না। এতে সনদধারী বেকারদের মধ্যে তীব্র বঞ্চনা ও হতাশার সৃষ্টি হতো।
নতুন পদ্ধতিতে যেহেতু সরাসরি পদের বিপরীতে পরীক্ষা হবে, তাই যারা উত্তীর্ণ হবেন তারা সরাসরি চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন। এর ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়া যেমন দ্রুততর হবে, তেমনি প্রশাসনিক জটিলতাও বহুলংশে কমে আসবে।
১৯তম নিবন্ধনে ৭৭ হাজার ৭৯৯ শূন্য পদের তালিকা:
সরাসরি নিয়োগের প্রথম ধাপ হিসেবে এনটিআরসিএ ইতিমধ্যে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শূন্য পদের তালিকা সংগ্রহ করেছে। এবার মোট ৭৭ হাজার ৭৯৯টি শূন্য পদের বিপরীতে মেগা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
কোন পদে কতজন নিয়োগ পাবেন, তার বিস্তারিত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
ক্রমিক পদের নাম শূন্য পদের সংখ্যা
১ সহকারী শিক্ষক ৪৪,৬৯১
২ সহকারী মৌলভি ১১,০৬৯
৩ ইবতেদায়ি মৌলভি ৬,১৬৬
৪ প্রভাষক ৫,৮৫২
৫ সহকারী শিক্ষক/শরীরচর্চা প্রশিক্ষক ৪,০১৪
৬ ইবতেদায়ি কারি ২,৫৬৩
৭ ব্যবহারিক নির্দেশক ১,৬১৬
৮ সহকারী শিক্ষক (ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা) ৯২৮
৯ ইবতেদায়ি শিক্ষক ৪৪৪
১০ বাণিজ্য প্রশিক্ষক ২৫১
১১ কম্পিউটার ব্যবহারিক নির্দেশক ১২৯
১২ শারীরিক শিক্ষা প্রশিক্ষক ১২৫
১৩ প্রশিক্ষক ৫১
মোট সর্বমোট শূন্য পদ ৭৭,৭৯৯
(সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে সাধারণ সহকারী শিক্ষক পদে, যার সংখ্যা ৪৪,৬৯১টি।)
এনটিআরসিএ-এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে ২০০৫ সাল থেকে এনটিআরসিএ শিক্ষক নিবন্ধন সনদ দেওয়া শুরু করে। পরবর্তীতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ২০১৫ সাল থেকে সনদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করার দায়িত্বও নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
এখন পর্যন্ত মোট ৭টি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে এনটিআরসিএ, যার মাধ্যমে সারা দেশে ১ লাখ ৮৬ হাজার ২৩৮ জন শিক্ষককে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের এই নতুন নীতিমালা এনটিআরসিএ-এর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশের শিক্ষা খাতে একটি ইতিবাচক মাইলফলক হয়ে থাকবে।