04/06/2026
ক্লোজ করাই কি শাস্তি? পুলিশি জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
কলাম | মতামত
রংপুর কোতোয়ালি থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রাকিবুল ইসলামকে মারধরের অভিযোগে ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার বা ‘ক্লোজড’ করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—একজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তাকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করাই কি প্রকৃত শাস্তি?
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, হেফাজতে মৃত্যু কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তাকে ‘ক্লোজড’, ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ বা অন্যত্র বদলি করা হয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কতজনের চাকরিচ্যুতি হয়েছে? কতজন প্রকৃত অর্থে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছেন? সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর সাধারণ মানুষ খুব কমই পেয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত কেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশই করে? একটি বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিয়েই তদন্ত করানো হয়। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়। অনেকেই মনে করেন, এমন স্পর্শকাতর ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে স্বাধীন তদন্ত সংস্থা, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন বা মানবাধিকার কমিশনের মতো কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া উচিত।
রাকিবুল ইসলামের ঘটনাও সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। অভিযোগ সত্য হলে একজন নাগরিক থানার ভেতরেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যে জায়গাটি মানুষের নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেই স্থানেই যদি কেউ মারধরের শিকার হন, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপত্তা খুঁজবে?
এখানে আরও একটি বাস্তবতা রয়েছে। রাকিবুল ইসলাম একজন রাজনৈতিক দলের নেতা। তার ওপর হামলার অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে, রাজনৈতিক দল প্রতিবাদ করেছে, প্রশাসনও দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কত সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে হয়রানি, দুর্ব্যবহার কিংবা নির্যাতনের শিকার হন, যাদের ঘটনা কখনো সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয় না? যাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংগঠনিক শক্তি নেই?
পুলিশ রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জবাবদিহিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো প্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
বর্তমান প্রজন্ম পুলিশের প্রতি কী ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছে, সেটিও ভাবনার বিষয়। তারা কি পুলিশকে জনগণের বন্ধু ও সেবক হিসেবে দেখছে, নাকি ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে? অতীতের কর্তৃত্ববাদী ও ভয়ভীতিনির্ভর আচরণের সংস্কৃতি কি এখনো বহাল রয়েছে? নাকি পুলিশ বাহিনী সত্যিই জনবান্ধব ও মানবিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে?
রাকিবুল ইসলামের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কী বলবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে জনগণ শুধু তদন্ত কমিটির রিপোর্ট নয়, দৃশ্যমান ন্যায়বিচার দেখতে চায়। কারণ বিচার শুধু হওয়াই যথেষ্ট নয়, বিচার হয়েছে—এটিও মানুষের কাছে স্পষ্ট হতে হবে।
আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই একটাই—এই ঘটনায় কি সত্যিই দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, নাকি আগের বহু ঘটনার মতো এটি কেবল প্রশাসনিক রুটিন প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
রাকিবুল ইসলাম ন্যায়বিচার পাবেন কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে, পুলিশি জবাবদিহিতা, স্বাধীন তদন্ত এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশের সামনে এখনো অনেক পথ বাকি।
ছাদেকুল ইসলাম রাজু,
প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক
সদর উপজেলা প্রেসক্লাব,
— কলামটি লেখকের ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন।