18/07/2026
আমরা যখন ছোট ছিলাম, এই মানে স্কুলে পড়তাম আপনেরা একা একা কোথাও ঘুরতে যাইতে দিতেন না। ছোট মানুষ একা একা গেলে হারায় যাবে। আমরা যাইতাম না কোথাও।বারান্দায় বইসা বইসা আকাশ দেখতাম।
আমরা একটু বড় হইলাম এই ধরেন কলেজে; তখন ইন্টারের সিলেবাস আমাদের জাইত্যা ধরলো।মোটামুটি হিউজ লেভেলের কঠিন পড়াশুনার মধ্যে আমরা কোথাও যাইতে পারলাম না।সবাই কইল ইন্টারটা পাশ কইরা কোথাও ভর্তি হয়া ঘুরতে যাইস। কোনো ভাল জায়গায় চান্স পাইলে আর চিন্তা নাই। যা খুশি তাই করবি।
(এই ভাল জায়গা জিনিসটা কি আমি আজ পর্যন্ত বুঝতে পারি নাই। এইটা আসলে কার জন্য ভাল? আমাদের জন্য না আপনাদের জন্য?)
ইন্টার পাশ কইরা ভাল জায়গায় চান্স পাইতে আমরা পড়লাম। তারপর তথাকথিত ভাল জায়গায় চান্স পাইলো কেউ কেউ।যারা পাইল না তাদেরকে আপনেরা অনেক কথা শুনাইলেন,অপমান করলেন।তারা লজ্জা পাইলো,মন খারাপ করল,ডিপ্রেস হইল। আপনাদের কিছু আসল গেল না।
কিন্তু আফসোস এই ভার্সিটি মার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার চক্করে আবার আপনেরা আমাদেরকে কোথাও ঘুরতে যাইতে দিলেন না।
ভার্সিটি মার্সিটিতে উইঠা আমাদের টাকার খুব ক্রাইসিস শুরু হইলো। এমন একটা বয়স বাপের কাছে টাকা চাইতেও লজ্জা লাগে আবার না চায়াও পারা যায় না। আমরা টিউশনি করাইতাম।পড়াশুনা করতাম। সিজিপিএ বাড়াইতাম,ফেল করতাম সমানে,তারপর আবার পরীক্ষা দিতাম।চার পাঁচ হাজার টাকায় মেস লাইফ কাটাইতাম।টিউশনি করাইতে যায়া ড্যাম বিস্কিট আর পিঁপড়া ভাসা চা খাইতে খাইতে ঢুলতাম।
এরমধ্যেই আমরা স্বপ্ন দেখতাম অনেক টাকা হইলে আমরা অনেকখানে যাব।
মেয়েরা পড়ল আরেক ফাঁপড়ে। ট্যুরে ফ্যুরে যাইতে চাইলে " বিয়ার পর একবারে জামাই নিয়া যাইস" এডি কথা শুনে নাই এমন মেয়ে খুব কম আছে মনে হয়।
যাই হউক এই টাকা নাই আর সিজিপিএ বা পাশ ফেলের চক্করে আমরা আবার ঠিকমত কোথাও ঘুরতে যাইতে পারলাম না।
এরপর আমরা পাশ করলাম। নিজের ভাতের দায়িত্ব নিজে নিতে আমরা ছড়ায় গেলাম।
চাকরী খুঁজি, GRE পড়ি,এমেরিকান ড্রিমস দেখি,কেউ ক্যডার হইতে চাই,কেউ পোস্টগ্রাড করতে চায়। আপনেরা কইলেন " এখন কীসের ঘুরাঘুরি। আগে লাইফ সেটেল করো।ভাল একটা জব করো। টেকা কামাও,সামনে বিয়া করা লাগব।তারপর ঘুরতে যাইও।"
যদিও এ লাইফ সেটেল বালটা কি আমরা ঠিক বুঝি না তাও যে যার মত লাইফ সেটেল করা শুরু করলাম! এই লাইফ সেটেলের ধান্দায় বন্ধুরা সব হারায়া গেল। আমাদের আবার কোথাও ঘুরতে যাওন হইল না।
এরপর চাকরি হইল৷ স্যুট প্যান্ট পইড়া গলায় টাইয়ের ফাঁস লাগায় অফিসে যাইতে না যাইতেই আমরা বুঝলাম ৮-৫ টার একটা সময়ের ফাঁসও গলায় লাগসে। এই ফাঁসে হাঁসফাঁস লাগে। নড়া চড়ার কি উপায়? মাস শেষে একাউন্টে কিছু টাকা আসতেসে ঠিক,কিন্তু কোথাও আর ঘুরতে যাইতে পারলাম না।সময় কই?
চাকরিটা বুইঝা না উঠতে উঠতে আপনেরা কইলেন " ডিগ্রি আছে,চাকরি আছে, বিয়া করতেসো না ক্যান?বিয়া করো।" আমরা বিয়া করলাম। সংসার শুরু হইল। মাত্র বাজার করাটা শিখতেসি,আলু পিঁয়াজের এক্সাক্ট দাম কত হওয়া উচিত বোঝার চেষ্টা করতেসি তখন আবার আপনেরা কইলেন " ডিগ্রি আছে,চাকরি আছে,বিয়া করসো,বাচ্চা নাই ক্যান?বাচ্চা নেও!" আমরা বাচ্চা নিলাম।সব ঠিকঠাক এত সুদিং,এত চোখ ধাঁধানো একটা জীবন। খালি কেউ দেখলো না আমি আবার কোথাও ঘুরতে যাইতে পারলাম না।
এরপর এমনে চলতে চলতে একসময় আমাদের ফিজিকালি মৃত্যু হবে।মরার আগ দিয়া সব থাকবে। বাড়ি গাড়ি,বউ বাচ্চা নাতি-পুতি টেকা পয়সা মানে যা যা আপনেরা চাইসিলেন।আমাদের কাছে এক্সপেক্ট করসিলেন আরকি।
কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে পাহাড়ে শুইয়া শুইয়া চুপচাপ যে আকাশটুকু দেখতে চাইসিলাম সেই আকাশটুক আমাদের আর দেখা হইল না।
আমরা কোথাও ঘুরতে যাইতে পারলাম না।
লেখাঃ এরাবী