14/09/2026
রাসুলুল্লাহ ﷺ যেসব কাজ থেকে নিষেধ করেছেন
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন কিছু কাজ থেকে নিষেধ করেছেন, যেগুলো মানুষের দ্বীন, চরিত্র, পবিত্রতা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সম্পর্ক ও পারিবারিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর।
হাদিসের ভাষায় যখন বলা হয়—
نَهَى رَسُولُ اللهِ ﷺ
“রাসুলুল্লাহ ﷺ নিষেধ করেছেন”
তখন একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো—সেই নিষেধাজ্ঞাকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিষেধ থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা।
নিচে “نَهَى رَسُولُ اللهِ ﷺ” শব্দসম্বলিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস একত্রে তুলে ধরা হলো।
▪️১. জানাজার সঙ্গে বিলাপ করা নিষিদ্ধ
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُتْبَعَ جَنَازَةٌ مَعَهَا رَانَّةٌ
রাসুলুল্লাহ ﷺ এমন জানাজার পেছনে চলতে নিষেধ করেছেন, যার সঙ্গে কোনো বিলাপকারী বা উচ্চস্বরে ক্রন্দনকারী নারী থাকে।
—সহীহ ইবনে মাজাহ: ১৫৮৩
▪️২. জীবন্ত প্রাণীকে নিশানা বানিয়ে হত্যা নিষিদ্ধ
আনাস ইবনে মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُصْبَرَ الْبَهَائِمُ
রাসুলুল্লাহ ﷺ গৃহপালিত পশুকে বেঁধে রেখে হত্যা করতে বা তীর-অস্ত্রের নিশানা বানাতে নিষেধ করেছেন।
—সহীহ মুসলিম: ১৯৫৬
▪️৩. বদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করা নিষিদ্ধ
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত—
أَنَّهُ نَهَى أَنْ يُبَالَ فِي الْمَاءِ الرَّاكِدِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ বদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করতে নিষেধ করেছেন।
—সহীহ মুসলিম: ২৮১
▪️৪. গোসলের স্থানে প্রস্রাব করা নিষিদ্ধ
আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى أَنْ يَبُولَ الرَّجُلُ فِي مُسْتَحَمِّهِ
নবী ﷺ মানুষকে তার গোসলের স্থানে প্রস্রাব করতে নিষেধ করেছেন।—সহীহ আল-জামি: ৬৮১৫
▪️৫. পুরুষের জাফরান ব্যবহার নিষিদ্ধ
আনাস ইবনে মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَتَزَعْفَرَ الرَّجُلُ
নবী ﷺ পুরুষদের জাফরান ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন।—সহীহ বুখারী: ৫৮৪৬
▪️৬. পানির পাত্রে শ্বাস বা ফুঁ দেওয়া নিষিদ্ধ
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُتَنَفَّسَ فِي الإِنَاءِ، أَوْ يُنْفَخَ فِيهِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ পান করার পাত্রে শ্বাস ফেলতে অথবা ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন।—সহীহ আবু দাউদ: ৩৭২৮
▪️৭. এক কাপড়ে অশালীনভাবে বসা নিষিদ্ধ
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ اشْتِمَالِ الصَّمَّاءِ، وَأَنْ يَحْتَبِيَ الرَّجُلُ فِي ثَوْبٍ وَاحِدٍ، لَيْسَ عَلَى فَرْجِهِ مِنْهُ شَيْءٌ
রাসুলুল্লাহ ﷺ এক কাপড়ে পুরো শরীর এমনভাবে পেঁচিয়ে রাখা এবং এক কাপড় পরিহিত অবস্থায় এমনভাবে বসা, যাতে লজ্জাস্থান ঢাকা না থাকে—নিষেধ করেছেন।
—সহীহ বুখারী: ৩৬৭
▪️৮. শিশুর মাথায় ক্বাযা করা নিষিদ্ধ
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত—
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنِ الْقَزَعِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ ‘ক্বাযা’ করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ শিশুর মাথার কিছু অংশের চুল মুণ্ডানো এবং কিছু অংশ রেখে দেওয়া।—সহীহ মুসলিম: ২১২০
▪️৯. হিংস্র দাঁতবিশিষ্ট প্রাণীর গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ
আবু ছালাবা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ أَكْلِ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنَ السِّبَاعِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ হিংস্র পশুর মধ্যে সুচালো দাঁতবিশিষ্ট প্রাণীর গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।—সহীহ বুখারী: ৫৫৩০
▪️১০. ফজর ও আসরের পর নির্দিষ্ট সময়ে নফল সালাত নিষিদ্ধ
আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَلاَتَيْنِ: بَعْدَ الْفَجْرِ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، وَبَعْدَ الْعَصْرِ حَتَّى تَغْرُبَ الشَّمْسُ
রাসুলুল্লাহ ﷺ ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত এবং আসরের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন।
—সহীহ বুখারী: ৫৮৮
▪️১১. বিরতিহীনভাবে রোজা রাখা নিষিদ্ধ
আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْوِصَالِ فِي الصَّوْمِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ দিন-রাত খাবার গ্রহণ না করে টানা রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন।—সহীহ বুখারী: ১৯৬৫
▪️১২. ঈদের দিনে রোজা রাখা নিষিদ্ধ
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَوْمَيْنِ: يَوْمِ الْفِطْرِ، وَيَوْمِ الأَضْحَى
▪️রাসুলুল্লাহ ﷺ ঈদুল ফিতরের দিন এবং ঈদুল আজহার দিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন।—সহীহ মুসলিম: ১১৪০
▪️১৩. শুধু শুক্রবারের দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ
আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الْجُمُعَةِ، إِلاَّ بِيَوْمٍ قَبْلَهُ، أَوْ يَوْمٍ بَعْدَهُ
রাসুলুল্লাহ ﷺ শুধু শুক্রবারের দিন এককভাবে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন; তবে তার আগের দিন অথবা পরের দিনসহ রোজা রাখলে তা ভিন্ন।
—সহীহ ইবনে মাজাহ: ১৪১০
▪️১৪. স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখা নিষিদ্ধ
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النِّسَاءَ أَنْ يَصُمْنَ إِلاَّ بِإِذْنِ أَزْوَاجِهِنَّ
রাসুলুল্লাহ ﷺ নারীদের স্বামীদের অনুমতি ছাড়া (নফল) রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন।
—সহীহ ইবনে মাজাহ: ১৪৩৮
▪️১৫. সালাতে মুখ ঢেকে রাখা নিষিদ্ধ
আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُغَطِّيَ الرَّجُلُ فَاهُ فِي الصَّلاَةِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ সালাতের মধ্যে কোনো পুরুষের মুখ ঢেকে রাখা নিষেধ করেছেন।—সহীহ ইবনে মাজাহ: ৭৯৮
▪️১৬. সালাতে কোমরে হাত রাখা নিষিদ্ধ
আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الاِخْتِصَارِ فِي الصَّلاَةِ
অর্থ: রাসুলুল্লাহ ﷺ সালাতের মধ্যে ‘ইখতিসার’ করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ কোমরের ওপর হাত রাখা।
—সহীহ আবু দাউদ: ৯৪৭
▪️১৭. একই সময়ে নারী ও তার ফুফু/খালাকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ
জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُنْكَحَ الْمَرْأَةُ عَلَى عَمَّتِهَا أَوْ خَالَتِهَا
রাসুলুল্লাহ ﷺ কোনো নারীকে তার ফুফু অথবা খালার সঙ্গে একই ব্যক্তির বিবাহবন্ধনে যুক্ত করতে নিষেধ করেছেন।—সহীহ বুখারী: ৫১০৮
▪️১৮. ‘শিগার’ বা বিনিময় বিবাহ নিষিদ্ধ
আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الشِّغَارِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ ‘শিগার’ বা বিনিময় বিবাহ নিষিদ্ধ করেছেন।
শিগার: এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির সঙ্গে এভাবে বিবাহের বিনিময় করা যে, “তুমি তোমার মেয়েকে আমার সঙ্গে বিয়ে দাও, আমি আমার মেয়েকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দেব”—ইত্যাদি।—সহীহ মুসলিম: ১৪১৬
▪️১৯. দুর্গন্ধযুক্ত খাবার খেয়ে মসজিদে আসা নিষিদ্ধ
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، عَنْ أَكْلِ الْبَصَلِ وَالْكُرَّاثِ
এরপর তিনি বলেন—
مَنْ أَكَلَ مِنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ الْمُنْتِنَةِ، فَلاَ يَقْرَبَنَّ مَسْجِدَنَا، فَإِنَّ الْمَلاَئِكَةَ تَتَأَذَّى، مِمَّا يَتَأَذَّى مِنْهُ الإِنْسُ
রাসুলুল্লাহ ﷺ পেঁয়াজ ও দুর্গন্ধযুক্ত উদ্ভিদ খেয়ে মসজিদের কাছে আসতে নিষেধ করেছেন। কারণ মানুষ যে জিনিসে কষ্ট পায়, ফেরেশতারাও তাতে কষ্ট পান।
—সহীহ মুসলিম: ৫৬৩
▪️২০. পুরুষের সোনার আংটি পরা নিষিদ্ধ
আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ التَّخَتُّمِ بِالذَّهَبِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ (পুরুষদেরকে) সোনার আংটি পরিধান করতে নিষেধ করেছেন।—সহীহ ইবনে মাজাহ: ২৯৫৩
▪️২১. তৃতীয় ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে গোপনে কানাকানি নিষিদ্ধ
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَتَنَاجَى اثْنَانِ دُونَ الثَّالِثِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ তৃতীয় ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে দুজনের গোপনে কানাকানি বা ফিসফিস করে কথা বলতে নিষেধ করেছেন।—সহীহ ইবনে মাজাহ: ৩০৫৮
▪️২২. নির্দিষ্ট কিছু পাত্রে পানীয় প্রস্তুত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল
ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنِ الْحَنْتَمِ، وَهِيَ الْجَرَّةُ، وَعَنِ الدُّبَّاءِ، وَهِيَ الْقَرْعَةُ، وَعَنِ الْمُزَفَّتِ، وَهُوَ الْمُقَيَّرُ، وَعَنِ النَّقِيرِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ ‘হানতাম’, ‘দুব্বা’, ‘মুযাফফাত’ ও ‘নাকির’—এ ধরনের পাত্রে পানীয় প্রস্তুত করতে নিষেধ করেছিলেন।—সহীহ মুসলিম: ১৯৯৭
গুরুত্বপূর্ণ নোট: পরবর্তীতে এই নিষেধাজ্ঞা পরিবর্তিত হয়েছে। তাই এসব পাত্রকে বর্তমানে সর্বাবস্থায় হারাম বলা সঠিক নয়; মূল বিষয় হলো—নেশাজাতীয় পানীয় থেকে বেঁচে থাকা।
▪️২৩. মুখে আঘাত ও মুখে দাগ দেওয়া নিষিদ্ধ
জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الضَّرْبِ فِي الْوَجْهِ، وَعَنِ الْوَسْمِ فِي الْوَجْهِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ মুখে আঘাত করতে এবং মুখে দাগ বা সিল মারতে নিষেধ করেছেন।—সহীহ মুসলিম: ২১১৬