18/08/2026
শেষ মেসেজ...
মাঝরাত- ২টা ৪০
সাকিনের ফোনের স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠল। একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে..
"ধন্যবাদ, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটা দেওয়ার জন্য। ভালো থাকবেন।"
সাকিন চমকে উঠে বসলেন। নম্বরটা কার? কাউকে এই সময়ে এমন মেসেজ পাঠানোর কোনো কথা নয়। কৌতুহল সামলাতে না পেরে টাইপ করলেন, "কে আপনি? ভুল নম্বরে পাঠিয়েছেন হয়তো।"
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো, "না সাকিন সাহেব, ভুল নয়। তিন বছর আগে আপনি এক রাতে আমায় বাঁচিয়েছিলেন। আজ রাতে আমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, আর বাঁচব না। শুধু শেষবার ধন্যবাদটুকু জানাতে চাইলাম।"
সাকিনের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। তিন বছর আগে?
স্মৃতিটা ঝাপসা হলেও ভেসে উঠল। হ্যাঁ, তিন বছর আগে এক তীব্র বর্ষার রাতে রাস্তার মোড়ে একটা ছেলেকে বসে কাঁদতে দেখে তিনি গাড়ি থামিয়েছিলেন। ছেলেটার সব হারিয়েছিল ব্যবসায়। সাকিন সেদিন তার হাতে নিজের গরম কফির ফ্লাস্কটা দিয়ে বলেছিলেন, "বৃষ্টি থামবেই ভাই, একটু অপেক্ষা করুন। মেঘ যত কালো হয়, রোদের আলো তত মিষ্টি লাগে।"
সাকিন দ্রুত টাইপ করলেন, "তুমি কোথায়? ভুল কোরো না! কথা বলো আমার সাথে!"
উত্তর এলো:
"আর সময় নেই। জীবনটা বড্ড নির্মম। কত চেষ্টা করলাম, কিছুই গুছলো না। চারপাশের মানুষকে শুধু হাসতে দেখি, আর আমার ভাগ্যে শুধু আঁধার।"
সাকিন বুঝতে পারলেন, ছেলেটা একদম শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এক মুহূর্ত ভাবলেন তিনি। তারপর নিজের বর্তমান জীবনের দিকে তাকালেন। সাকিনের স্ত্রী হাসপাতালে ভর্তি, কাল সকালে বিশাল টাকার অপারেশন। সাকিন নিজেও আজ পুরো দিন শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরেছেন একটা ঋণের আশায়, কিন্তু কেউ এক টাকাও সাহায্য করেনি। ঘরের লাইট বিল বকেয়া, রেফ্রিজারেটর খালি।
সাকিন হাত কাঁপানো অবস্থায় লিখলেন:
"তুমি ভাবছো শুধু তুমিই হারছ? শোনো, আমার স্ত্রী কাল সকালে অপারেশন থিয়েটারে যাবে। আমার পকেটে এক হাজার টাকাও নেই। শহরের সব দরজায় হাত পেতে খালি হাতে ফিরেছি। তুমি বলছো তোমার আঁধার? আমার চারপাশটা এখনই আমায় গিলতে আসছে।"
ওপাশ থেকে মিনিট তিনেক কোনো উত্তর নেই। নিস্তব্ধতা যেন চেপে বসছে।
অবশেষে মেসেজ এলো: "তাহলে আপনি এখনো বেঁচে আছেন কেন? কেন চিৎকার করে কাঁদছেন না?"
সাকিন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার, কিন্তু দূরে পূব আকাশে ভোরের খুব সূক্ষ্ম একটা আলোর আভাস।
সাকিন উত্তর পাঠালেন..
"কারণ আমি জানি, রাত যত গভীর আর নিঃশব্দ হয়, ভোর তত কাছাকাছি আসে। আল্লাহ আমায় আলো দেখার আগেই আলো পাওয়ার বিশ্বাসটা দিয়েছেন। তিনি আমাকে নিঃশ্বাস নেওয়ার ক্ষমতাটুকু অন্তত বাকি রেখেছেন। যে শ্বাসটুকু আমার বুকের ভেতর চলছে, সেটাই তো তাঁর সবচেয়ে বড় রহমত। যার শ্বাস আছে, তার আশাও আছে।"
মেসেজটা পাঠানোর পর পাঁচ মিনিট পার হলো। দশ মিনিট। কোনো রিপ্লাই নেই। কল দিলেন, বন্ধ। সাকিনের বুক দড়ফড় করতে লাগল—ছেলেটা কিছু করে ফেলল না তো?
ঠিক ভোর ৫টা ১০ মিনিটে ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে সেই নম্বর। সাকিন তাড়াতাড়ি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ ভেসে এলো।
ছেলেটা ভাঙা গলায় বলল, "সাকিন ভাই... আমি ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়েছিলাম। লাফ দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আপনার মেসেজটা পাই। আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। আপনার স্ত্রীর হাসপাতালের নামটা আমাকে পাঠান, আমার জমানো কিছু টাকা আছে... সবটা হয়তো হবে না, কিন্তু এটুকুই আমার কাছে আছে।"
সাকিন ফোনের ওপাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
যে বিপদের কারণে তিনি সারাদিন স্রষ্টাকে দোষারোপ করছিলেন, সেই বিপদটাই আজ আরেকটা মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল! যদি সাকিন নিজে আজ বিপদে না পড়তেন, তবে ছেলেটির বুকের কষ্টটা তিনি অনুধাবন করতে পারতেন না, তাকে থামানোর তীব্রতা খুঁজে পেতেন না।
সাকিন ফোনটা কেটে দু’হাত মুখে চেপে বারান্দায় হাঁটুমুড়ে বসে পড়লেন। পূব আকাশে তখন লাল সূর্যটা ফুটছে।
অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করলেন—
"আলহামদুলিল্লাহ!"
আপনার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অন্ধকার মুহূর্তটিও হয়তো অন্য কারও জীবনে আলো জ্বালানোর ছক। যা ঘটছে, তার পেছনে আল্লাহ তাআলার এক গভীর আর সুন্দর পরিকল্পনা রয়েছে—বিশ্বাস রাখুন। 🤍
Hamdullah-হামদুল্লাহ