17/04/2026
আমার স্বামী মিস্টার ইয়াসিন আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে তার প্রেমিকা সুহাসিনীকে নিয়ে কক্সবাজারে ঘুরতে গেল। যাওয়ার আগে ইয়াসিন শুধু একটা মেসেজ পাঠালো, “এই ছুটিটা তোমার চেয়ে বেশি প্রাপ্য। তুমি বাসায় থাকো, ঘর পরিষ্কার করো ওটাই তোমার কাজ।”
আমি কোনো উত্তর দিইনি।
আমি শুধু আমাদের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বিক্রি করে দেশ ছেড়ে চলে গেলাম। তারা যখন রোদে পুড়ে হাসিমুখে ফিরে এল, তখন সেই বাড়িটা আর তাদের ছিল না।
ভোরের আলো ঢাকার গুলশানের আমাদের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছিল।
সময় সকাল ৬টা ১০। শহরটা তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল, এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছিল।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে ছিলাম মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, যেন ভিতরের সব অনুভূতি একসাথে জমে পাথর হয়ে গেছে।
আলমারির দরজা খুলে একটা সিল্কের জামা বের করলাম, ধীরে ধীরে ভাঁজ করে রাখলাম ইয়াসিনের দামী স্যুটগুলোর পাশে। আজ আমাদের বিয়ের ছয় বছর পূর্ণ হলো।
এই ছয় বছরে আমি কতবার নিজেকে বদলেছি, কতবার নিজের ইচ্ছে মেরে ফেলেছি তার হিসাব নেই।
সকাল ৮টার ফ্লাইটে কক্সবাজার যাওয়ার কথা ছিল, ইয়াসিনেরই পরিকল্পনা তার মতে, এই ট্রিপ নাকি আমাদের সম্পর্কের দূরত্ব কমাবে।
কিন্তু আমি জানতাম, এই সম্পর্ক অনেক আগেই ভেঙে গেছে, শুধু নামটা বেঁচে আছে। ছয় বছর ধরে আমি তার জীবনের নীরব ভরসা হয়ে ছিলাম। তার রাত করে বাসায় ফেরা, অস্পষ্ট অজুহাত, ফোন লুকিয়ে কথা বলা, আর তার জামায় লেগে থাকা অচেনা পারফিউমের গন্ধ সব আমি দেখেও না দেখার ভান করেছি।
আমি সবকিছু ঠিকঠাক রেখেছি, যেন সে নির্বিঘ্নে নিজের কাজ, নিজের ব্যবসা, নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে। তার কাছে আমি কোনো সঙ্গী ছিলাম না, আমি ছিলাম শুধু একটা নিশ্চিন্ত জায়গা যেখানে সে ফিরে আসতে পারে, যখন তার প্রয়োজন।
হঠাৎ আমার ফোনটা কেঁপে উঠল। সময় সকাল ৬টা ১৪। ইয়াসিনের মেসেজ। সে একটু আগেই বাসা থেকে বের হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম হয়তো সাধারণ কিছু বলবে ফ্লাইটের কথা, বা দেরি হচ্ছে এই ধরনের কিছু।
কিন্তু মেসেজটা খুলতেই সবকিছু বদলে গেল। “রুহানি, এয়ারপোর্টে আসার দরকার নেই।
আমি সুহাসিনীকে নিয়ে যাচ্ছি। এই বিয়েটা আমার কাছে এখন ক্লান্তিকর। একটু দূরে থাকতে চাই। ও এই ট্রিপটা তোমার চেয়ে বেশি প্রাপ্য। তুমি বাসায় থাকো, ঘর পরিষ্কার করো, আর কোনো নাটক করো না।
আমি ফিরে এসে সব ঠিক করে ফেলব।” কয়েক সেকেন্ড আমি স্থির হয়ে বসে থাকলাম। কোনো অনুভূতি কাজ করছিল না না কষ্ট, না রাগ, না অপমান শুধু একধরনের শূন্যতা। সে আমাকে সবকিছু করতে দেখেছে তার জন্য রান্না করা, তার জন্য অপেক্ষা করা, তার জন্য নিজের সবকিছু ত্যাগ করা—আর তারপর একটা মেসেজ দিয়ে আমাকে মুছে ফেলল।
আমি আবার সেই লাইনটা পড়লাম“ এই ট্রিপটা তোমার চেয়ে বেশি প্রাপ্য।” হঠাৎ করে আমার ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল। প্রথমে ছোট, তারপর ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। আমি হেসে উঠলাম কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল শুধু ঠাণ্ডা হিসেব।
কারণ ইয়াসিন একটা বড় ভুল করেছে।
সে ভেবেছে এই বাসা তার, এই জীবন তার, এই আরাম তার। কিন্তু সে জানে না এই পেন্টহাউসটা কখনোই তার ছিল না। তিন বছর আগে আমার খালা খালেদা বেগম এই বাসাটা কিনে আমার নামে করে দিয়েছিলেন।
তিনি আমাকে বলেছিলেন, “নিজের জন্য কিছু রেখে দিস, রুহানি।” তখন আমি গুরুত্ব দিইনি, কারণ আমি ভাবতাম আমার স্বামীই আমার সবকিছু।
কিন্তু আজ বুঝলাম, তিনি কতটা ঠিক ছিলেন। সব কাগজপত্র এমনভাবে করা ছিল, যেখানে আমার ছাড়া আর কারো কোনো অধিকার নেই।
আইন অনুযায়ী, ইয়াসিন এই বাসার মালিক না সে শুধু একজন অতিথি। আমি ফোনটা হাতে নিলাম এবং তানভীর রহমানকে কল দিলাম।
সে আমার খালার পরিচিত, বিশ্বাসযোগ্য একজন মানুষ। “হ্যালো আপা?” সে বলল। আমি শান্ত গলায় বললাম, “বাসাটা বিক্রি করতে হবে।”
সে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এত হঠাৎ?” আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে বললাম, “হ্যাঁ। মার্কেটের চেয়ে কম দামে দিলেও সমস্যা নেই। দ্রুত ডিল শেষ করতে হবে। বৃহস্পতিবারের আগেই।” ফোনটা কেটে দেওয়ার পর আমি ধীরে ধীরে পুরো বাসাটা ঘুরে দেখলাম।
এই সোফায় আমরা একসাথে বসে সিনেমা দেখতাম, এই ডাইনিং টেবিলে বসে আমি অনেক রাত একা একা খেয়েছি, এই বেডরুমে আমি অসংখ্য রাত অপেক্ষা করেছি—আর আজ সবকিছু শেষ। পরের কয়েকটা দিন খুব দ্রুত কেটে গেল। তানভীর কথা রেখেছিল।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একজন ক্রেতা পাওয়া গেল—সে নগদ টাকা দিতে রাজি ছিল। দাম একটু কম হলেও আমার তাতে কিছু যায় আসে না। বৃহস্পতিবারের আগেই সব কাগজপত্র সম্পন্ন হয়ে গেল।
আমি শেষবারের মতো বাসাটার দিকে তাকালাম। কোনো আফসোস ছিল না, কোনো কষ্ট ছিল না শুধু এক ধরনের মুক্তি।
আমি চাবিটা নতুন মালিকের হাতে তুলে দিলাম, আর কোনো কথা না বলে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। এরপর আমি সরাসরি এয়ারপোর্টে গেলাম।
আমার হাতে ছিল শুধু একটা ছোট ব্যাগ কিন্তু মনে হচ্ছিল, আমি যেন একটা বিশাল বোঝা নামিয়ে ফেলেছি।
কয়েক ঘণ্টা পর, যখন ইয়াসিন আর সুহাসিনী কক্সবাজার থেকে ফিরে এল রোদে পুড়ে, হাসতে হাসতে তারা এসে দেখল, দরজায় নতুন তালা। তাদের পুরোনো চাবি আর কাজ করছে না। তারা বারবার চেষ্টা করল, কল করল—কিন্তু আমি আর তখন এই দেশে নেই।
আমি প্লেনে বসে ছিলাম, জানালার বাইরে মেঘের দিকে তাকিয়ে। আমার ফোনে তখন একের পর এক কল আসছে ইয়াসিন, অচেনা নম্বর, মেসেজ।
আমি একবারও ফোনটা ধরলাম না। শুধু একটা ছোট মেসেজ পাঠালাম “এই বাসাটা কখনো তোমার ছিল না।
তুমি শুধু একজন অতিথি ছিলে। এবার নিজের জায়গা খুঁজে নাও।” তারপর আমি ফোনটা বন্ধ করে দিলাম।
প্লেনটা ধীরে ধীরে আকাশে উঠে গেল, আর আমি অনুভব করলাম ছয় বছরের সব অপমান, সব অপেক্ষা, সব কষ্ট… নিচে পড়ে রয়ে গেল।
আমি প্রথমবারের মতো সত্যিকারের মুক্ত হলাম।
চলবে..
রুহানির_প্রতিশোধ
পর্ব-০১
লেখক~ 𝐒𝐭𝐨𝐫𝐲 𝐨𝐟 𝐘𝐞𝐚𝐬𝐢𝐧 𝐍𝐞𝐞𝐥