11/02/2026
পর্ব ৩ : "শেষ পর্বের কেবিন কালচার - কাটলেট"
লাট-বেলাটের শহর কলকাতার সেই সাহেবি কলকাতার রেস্টোর্যান্ট যা ছিল এক ফিরিঙ্গি কালচার এর যুগ ভেঙেছিল চৈনিক চৌমিন সৈন্য।
ফুটপাতের রোল আর চাউমিনের লাগাতার আগ্রাসন ও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে । রাস্তায় মোড়ে মোড়ে এখন আর রোল চাউমিনের বড় চাটুর টং টং শব্দ খুব কেনো একটুও কানে আসে না এখন আর । এখন এসেছে মোমো, নাগেটস, কাবাব, সোয়ার্মা, ডাল বড়ার জোয়ার। তেলেভাজা আর ফুচকা তাও টিম টিম করে অস্তিত্বের লড়াইয়ে টিকে আছে । একটা করে হলেও পাড়ায় পাবেন । এই টুকুই । একে একে নিবিছে দেউটি।
একটা সময় ছিল সন্ধেবেলা কিছুতেই শোভাবাজারের ওই বাস স্ট্যান্ডটায় বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যেত না। শোভাবাজারের ওই বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়ালেই মিত্র কাফের চপ-কাটলেটের গন্ধ, কলেজ পড়ুয়া আমাকে যে কোন আলেয়ার হাতছানি দিত ।
বেশ মনে পড়ে তারও আগে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ের বাস স্ট্যান্ডে হাঁ করে তাকিয়ে আছি ফুটপাত ঘেঁষা, নোংরা লোহার জাল লাগানো একটা জানলার দিকে। মোড়ের দিলঘুসা কেবিন । একের পর এক বাস মিস হয়ে যাচ্ছে, সে দিকে খেয়ালই নেই।
হাতিবাগানের সিনেমাপট্টির একখানা দোকানঘর যে দিন ভোল পালটে রাতারাতি বড়লোকি স্যুটিং-শার্টিং-এর দোকান হয়ে গেল সে দিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। খুব।
চোখ বুঝলেই দেখতে পাবেন, সত্তর দশকের গোড়ার হাতিবাগান। উত্তাল এক সময়। রাধা সিনেমার গাড়িবারান্দায় উত্তমকুমারের ডাউস কাট আউট, বাধমার্কা ডবল ডেকারের ভাড়া দশ পয়সা আর 'মিলনী কেবিন'-এর মাটন গ্রেভি গ্রিলের দাম দু টাকা চার আনা।
এই 'মিলনী 'তেই দেখা গেছে একা-একা বসে আসেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, সামনে মটন চপ আর চায়ের কাপ। মিলনীর উলটোদিকের গলি নলিন সরকার স্ট্রিটে গ্রামোফোন কোম্পানির মহলা বাড়ি ছিল। আর এই মিলনী ছিল শিল্পীদের আড্ডার ঠেক, উদরের আশ্রয়।
আর একটু পিছিয়ে যান, পঞ্চাশের দশক। উত্তমকুমার মেগা হিরো থেকে ম্যাটনি আইডল হচ্ছেন। সব কিশোরীর স্বপ্ন সুচিত্রা সেন হয়ে ওঠা, কর্নওয়ালিশ জমে উঠেছে হকারের ভিড়ে, শ্রীরঙ্গমে অস্তায়মান শিশিরকুমার ভাদুড়ী আর মিলনীতে জমে। উঠেছে গানের তুফান। টেবিল চাপড়ে তবলা বাজাচ্ছেন রাধাকান্ত নন্দী, গাইছেন সিমলে পাড়ার মান্না দে, সুকিয়া স্ট্রিটের সলিল চৌধুরী। সঙ্গে তিন বন্ধু, শ্যামল মিত্র, শ্যামল গুপ্ত ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। আর ওই যে লাজুক যুবতী, ঢাকুরিয়া থেকে আসে, বড়ে গোলাম আলির ছাত্রী-ওই কি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। গান থেমে গেল। কারণ, কী নিপুণ দক্ষতায় সুবল বেয়ারা দুহাতে একসঙ্গে বয়ে এনেছে আট-আটখানা ফাউল কাটলেট। সঙ্গে একটু শশা-পেঁয়াজ কুচি। প্লেটের কোণে কিঞ্চিৎ কাসুন্দি।
উত্তর-মধ্য কলকাতার যে অঞ্চলটাকে সন্ত্রান্ত কলেজ পাড়া বলা যায়, কলকাতার সমধিক প্রসিদ্ধ চপ-কাটলেটের দোকানগুলো এ অঞ্চলেই ছড়ানো। উত্তরে স্কটিশচার্জ ও বেথুন কলেজ, পুবে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ, দক্ষিণে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ এবং পশ্চিমে মেডিকেল কলেজের পিছনদিক-এই সীমানার মধ্যেই দেখুন কতগুলো দোকান। দিলখুশা, দু দুটো বসন্ত কেবিন, অ্যালান্স কেবিন, কফিহাউস, চাচার হোটেল, এডি কেবিন-সবই এ পাড়ার চৌহদ্দির মধ্যে।
এই রকমই আরেকটা কাটলেট পাড়া হচ্ছে খাশ দক্ষিণ কলকাতায়। অর্থাৎ ভবানীপুর, কালীঘাট, হাজরা, গাঁজাপার্ক, দেশপ্রিয় পার্ক ও বালিগঞ্জ। রাসুবাবুর দোকান, গাঁজাপার্কের দোকান, নিরালা, সুতৃপ্তি, সাঙ্গুভ্যালি, বিজলীগ্রিল এমনকি হাল আমলের ক্যাম্পারিও এই মানচিত্রেরই গর্ব।
এছাড়া কলকাতার বাকি সব অঞ্চলে কি চপ-কাটলেটের বিখ্যাত দোকান নেই? নিশ্চয়ই আছে। পাড়ার লোকজন চিরকাল তা ভালও বাসেন। কিন্তু স্বাদে, গন্ধে, ঐতিহ্যে আলোচনার ওই দুই অঞ্চলের দোকানগুলো যেভাবে শহর কলকাতার ইতিহাসে দাগ কেটেছে আর কে পেরেছে!
এর উত্তর খুঁজতে হলে জানতে হবে কাটলেটের শ্রেণী চরিত্র। কারা খায় কলকাতার কাটলেট? কেনইবা খায়?
প্রয়াত রাধাপ্রসাদ গুপ্ত একবার বলেছিলেন, 'সাহেবি তেলেভাজা (সো কল্ড চপ-কাটলেট) খায় তিন ক্যাটাগরির বাঙালি। ছাত্তরে খায় জিভে ধার বাড়াতে, পাড়ার বৌদিতে খায় ইভিনিং শো দেখতে যাওয়ার আগে কাজ পায় না বলে, আর এ সব জোটে অন্যের বাড়ি কুটুম্বিতা করতে গেলে। হ্যাপা কম; দোকান থেকে এনে দোকানেরই পেঁয়াজকুচি সাজিয়ে ধরে দেওয়া গেল, সঙ্গে জলের মতো ট্যালট্যালে চা-ব্যাস! জানে চায়ের খবর কম নেবে এই টা-' এর পর ।
কলকাতার কিছু ঠেক আগের মতনই রয়ে গেছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোল তেমন বদলায়নি। যেমন ধরুন দিলখুশা, ফ্রেন্ডস কেবিন, মিত্র কাফে ইত্যাদি। এবং সেই জন্যেই এখানকার ক্লায়েন্ট ক্লাসও খুব একটা বদলায়নি।
সকালের দিকে এখনও অগা অপগণ্ড দের ভিড় বেশি। দুপুরে শুনসান। ম্যাটিনি শো তো এখন আর উদ্দ্যেশ্য নয় তাই ছাত্র-ছাত্রী, কপোত-কপোতী, বিপ্লবী-বিপ্লবিনী এবং স্কুল পড়ুয়া মায়েদের ভিড়।
আগে সন্ধে যখন ফুরিয়ে যেতো তখন দু-চারজন ফ্যামিলি ম্যান আসতেন সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে, এখন বাচ্চারা শপিং মলের ফুডকোর্ট ছাড়া বাবাদের সঙ্গী হয় না । পকেট সামলে রেস্তোরাঁর বিল মেটানোর দিন গুলো অহেতুক এর মধ্যে ফেলবেন না দয়া করে ।
বাঙালি তো আর খুব একটা মাংস-খাইয়ে জাত ছিল না। জাত-পাতের বিচার মেনে শাস্ত্র সম্মতে বাঙালি মাংস খেত বাঁধা পার্বণীতে। 'মাছে ভাতে বাঙালি' প্রবচন থাকলেও সমাজের একটা বিরাট অংশ ভাতের পাতে মাছের দেখা পেতেন কালেভদ্রে।
১৭৫৭-এ পলাশির যুদ্ধকেউ যদি এ দেশে গোরা পত্তনির সূত্রপাত ধরি তাহলে বাঙালির চপ-কাটলেট চর্চার ইতিহাস ধরে নিন ইয়ং বেঙ্গলের সমসাময়িক। তাদের বিফ স্টেক আর বিফ চপ খাওয়ার ধুম যে তামা-তুলসী পৈতেধারীদের টিকি ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল, সে তো ইতিহাস।
ডিরোজিওর সৎমায়ের রান্না ফিরিঙ্গি খাবারের প্রতি বাঙালি 'বাবু' ছাত্রদের বিশেষ দুর্বলতার কথাও ইতিহাস বিদিত সত্য। ১৮৩১ সালে প্রয়াত হন হেনরি ডিরোজিও। তাঁর আমলে কলকাতায় ফিরিঙ্গি দোকানে চপ-কাটলেট বিক্রি হত নিশ্চয়ই। নইলে ইচ্ছে করে জাত খোয়ানো বাঙালিরা খেতেন কোথায়? ইন ফ্যাক্ট ম্লেচ্ছ রান্না করার ব্যাপারে সেকালের মা-জননীদের গল্প তো সাহিত্যিকদের কলমে কলমে সুন্দর ডকুমেন্টেড হয়ে গেছে। মনে করুন, ঋষি বঙ্কিমের বাবুর্চি প্রশস্তির কথা। গোঁড়া চাটুজ্জে বামুন হয়ে বিধবা পদি পিসির রান্নাকে দুমুড়ে গাল পেড়ে নবাবি বাবুর্চির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র।
এ শহর যত কসমোপলিটন উঠেছে ততই কলকাতা বিভিন্ন কুইজনের কদর বাড়িয়ে তুলেছে। আংলো ইন্ডিয়ান খানা তো কলকাতার খাবার ইতিহাস বদলে দিয়েছিল ।
অথচ সেই আংলো ইন্ডিয়ান যে পদটি নানাভাবে জুড়ে পাউরুটি বাঙালিকে চিনিয়েছে চন্দননগরের ফরাসিরা। আবার কলকাতা বাসিন্দা শালোন কোহেন এ ডেরা দেশে এসে ডেরা বেঁধেছিলেন মুরগিহাটায় ।
১৭৯৯তে-ওই অঞ্চল শহরের ভিনদেশিরা বাজ কারণ মুর্গি ওখানে সস্তা ছিল । ইহুদি, আরমানি, গ্রিক, আরমানি, গ্রীক, ডাচ, ফ্রেঞ্চ ও ইংলিশ কিচেনে কাজ করতে করতে মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদে বাবুর্চির শিখে গেছেন একের পর এক বিলাতি রান্না ।
সময় বদলেছে। নবাবি আমল বদলে তারপর হলো কোম্পানি, শুরু হয়েছে রাজার শাসন। সেই শাসনের চাপ ঠিক রাখতেই ব্রিটিশরাজ তৈরি করেছে দিশি সাহেবে আর দিশি মেমসাহেবদের । নতুন এক মিশ্রশৈলীতে বাবুর্চি ট্রেন্ড করেছেন। এভাবেই রসবড়া থেকে লেডিকেনি হয়েছে, পোলাও থেকে হয়েছে ফ্রাইড-রাইস। কাভারেজ কাটলেট থেকে হয়েছে কবিরাজী। একদিকে বিত্তবান মানুষের এই রসনা বিলাস, অন্যদিকে ফুর্তিবাজ মধ্যবিত্তের রেস্টোর্যান্টে বসে টুকিটাকি খাওয়ার মধ্যে এক নিষিদ্ধ উত্তেজনা। এই দুইয়ে মিশেই কলকাতার কাটলেট কালচারের জন্ম।
নিষিদ্ধ ব্যাপারটা কিন্তু সত্যি সত্যিই ছিল। অন্তত উত্তর কলকাতায়। আজ যাঁরা সবে শাশুড়ি হয়েছেন তেমন বউদের অনেকেই বিয়ের পরে পরে স্বামী সোহাগ দেখাতে রেস্টোর্যান্টে গিয়ে খেতেন ঠিকই, কিন্তু বাড়িতে সেটা বেমালুম চেপে যেতেন গালমন্দ খাবার ভয়ে । খোলা টেবিলে বসে কাটা-চামচে দিয়ে ব্রেইজড কাটলেট খাওয়া যাবে না বলেই শুরু হয়ে গেলো পর্দা ঢাকা কেবিন রেস্টুরেন্ট ।
কোনো মাংসই নিষিদ্ধ রইল না । যখন কলকাতা হয়তো সত্যি সত্যিই আরও একটা নতুন ভোজনবিপ্লবের সামনে এসে দাঁড়াতে পারত, ঠিক সেই সময়েই সাহেব কলকাতার কেতাবি খাওয়া-দাওয়াকে শেষ করে দিল দুটো অর্বাচীন, বাউন্ডুলে, অখাদ্য শব্দ। 'চাউমিন' আর 'রোল'।
নবজাগরণের পুরোধা পুরুষ রাজা রামমোহন রায় থেকে শুরু করে কলকাতার আলোকপ্রাপ্ত সমাজের অধিকাংশ বড় মানুষেরই মাছ-মাংসে রুচি ছিল। মাইকেল মধুসূদন, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, হরিশ মুখার্জির মতো মাপের বহু কালাপাহাড় বাঙালিই সাহেবি খানার ভক্ত ছিলেন। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছেন। প্রাতঃস্মরণীয় রামকৃষ্ণদেব, বিদ্যাসাগর, শিবনাথ শাস্ত্রী, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এঁরা এর ব্যতিক্রম। কিন্তু চৈতন্যদেবের বাংলায় ডাফডিরোজিওর ছাত্ররা সাহেবসুবোদের সঙ্গে মিশে ফিরিঙ্গি খাবারের যে ঢেউ তুলেছিলেন, সেটাই কালে কালে আপামর বাঙালির জিভের স্বাদ বদলে দিল। পুঁইডাঁটার চচ্চড়ি ছেড়ে আমরা "কটলেট”-এর ভক্ত হলুম।
কত কাল রবে বল ভারত শুধু ডাল ভাত জল পথ্য কা দেশে অন্নজলের হল ঘোর ধরো হুইস্কি সোডা আর মুর্গি মাটন ।
যখন 'পেটে খিদে মুখে লাজ', সেই সময়টার একটা নিপুণ ছবি এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'চিরকুমার সভা'য়। তিন দশকের ব্যবধানে 'চিরকুমার সভা'র উপন্যাসরূপ থেকে নাট্যরূপ তৈরি করেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু মাত্র আশি বছরটাক আগে লেখা সে নাট্যরূপেও রবীন্দ্রনাথ 'কটলেট' নিয়ে রসিকতার অংশগুলি বাদ দেননি।
শিক্ষিত পরিবারে তখনও 'চিকেন' ঢোকার কথা ভাবাই যেত না, সুতরাং বাড়িতে ফাউল বা কবিরাজী ঢোকার কোনও প্রশ্নই নেই। সেই জায়গা থেকেই উৎসারিত হয় রবীন্দ্রনাথের ব্যঙ্গ। দুই নব্যবঙ্গীয় যুবক তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু, তারা বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ির টাকায় বিলাত যেতে চায়, সেজন্য তারা ধর্ম বদলাতেও শেষ অবধি রাজি হয়, আর প্রথমেই লোভ করে খেতে চায় কলিমদ্দি মিঞার দোকানের চিকেন কাটলেট আর মটন চপ। এই দৃশ্যের সূত্রেই আমরা পেয়ে যাই রবীন্দ্রনাথের তীব্র শ্লেষাত্মক গান:
আশির দশকের আগেও কলকাতায় রোল আর চাউমিন দুটোই পাওয়া যেত। কিন্তু দুটোর কোনওটাই ফুটপাতে নেমে আসেনি। অনেকেই পছন্দ করতেন 'চুঙ্গওয়াহ'-এর চাইনিজ স্প্রিং রোল, 'নিজাম'-এর আলু-অন্ডা রোল বা বিফ রোল, কিন্তু ওই যে স্টোভের উপরে তাওয়ায় পরোটা-ডিম ভাজা, তাকে সত্তরের দশকেও কেউ রোল বলে স্বীকার করতেন না।
আর স্টিলের প্লেটে ঘেসো একটা বস্তুকে যেদিন থেকে চাউমিন বলে মেনে নেওয়া শুরু হল সম্ভবত সে দিনই কলকাতার কাটলেট কালচারের প্রথম মেজর হার্ট অ্যাটাকটা হয়ে গেল। ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল কলকাতার নস্ট্যালজিক বিকেল। হারিয়ে গেল উট্রামঘাটের সন্ধ্যা, হারিয়ে গেল পার্কের বেঞ্চি, হারিয়ে গেল তেলেভাজা সিঙাড়া, চপ-কাটলেট।
এখন স্কুল ফেরত বিকেল মানেই ভিডিও গেমস, সংসারের জিলিপি-প্যাঁচ দেখানো সিরিয়াল, প্রাইভেট টিউটর, খাশ ছাঁকনিতে ছাঁকা খবর, আর টু মিনিট নুডুলস। পার্কে বসা বিষণ্ণ বৃদ্ধ, পাশের বাড়ির রেডিওতে ভেসে আসা অনুরোধের আসরের গানের মতোই ক্রমশ বিরল, দুর্লভ আর লক্ষ্মীছাড়া চেহারা নিচ্ছে কলকাতার কাটলেট।
এখন মধ্যবিত্ত দোকানে একটা মাঝারি পিস মাংসসুদ্ধ এক কোয়ার্টার মটন বিরিয়ানির দাম ২০০ টাকা, মটন কোরমা বা কষার দামও ওই রেঞ্জে।
গেরস্থপোষ্য দোকানে এক প্লেট চিকেন কাবাব গোটা ১৩৫ টাকা, রোডসাইড ভেন্ডারের কাছে একটা চিকেন রোল ১০০ টাকা সেখানে যে কোনও স্ট্যান্ডার্ড দোকানে একটা চিকেন কাটলেট ১৫০-২০০ টাকা। একটা ভালমানের মটন চপ ৮০ টাকা। কী করে বাজার থাকবে বলুন? চপ কাটলেট তাই ক্রমশ পিছোচ্ছে, পিছোতে পিছোতে এখন দেওয়ালে পিঠ।
একের পর এক পুরোনো রেস্টোর্যান্ট রাতারাতি হাত বদলে চলে যাচ্ছে রাম-লক্ষ্মণ ভুজিয়াওয়ালাদের হাতে। শুধু বাঙালি রেস্টোর্যান্ট নয় কলকাতার ফুড কালচারটাই বিপন্ন। গত দু দশকে কলকাতায় যত থিয়েটার হল বন্ধ হয়েছে, যত সিনেমা হল বন্ধ হয়েছে, ঐতিহাসিক আবেদনসম্পন্ন রেস্টোর্যান্ট বন্ধ হয়েছে তারচেয়ে ঢের বেশি।
ফিরিঙ্গি কুইজিন বা নিখাদ চাইনিজ কুইজিন বলতে মধ্যবিত্তর নাগালে প্রায় কিছু নেই। টিমটিম করে যে কটি বাঙালি রেস্টোর্যান্ট এখনও ব্যবসা চালানোর চেষ্টা করছে তাদের অধিকাংশের সঙ্কট ও সঙ্কটের কারণগুলি এক। প্রায় প্রত্যেকটি দোকান মূলত ভাড়াটে, বাড়িওয়ালারা পুরনো ভাড়ার দখলদারকে উচ্ছেদ করতে চান। বদলে গেছে মালিকানার জেনারেশন, ফলে ব্যবসা ভাগ হয়ে যাচ্ছে, কোথাও কোথাও জড়িয়ে পড়ছে সম্পত্তিগত মামলায়।
দিলখুশা কেবিনে এক সন্ধেয় প্রায় এক ঘণ্টায় বসে থেকে আমরা দেখেছি একটি খদ্দেরও অর্ডার দেয়নি চপ বা কাটলেটের। যা অর্ডার দিয়েছেন, তাদের মধ্যে ঘুরে ফিরে এসছে একটিই নাম- চাউমিন।
সারা কলকাতার বিভিন্ন দোকানে যোগাযোগ করে কয়েকটা মজার তথ্য জানা গেছে। আগে একটা মাঝারি মাপের দোকানেও 'হট আইটেম' দিনে কমপক্ষে ১০০ পিস গড়া হত। চাচা'র ফাউল কাটলেট বা রাধুবাবুর দোকানের মটন কাটলেট তো অনেক বেশি তৈরি হত। ক্রমশ কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই কমে আসছে। এখন কোনও দোকানেই কোনও আইটেম সোয়া শো, দেড়শো পিসের বেশি গড়া হয় না স্পেশাল অকেশন ছাড়া। বহু দোকানই বাজারের দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নিতান্ত মানসিক অসম্মতি সত্ত্বেও কাটলেটের মাপ ও মানের উপরে মেনে আসছে কম্প্রোমাইজের খাঁড়া। এবং এই ক্রাইসিস থেকে বাঁচার কোনও চটজলদি রাস্তাও একেবারেই খুঁজে পাচ্ছেন না কলকাতার বাঙালি রেস্টোর্যান্টের মালিকেরা।
ব্যবসা বাড়ানোর রাস্তা নেই, জোমাটো সুইগি তে তো গরম কুটলেটের স্বাদ বোঝা যায় না, তাই দাম টা লিস্টে বড্ড চোখে পড়ে । বহু ক্ষেত্রেই রেস্টোর্যান্ট-এর ভোল পালটানোর রাস্তাও বন্ধ। কারিগর কমে যাচ্ছে, বৃদ্ধ অভিজ্ঞ কারিগরদের অবসর বা মৃত্যুর পরে নতুন কর্মচারী এ সব হুজ্জতের রান্না শিখতে চাইছেন না, কারণ এত খিটকেল রান্নাবান্নার কোনও স্পেশ্যাল ইনসেনটিভ নেই। তাই পুরনো কলকাতার কাটলেটবিলাসীরা যতই গর্ব আর ঐতিহ্য আঁকড়ে বসে থাকুন, কালচারটা ডুবছে, ডুবছেই।
চপ বা কাটলেটের যেমন একটা বিরাট বাণিজ্যিক আধিপত্য ছিল কলকাতা শহরে, তেমনই এর একটা কুটির শিল্পগত চেহারাও তো ছিল। সেটাই বা কোথায় আজ! পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কলকাতাভিত্তিক গল্প উপন্যাস পড়ুন। সেখানে দেখবেন, বাড়ির মেয়ে-বউরা বিকেলের জলখাবার বানাচ্ছেন। শীতকালে কচুরি, বর্ষায় ইলিশ ভাজা এ সবের পাশাপাশিই রয়েছে কেক, পিঠে আর চপ কাটলেট, ডিমের ডেভিল।
বাংলা সিনেমাতেও এই বৈকালিক জলখাবারের ছবিটা সে-আমলে খুব বিরল ছিল কি? ধরুন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাসিমার কাছে 'মালপো' খাওয়া? কিংবা, প্রেমেন্দ্র মিত্রের এভারগ্রিন ঘনাদার মেসবাড়ির জলখাবার? চায়ের সঙ্গে টা- এই কালচারটাই কলকাতা ক্রমশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
এবার কফিনের শেষ পেরেকের মতন পাঁচটায় অধিকাংশ কেজো মানুষের কাজ শেষ হচ্ছে না। সেটা গড়িয়ে যাচ্ছে সাড়ে সাতটা-আটটায়। তার পরে আর জলখাবার খাওয়া মানেই হয় না । শেষে যখন বাঙালি সস্তার স্বাস্থ্যকর বলে মোমো ঠুসছে, আর সকালে দামী ওটস, কর্নফ্লেক্স আর মুসলিতে গিল্ট কভার করতে টাকা খরচ করছে, তখন বড়জোর কালেভদ্রে শৌখিন খাবার হিসেবে দুয়েকটা এক্সপেরিমেন্ট হতেই পারে।
ফলে কাটলেটের কলকাতায় উমদা কাটলেট এখন ডোডোপাখি। ইনস্ট্যান্ট সুপারফাস্ট কালচার। বেচারা কাটলেট! এত 'ফাস্ট' আর যাই হোক, কাটলেট হয় না।
কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত আর বিখ্যাত সমালোচক ধরণী ঘোষ একসঙ্গে মাটন আফগিনি খাচ্ছেন। সেই টেবিলে এসে যোগ দিলেন কেয়া চক্রবর্তী- এটাও খুব চেনা ছবি। বেশ মনে পড়ে, সুতৃপ্তির রবিবাসরীয় আড্ডা। টোস্ট, ভাজাভুজি, চা, সিগারেট, মৃণাল সেন, শ্যামল দত্তরায়, এন বিশ্বনাথন, আমাদের মতো ফেঁপো অত্যুৎসাহীরা- সবাই সেখানে মহা মাতব্বর।
সেই আড্ডার পাশাপাশি একটি ছোট্ট ছবি দিই। আজকের ছবি, একালের এক শ্রেষ্ঠ গায়ক আর গায়িকা রেকর্ড করছেন ডুয়েট, একসঙ্গে। একজন এইমাত্র ট্র্যাক ফিনিশ করেছেন। অতঃপর লাঞ্চব্রেক। অন্যজন ট্র্যাকে গলা দেবেন তারপরেই। দুজনে কিছুতেই একত্র বসে লাঞ্চ খেলেন না। এতটাই তাঁদের রেষারেষি। বন্ধুত্ব, আড্ডা, বড় মানুষজনের মতো ভাল সম্পর্ক- এ সব কি এ যুগে নেই! আছে, খুবই আছে। কিন্তু তার প্রকাশ কম। অবসরও কম।
অতএব, ঠিক যেভাবে আস্তে আস্তে ঝামেলা, হ্যাপা আর সময়াভাবের অজুহাতে আমাদের পাতে বিরল হয়ে পড়ছে মোচার চপ, মুড়িঘণ্ট, চিতল মুইঠ্যা, পিসপাস, বাঙালি স্টাইলের পোলাও, ছানার ডানলা, সুজির বরফি, বা সরতোলা রাবড়ি; ঠিক তেমনই বিরল হয়ে উঠছে বাঙালির চপ কাটলেট। জীবনের আর সব অনুষঙ্গের মতোই খাওয়া দাওয়ার পদগুলিরও একটি লাইফ সাইকেল থাকে বইকী। সেই নিয়ম মেনেই হয়তো কাটলেটের দিন ফুরিয়েছে ।
পয়লা বৈশাখের হালখাতায় অবলুপ্তির পথে রথযাত্রার তেলেভাজা-পাঁপড়ভাজা। বউবাজারের ছানাপট্টির দোকানগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। বিয়েবাড়িতে ডেভিল-কবিরাজীর চেয়ে ফিশফ্রাই বা পাতুরীই বেশি চলছে, টিকিসুদ্ধ লম্বা বেগুনভাজাও কই! বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে, দ্রুত বদলে যাচ্ছে সব। হয়তো কিছুদিন পরেই কবিরাজী বা আফগানি কাটলেট 'হয়ে উঠবে গ্রামোফোন রেকর্ড বা গড়গড়া। তাদের চেনাবেন হাতপাখা, থেলো হুঁকো, জলচৌকি, পিতলের বাসন, পানের বাটা, এমব্রয়ডারি রিং, লুকিং গ্লাস, হানাত্যানা। আর দেখাবেন বাঙালির বিলুপ্ত রসনাসুখ- পাল-সেন যুগের বাংলার হারিয়ে যাওয়া মিষ্টি থেকে শুরু করে
সাহেব কলকাতার চপ-কাটলেট।
আর রয়ে যাবে কয়েকটি টুকরো স্মৃতি। 'মিত্র কাফে'র ব্রেন চপ ভাজার গন্ধ, মিলনী কেবিনে রামকুমার চট্টোপাধ্যায় আর তালাত মাহমুদের আড্ডা 'দিলখুশা'র ডেভিলের অনন্য স্বাদ, অ্যালান-এর চিংড়ি কাটলেট, ঘনাদার খাই খাই, আর..
ক্রেডিট : রেফারেন্স বই আর পত্রিকা