15/08/2026
গোদাগাড়ীতে ৩৬ বছর আগে বন্দোবস্ত পাওয়া জমিও দখলে, অন্যের আশ্রয়ে বাবুলাল
।। শান্ত পাহান, আঞ্চলিক প্রতিনিধি ।। সরকারের কাছ থেকে ৩৬ বছর আগে ১৬ কাঠা জমি বন্দোবস্ত পেয়েছিলেন ভূমিহীন বাবুলাল টুডু। কাগজপত্রে জমিটি এখনো তাঁর নামেই রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই জমিতে বসবাস করছে অন্য দুটি পরিবার। জমির কিছু অংশ ফাঁকা থাকলেও নিজের বন্দোবস্ত পাওয়া জমিতে ঘর তুলে বসবাসের সুযোগ হয়নি বাবুলালের। ফলে নিজের জমি থাকা সত্ত্বেও অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহালাল গ্রামের এক আত্মীয়ের জমিতে ছোট ছোট তিনটি মাটির ঘরে পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে বসবাস করেন বাবুলাল টুডু। অথচ পাশের চাত্রাপুকুর গ্রামে তাঁর নামে রয়েছে সরকারি বন্দোবস্ত পাওয়া জমি। বর্তমানে ওই জমিতে বসবাস করছেন অন্যরা।
নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৮৯-৯০ সালে গোদাগাড়ীর ১৩৭ নম্বর নন্দাপুর মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ২৯৮ নম্বর দাগে ২৬ শতক জমি ভূমিহীন বাবুলাল টুডুর নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। পরে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ২৯৭ নম্বর হোল্ডিংও চালু করা হয়।
তবে বাবুলাল বাড়ি নির্মাণের আগেই জমিটি বেদখল হয়ে যায়। নিজের বন্দোবস্ত পাওয়া জমির দখল ফিরে পেতে ২০২৩ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন তিনি। পরে ওই বছরের ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাহিদ হাসান বিষয়টি তদন্ত করে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বাবুলাল টুডুর নামে জমিটি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর নামে কবুলিয়ত দলিল রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এরপরও জমির দখল বুঝে পাননি বাবুলাল। এ কারণে গত বছর তিনি আবারও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে জমিটির বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রোববার উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার নাজমুল হাসান নন্দাপুর মৌজায় গিয়ে নকশা ও জমির অবস্থান সরেজমিনে যাচাই করেন। এ সময় বাবুলাল টুডু ও তাঁর ছেলে সুধীর টুডু উপস্থিত ছিলেন। সরেজমিনে নকশা ও জমির অবস্থান মিলিয়ে দেখা যায়, ২৯৮ নম্বর দাগের দক্ষিণ অংশে রয়েছে শহিদুল ইসলামের বাড়ি। কিছুটা উত্তরে ফাঁকা জায়গার পর রয়েছে বেনজিন রহমান সুমনের বাড়ি।
সার্ভেয়ার নাজমুল হাসান বলেন, নকশা ও জমির অবস্থান যাচাই করে দেখা গেছে, দুইটি বাড়ি এবং মাঝের ফাঁকা জায়গাসহ পুরো অংশই বাবুলাল টুডুর নামে বন্দোবস্ত দেওয়া জমির মধ্যে পড়েছে। জমিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫৫ ফুট এবং প্রস্থ ৭৫ ফুট। বন্দোবস্তের পর থেকে জমিটি বাবুলাল টুডুর নামেই রয়েছে। বর্তমানে অন্যরা সেখানে দখলে আছেন।
নিজের জমিতে ঘর তুলতে না পারার আক্ষেপ করে বাবুলাল টুডু বলেন, সরকার তাঁকে বসবাসের জন্য জমি দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগেই অন্যরা বাড়ি নির্মাণ করে জমি দখলে নেয়। তাঁর নামে ১৬ কাঠা জমি থাকার পরও অন্যের জায়গায় বসবাস করতে হচ্ছে। তিনি নিজের জমি ফিরে পাওয়ার দাবি জানান।
এদিকে ওই এলাকায় আরও একটি খাসজমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বেনজিন রহমান সুমনের বাড়ির উত্তরে খাসজমির পাশে বলরাম কর্মকারের পরিবার বসবাস করে। বলরামের স্ত্রী কল্পনা রানীর অভিযোগ, তাঁদের বাড়িসহ পাশের ফাঁকা জায়গা দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ নিয়ে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এ বিষয়ে বেনজিন রহমান সুমনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর চাচা হারুন-অর-রশিদ বলেন, বলরাম কর্মকারের পরিবারকে তাঁর ভাই ওই জায়গায় বাড়ি করার অনুমতি দিয়েছিলেন।
হারুন-অর-রশিদ একটি খতিয়ান দেখিয়ে ওই জমি তাঁর বাবা আমিনউদ্দীনের বলে দাবি করেন। পরে সার্ভেয়ার নাজমুল হাসান খতিয়ান যাচাই করে জানান, আমিনউদ্দীনের জমি ২৯৭ নম্বর দাগে। আর তাঁদের বাড়িটি রয়েছে ২৯৮ নম্বর দাগে। এই ২৯৮ নম্বর দাগের জমিই ৩৬ বছর আগে বাবুলাল টুডুর নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল।
এ সময় হারুন-অর-রশিদ বলেন, বাড়িটি যদি সত্যিই বাবুলাল টুডুর বন্দোবস্ত পাওয়া জমির মধ্যে পড়ে, তাহলে তাঁর সঙ্গে আপস-মীমাংসা করা হবে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুল ইসলাম বলেন, সার্ভেয়ারের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করা হবে। প্রতিবেদনে বাবুলাল টুডুর বন্দোবস্ত পাওয়া জমিতে অন্যের বাড়ি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নিয়ে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হবে। এরপর আইন অনুযায়ী অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে বাবুলালকে তাঁর বন্দোবস্ত পাওয়া জমি বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে কাগজে নিজের নামে থাকা জমির দখল ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন বাবুলাল টুডু। এখন প্রশাসনের তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি।