16/08/2026
পাহাড়িরা পিছিয়ে নেই—সুযোগ ও অধিকারের বৈষম্যে পিছিয়ে রাখা হয়েছে।
লিখেছেন - নিপ্পন চাকমা চিত্তি
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—তারা নাকি উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা আধুনিকতার দিক থেকে পিছিয়ে আছে। কিন্তু এই ধারণার আড়ালে যে বাস্তবতাটি অনেক সময় চাপা পড়ে যায়, সেটি হলো—পাহাড়িরা মেধায় পিছিয়ে নেই, পরিশ্রমে পিছিয়ে নেই, স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই; বরং তাদের সামনে থাকা সুযোগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও বিভিন্ন নাগরিক সুবিধার বৈষম্য তাদের অগ্রযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
একজন মানুষের যোগ্যতা শুধু তার ফলাফল দিয়ে বিচার করা যায় না; তাকে কতটা সুযোগ দেওয়া হয়েছে, কতটা সহায়তা পেয়েছে, কোন পরিবেশে বেড়ে উঠেছে—এসব বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়। শহরের একটি শিশুর সামনে যদি উন্নত বিদ্যালয়, দক্ষ শিক্ষক, কোচিং বা অতিরিক্ত শিক্ষার সুযোগ, ইন্টারনেট, লাইব্রেরি, প্রযুক্তি, ভালো যোগাযোগব্যবস্থা এবং নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম থাকে, অথচ পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকার একটি শিশুকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়, পর্যাপ্ত শিক্ষক পাওয়া যায় না, শিক্ষার উপকরণ সীমিত থাকে এবং উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে নিজের এলাকা ছেড়ে দূরে যেতে হয়—তাহলে দুজনকে একই মাপকাঠিতে বিচার করা ন্যায়সংগত নয়।
পাহাড়ের প্রতিটি গ্রামেই হয়তো এমন অসংখ্য শিশু রয়েছে, যাদের চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন আছে। কেউ হয়তো ডাক্তার হতে চায়, কেউ শিক্ষক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ খেলোয়াড়, কেউ শিল্পী, কেউ লেখক, কেউ আলোকচিত্রী। কিন্তু স্বপ্ন থাকা আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাওয়া—এই দুটি বিষয় এক নয়। অনেক সময় একটি প্রতিভা শুধু সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায়। একটি শিশুর মেধা হয়তো কখনোই প্রকাশ পায় না, কারণ তার হাতে ভালো বই পৌঁছায়নি; কোনো তরুণ হয়তো খেলাধুলায় জাতীয় পর্যায়ে যেতে পারত, কিন্তু প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়নি; কোনো শিল্পী হয়তো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত হতে পারত, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম পায়নি। এই জায়গাতেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। পাহাড়ে বসবাস করে বলে কোনো শিশু যেন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, দুর্গম এলাকায় বসবাস করে বলে কোনো পরিবার যেন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, কোনো তরুণ যেন কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবে নিজের স্বপ্ন হারিয়ে না ফেলে—এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনযাপন এবং প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা দেখলেই বোঝা যায় যে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে মেধা ও পরিশ্রমের কোনো ঘাটতি নেই। পাহাড়ের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে জীবনযাপন করে। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ঝরনা, বন, নদী, কৃষিকাজ, জীবিকার নানা সংগ্রাম—এসবের মধ্য দিয়েই তাদের জীবন গড়ে উঠেছে। প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, সীমিত সম্পদের মধ্যে জীবন পরিচালনা করা এবং নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখা—এসবও এক ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতা। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এগিয়ে যেতে হলে শুধু ঐতিহ্যগত জ্ঞান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তি, আধুনিক প্রশিক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। আর এখানেই পাহাড়ের মানুষের জন্য আরও বড় পরিসরে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা যদি পাহাড়ের প্রতিটি শিশুর হাতে মানসম্মত শিক্ষা তুলে দিতে পারি, তাহলে আগামী কয়েক দশকে পাহাড় থেকে কত অসাধারণ প্রতিভা বেরিয়ে আসতে পারে—তার হিসাব করা কঠিন।
সুযোগ পেলে আরও অসংখ্য প্রতিভা উঠে আসতে পারে। আজ আমরা ঋতুপর্ণা চাকমা বা সুরাকৃঞ্চ চাকমার মতো প্রতিভাবান মানুষের কথা বলতে পারি। তাঁরা নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে পরিচিত হয়েছেন এবং দেখিয়ে দিয়েছেন যে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি শুধু কয়েকজন প্রতিভাবান মানুষের সাফল্যের কথা বলেই থেমে যাব, নাকি সেই সাফল্যের পেছনে থাকা সম্ভাবনাকে আরও হাজারো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।
একজন ঋতুপর্ণা চাকমা যদি উঠে আসতে পারেন, তাহলে হয়তো আরও শত শত মেয়ে ফুটবল, অ্যাথলেটিক্স, সংগীত, শিল্প কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পারে।
একজন সুরাকৃঞ্চ চাকমা যদি নিজের প্রতিভা দিয়ে দেশের মানুষের নজরে আসতে পারেন, তাহলে পাহাড়ে হয়তো আরও অসংখ্য তরুণ আছে, যারা সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। কিন্তু তাদের খুঁজে বের করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে হবে। একজন প্রতিভাবান মানুষকে তৈরি করতে শুধু তার নিজের মেধা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সহযোগিতা।
শিক্ষা হতে হবে পাহাড়ের উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। পাহাড়ের উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো শিক্ষা। রাস্তা তৈরি করা দরকার, হাসপাতাল তৈরি করা দরকার, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা দরকার—কিন্তু এসবের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষাকে। কারণ একটি শিক্ষিত প্রজন্মই দীর্ঘমেয়াদে একটি সমাজকে পরিবর্তন করতে পারে। পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবই, প্রযুক্তি, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, বিজ্ঞান শিক্ষা, গ্রন্থাগার ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তার সুযোগ বাড়াতে হবে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো ফলাফল করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সমস্যার মুখোমুখি হয়। শহরে থাকা, যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার খরচ—এসব তাদের পরিবারের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে। যে মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষা থেকে ছিটকে যায়, তার ক্ষতি শুধু তার নিজের নয়; ক্ষতি হয় পুরো দেশের।
কারণ একজন সম্ভাবনাময় ডাক্তার, শিক্ষক, গবেষক, প্রকৌশলী, শিল্পী কিংবা উদ্যোক্তা যদি সুযোগের অভাবে তার পথ হারিয়ে ফেলে, তাহলে দেশও একজন সম্ভাবনাময় নাগরিককে হারায়।
পাহাড়ের উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়। পাহাড়ে উন্নয়ন বলতে শুধু বড় রাস্তা, ব্রিজ বা ভবন নির্মাণকে বোঝালে চলবে না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হবে, যখন পাহাড়ের মানুষ নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করবে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাবে। একটি সুন্দর রাস্তা তৈরি হলো, কিন্তু সেই রাস্তার পাশে থাকা গ্রামের বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই—তাহলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। একটি হাসপাতাল তৈরি হলো, কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও ওষুধ নেই—তাহলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ।
একটি বিদ্যালয় আছে, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই—তাহলে ভবন থাকলেও শিক্ষার অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত হয় না।
একটি তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করল, কিন্তু নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ পেল না—তাহলে তার শিক্ষা ও মেধার পূর্ণ ব্যবহার হলো না। তাই পাহাড়ের উন্নয়নকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে দেখতে হবে।
নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাক, গান, নাচ, উৎসব, সামাজিক রীতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা রয়েছে। একটি জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন করতে গিয়ে তার নিজস্ব পরিচয় ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতিরও সম্পর্ক রয়েছে। শিশু যদি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে সম্মান করতে শেখে, একই সঙ্গে বাংলা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষাগুলোও শিখতে পারে, তাহলে তার সামনে সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়।
তাই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ ও বিকাশের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, গবেষণা, সাহিত্যচর্চা, সংগীত, নৃত্য, চলচ্চিত্র ও অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। কারণ সংস্কৃতি কোনো দুর্বলতা নয়। সংস্কৃতি একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ। শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন তরুণ যদি শিক্ষিত হওয়ার পরও নিজের এলাকায় কাজের সুযোগ না পায়, তাহলে তাকে অন্যত্র যেতে হয়। অনেকে আবার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা পুঁজি না থাকায় নিজের উদ্যোগ শুরু করতে পারে না। পাহাড়ে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কৃষি, পর্যটন, হস্তশিল্প, প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব ব্যবসা, সাংস্কৃতিক শিল্প, ফটোগ্রাফি, চলচ্চিত্র, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাহাড়ি তরুণদের শুধু চাকরি খোঁজার সুযোগ নয়, চাকরি তৈরি করার সুযোগও দিতে হবে।
মেয়েদের জন্য সুযোগ আরও বাড়াতে হবে৷ পাহাড়ি সমাজের মেয়েদের মধ্যেও অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু অনেক মেয়ে শিক্ষা, খেলাধুলা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ পায় না।
একজন পাহাড়ি মেয়ে যদি ভালো ফুটবল খেলতে পারে, তাকে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া উচিত। কেউ যদি গান গাইতে পারে, তাকে মঞ্চ দেওয়া উচিত। কেউ যদি লেখাপড়ায় ভালো হয়, তাকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া উচিত। কেউ যদি উদ্যোক্তা হতে চায়, তাকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া উচিত। কারণ একটি মেয়ের সাফল্য শুধু একজন মানুষের সাফল্য নয়—এটি একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন—আর কত প্রতিভা হারিয়ে যাবে?
পাহাড়ে কত শিশু আজও হয়তো স্বপ্ন দেখছে। তাদের কেউ হয়তো ভবিষ্যতের জাতীয় দলের খেলোয়াড় হতে পারত। কেউ হয়তো দেশের বড় বিজ্ঞানী হতে পারত। কেউ হয়তো বিশ্বমানের শিল্পী হতে পারত। কেউ হয়তো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারত।
কিন্তু আমরা জানিই না তাদের কথা। কারণ সুযোগের অভাবে অনেক প্রতিভা জন্মের পরেই হারিয়ে যায়। কোনো সংবাদপত্রে তাদের নাম আসে না, কোনো টেলিভিশনে তাদের গল্প দেখানো হয় না, কোনো বড় মঞ্চে তাদের পরিচয় হয় না। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো সেই অদেখা প্রতিভাগুলোকে খুঁজে বের করা।
পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামের একটি শিশুর স্বপ্নও বাংলাদেশের স্বপ্ন।
তার সাফল্য দেশের সাফল্য। তার প্রতিভা দেশের সম্পদ। তার শিক্ষা দেশের ভবিষ্যৎ। অধিকার মানে কারও বিরুদ্ধে যাওয়া নয়
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কথা বলার অর্থ অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়। অধিকার মানে সমান মর্যাদা, সমান সুযোগ এবং ন্যায়সংগত অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন দেশের প্রতিটি অঞ্চল এবং প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের উন্নয়নের অংশীদার মনে করবে।
পাহাড়ের মানুষও এই দেশের নাগরিক। তাদের সন্তানরাও এই দেশের সন্তান। তাদের প্রতিভাও বাংলাদেশের সম্পদ। তাই তাদের উন্নয়নকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
পাহাড়কে পিছিয়ে রেখে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না
একটি দেশের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা অন্যান্য বড় শহরে উন্নয়ন হবে, আর পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুরা মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকবে—এভাবে একটি দেশ দীর্ঘমেয়াদে সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারে না।পাহাড়ের মানুষকে উন্নয়নের অংশীদার করতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে। স্থানীয় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ যে উন্নয়ন মানুষের জীবনকে সহজ করে না, মানুষের মর্যাদা বাড়ায় না এবং মানুষের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করে না—সেই উন্নয়ন কখনো পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন হতে পারে না।
আমরা কী চাই?
👉 আমরা চাই পাহাড়ের প্রতিটি শিশু মানসম্মত শিক্ষা পাক।
👉 আমরা চাই পাহাড়ের প্রতিটি পরিবার প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাক।
👉 আমরা চাই মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ুক।
👉 আমরা চাই তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হোক।
👉 আমরা চাই পাহাড়ি মেয়েরা শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাক।
👉 আমরা চাই পাহাড়ি ভাষা ও সংস্কৃতি সম্মানের সঙ্গে সংরক্ষিত হোক।
👉 আমরা চাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হোক।
👉 আমরা চাই পাহাড়ের মেধাবী তরুণরা দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরুক।
সবচেয়ে বড় কথা—আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মানুষের ভবিষ্যৎ তার জন্মস্থান, পরিচয় বা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে না।
পাহাড়িরা পিছিয়ে নেই। পাহাড়ের মানুষও স্বপ্ন দেখে, পরিশ্রম করে, সংগ্রাম করে এবং নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চায়। তাদের মধ্যেও অসংখ্য মেধাবী শিশু, তরুণ-তরুণী ও সম্ভাবনাময় মানুষ রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সেই মেধাকে বিকশিত করার পরিবেশ।
আজ পাহাড়ে যদি একটি শিশু ভালো শিক্ষা পায়, আগামীকাল সে একজন শিক্ষক হতে পারে। একজন শিক্ষার্থী যদি বিজ্ঞান শেখার সুযোগ পায়, সে ভবিষ্যতে গবেষক হতে পারে। একজন তরুণ যদি খেলাধুলার প্রশিক্ষণ পায়, সে দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। একজন শিল্পী যদি মঞ্চ পায়, সে দেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারে।
তাই পাহাড়ের মানুষকে করুণা নয়—সুযোগ দিতে হবে।
অবহেলা নয়—সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু উন্নয়নের কথা নয়—মানুষের বাস্তব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু কয়েকজন সফল মানুষের গল্প নয়—হাজারো সম্ভাবনাময় মানুষকে উঠে আসার সুযোগ দিতে হবে। হয়তো আজ পাহাড়ের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে এমন একটি শিশু আছে, যার নাম আমরা কেউ জানি না। কিন্তু সঠিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে সেই শিশুই একদিন বাংলাদেশের পতাকা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারে। সেই সম্ভাবনাকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। পাহাড়ের প্রতিটি শিশু দেশের সম্পদ। পাহাড়ের প্রতিটি মেধা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। পাহাড়ের প্রতিটি স্বপ্নের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বপ্ন জড়িয়ে আছে।
তাই পাহাড়কে পিছিয়ে থাকা অঞ্চল হিসেবে নয়, অসীম সম্ভাবনার অঞ্চল হিসেবে দেখতে হবে। আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শিক্ষা, অধিকার, সমতা, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতির মর্যাদা এবং ন্যায়সংগত সুযোগ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
পাহাড়িরা পিছিয়ে নেই—তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ আরও প্রশস্ত করে দিতে হবে। সুযোগের দরজা খুলে দিতে হবে। কারণ সুযোগ পেলে পাহাড় থেকেই আগামী দিনের অসংখ্য ঋতুপর্ণা চাকমা, সুরাকৃঞ্চ চাকমা এবং আরও অগণিত প্রতিভাবান মানুষ উঠে আসতে পারে—যারা শুধু পাহাড় নয়, পুরো বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।
゚ ゚ TopStar