23/01/2024
🟥আমি, আমার মৃত্যু পথযাত্রী মা কে ভাত খাওয়াতে পারিনি দেখে, আমি আজ সাতাশ বছর যাবৎ ভাত খাই না। অথচ এই আমিই আমার ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সাড়ে পনেরো হাজার শ্রমিকের, প্রতিদিন একবেলা ভাতের যোগান দেই।
বিশিষ্ট শিল্পপতি মো: এনামুল হকের বক্তব্যে সবাই নড়েচড়ে বসল। সাংবাদিকরা সাক্ষাৎকারের শিরোনাম শুনে, সবগুলো ক্যামেরা অন করে দিল। বিনয়ের সাথে বলল,
-'যদি পুরো গল্পটা বলতেন,স্যার?
এনামুল হক একটু সময় নিয়ে কি যেন ভাবলেন! তারপর টিস্যু দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিয়ে বললেন,
-'বাবা মারা যাওয়ার পর, আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না। ততদিনে বড় আপার বিয়ে হয়ে গেছে। আর আমি মেধা তালিকায় ১ম হয়ে বুয়েটে চান্স পাই। বই কেনার টাকা ছিল না। সারাদিন বন্ধুদের কাছ থেকে এ নোট সে নোট জোগাড় করে ফটোকপি করে পড়তে হতো। টিউশনি করে যে ক'টা টাকা মাস শেষে হাতে পেতাম। তার থেকে কিছু টাকা মা কে পাঠাতে হতো। আর বাকি টাকা দিয়ে, বন্ধুদের কাছ থেকে ধার দেনা করে কোন রকমে টেনেটুনে পুরো মাস চলতাম। বড় আপার ছিল ভরা সংসার। কিন্তু সেই সংসারে তার কোন মতামত দেওয়ার অধিকার ছিল না। সবকিছুই তার শাশুড়ির কথামত চলত। তাই সে চাইলেও আমাদের খুব একটা হেল্প করতে পারত না।
আমার তখন পরিক্ষা চলছিল।
একদিন খবর এল আমার মা খুব অসুস্থ।আমি কোন রকমে পাস মার্ক তুলেই ছুটলাম।উদ্দেশ্য মা কে ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করা। যেহেতু হাতে খুব বেশি টাকা ছিল না।এদিকে মায়ের অবস্থাও খুব খারাপ। দিক দিশা না পেয়ে, একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে মা কে ভর্তি করলাম। ডাক্তার টেস্ট দিল। রিপোর্টে জানা গেল, মা ব্রেন স্ট্রোক করেছে। ততক্ষণে মা উল্টো পাল্টা বলতে শুরু করেছে। বার বার ক্যানোলা খুলে ফেলছে। চিৎকার করে কাঁদছে, হাসছে। জোরে জোরে বাবাকে ডাকছে। আমাকে অস্থির হয়ে বলছে,-'তোর বাপ এখনো আসে না কেন রে, এনা?
আমি কি বলব? আমার নিজেকে তখন বেসামাল লাগছিল। সে সময় ফোনের খুব একটা প্রচলণ ছিল না। হাসপাতাল থেকে বাসে করে, বড় আপার বাসায় যেতে লাগে। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তাড়াহুড়ায় আপাকে জানানো হয়নি। আপাকে একটা ফোন করা দরকার!
টানা তিন দিন হাসপাতাল, ভার্সিটি করে করে পকেটের টাকা শেষ। এক বন্ধুর কাছে ধার চাইলাম, দিল না। এদিকে মা ও একটু একটু করে দূর্বল হয়ে পড়ছিল। বড়আপাকে বললাম। সেও এলো না। আসলে তাকে আসতে দেওয়া হয়নি। সে এসে হাসপাতালে পরে থাকলে, তার সংসারে কাজ করবে কে?
শেষ সময়ে মায়ের স্মৃতি এই আসছে! এই যাচ্ছে। যতক্ষণ আমি মায়ের পাশে বসে থাকতাম। শুধু মা শোয়া অবস্থায় আমার হাত টেনে ধরে বলত,-এনা,ভাত খাব? ও এনা, বাপ আমার! দে না, এক প্লেট ভাত এনে? আমি শুধু নীরবে চোখের জল ফেলতাম। পকেটে তখন একটা পয়সাও ছিল না। বিশ্বাস করুণ! এক প্লেট ভাতের দাম খুব বরং দশ টাকা ছিল। কী অপদার্থ ছেলে আমি, তাই না? মা কে এক প্লেট ভাত কিনে খাওয়ানোর সামর্থ নেই। তখন ছাত্র ছিলাম। আত্মসম্মান বোধ ছিল প্রবল। কারো কাছে ভাত চাইতেও লজ্জা করছিল। ভাত দেই না দেখে, মা আমাকে রীতিমতো আঁচড়ে, কামড়ে নাজেহাল করে ফেলেছিল। টানা দুই ঘণ্টা মা ভাত খাব, ভাত খাব বলে, ক্লান্ত হয়ে পড়ল। আমি মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম,
-'মা, তুমি লক্ষ্মী মেয়ের মতো চুপচাপ বসে থাকো। আমি আপার বাসা থেকে ভাত নিয়ে আসি, কেমন?
-'ভাত খাব, এনা?
-'আচ্ছা।
আমি উঠে পড়লাম। মা পিছু ডেকে বলল,
-'তুই খুব ভাল, এনা। আল্লাহ তোর ভাল করুক। এবার শিগগিরই যা! আমার জন্য ভাত নিয়ে আয়।
আমি রাস্তায় বেরিয়ে উদ্দেশ্যহীন হাঁটছি। বড় আপার বাসায় যাব! পকেটে টাকা নেই। ভয়ে ভয়ে একটা বাসে চড়ে বসলাম। আমার মা মুখ ফুটে ভাত খেতে চেয়েছে। যে করেই হোক, আমাকে ভাত এনে দিতেই হবে। তার জন্য যদি আমাকে বাস কন্ট্রাকটারের কাছে, ভাড়া না থাকার কারণে, অপমানিত হতে হয় হবো। আসার সময় নার্সকেও বলে এসেছি।'একটু আমার মা কে দেখবেন প্লিজ? আমি এসে বখশিশ দিব।
মাঝ রাস্তায় বাস ড্রাইভার আমাকে নামিয়ে দিল। আমার অপরাধ! আমি ভাড়া দিতে পারিনি। আমি প্রায় ঘন্টাখানিক পায়ে হেঁটে আপার বাসায় পৌঁছেছি। আপা আমাকে দেখে ছুটে এলো। অস্থির হয়ে বলল,
-'মা কেমন আছে, ভাই?
-'বাড়িতে ভাত আছে, আপা? আমি সে'কথায় উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করলাম।
-'আছে। তুই খাবি? আপা ব্যস্ত হয়ে ভাত বাড়তে গেল।
-'আমি খাব না। তুই বরং মায়ের জন্য ভাত বেড়ে দে! আমি পিছু ডেকে বললাম।
আপা আমাকেও জোর করে অনেক গুলো ভাত খাইয়ে দিল। আমি টিফিনবক্সে ভাত আর কিছু টাকা নিয়ে আপার বাসা থেকে বের হলাম।
হাসাপাতালে গিয়ে, কেবিনে ঢুকে দেখি।আমার মায়ের নিথর দেহ, বড় অবহেলায় পরে আছে। সাদা কাপড়ে মুখ ঢাকা। অথচ তখনো হাতে আমার, মায়ের জন্য আনা, ভাতের বাটি ধরা। নিজেকে তখন আমার পৃথিবীর সবচেয়ে অক্ষম, নিকৃষ্ট লাগছিল।আমিই একমাত্র অপদার্থ ছেলে। যে কিনা..মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে পারলাম না। এলোমেলো পায়ে হেঁটে গিয়ে মায়ের পাশে বসলাম। মায়ের হাত দুটো আলতো করে ধরে, বিড়বিড় করে বললাম,
-'ও মা..ভাত খাবে না? উঠো..দেখো, তোমার জন্য ভাত এনেছি। উঠো না মা?
আমার আপা মাকে জড়িয়ে ধরে, হাউমাউ করে কাঁদলেও সেদিন আমি একটুও কাঁদতে পারিনি, জানেন? কি নিষ্ঠুর দু'চোখ ! এক ফোঁটা জলও এলো না। শুধু বুকের ভেতর কি যেন কামড়ে ধরছিল। মনের ভেতর অস্থির অনুভূতি। আমি না.. নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছিলাম না। আফসোস, মা'র অন্তীম সময়ে একমুঠো ভাত মুখে তুলে দিতে পারলাম না।
স্কলারশিপ পেয়ে আর দেরি করিনি। আমার ভাগের জায়গা, জমি বেচে, এক স্যারের হেল্প নিয়ে বিদেশে পড়তে চলে গেছি। যে দেশে আমার মায়ের মুখে ভাত তুলে দিতে পারিনি।সে দেশে কেন জানি! আর থাকতে ইচ্ছে করেনি।
পড়াশোনা শেষ করে, আমি যে কোম্পানিতে মোটা বেতনে জব করতাম। আমার কাজের প্রতি একাগ্রতা আর সততা দেখে সেই কোম্পানির মালিকের খুব পছন্দ হলো। তার তিন কূলে কেউ ছিল না। এক মেয়ে ছাড়া।এত এত অর্থ সম্পদ কে ভোগ করবে? তাই আমাকে তার মেয়ে জামাই করার প্রস্তাব রাখল। সাথে ৫০% প্রোপার্টি লিখে দেবে। এক সময় আমাকে বিয়ে তো করতেই হতো। তাই আর অমত করিনি।
একটা সময় পর মনে হলো, অনেক দিন তো হলো। বিদেশ ভূয়ে পড়ে রইলাম। এবার দেশে যাওয়া দরকার। দেশের মানুষের জন্য কিছু করা দরকার।
দেশে এসে, গাজীপুরে প্রায় পাঁচশো শতাংশ জায়গা, জমি কিনেছি। বিদেশি বায়ারদের সাহায্যে ফ্যাক্টারি নির্মাণ করেছি। সেই ফ্যাক্টারিতে গেঞ্জি, শার্ট,প্যান্ট, থেকে শুরু করে অনেক কিছুই তৈরী করা হয়। সেই সব প্রডাক্ট গুলো চড়ামূল্যে অন্যান্য দেশে রপ্তানি হয়। প্রথমে দেড় হাজার শ্রমিক নিয়ে আমাদের জার্নিটা শুরু করেছিলাম। এখন প্রায় সাড়ে পনেরো হাজার শ্রমিক কাজ করে। আমাদের ফ্যাক্টারির একজন এমপ্লয়ির সর্বনিম্ন বেতন সাড়ে আট হাজার টাকা। আর সবোর্চ্চ বেতন প্রায় লাখের উপরে। মূল ডিউটি টাইম, ন'ঘণ্টা।
সাথে দুপুরের লাঞ্চ ফ্রী। ওভারটাইম করলে হালকা নাস্তারও ব্যবস্থা আছে।
মাঝখানে অনেক গুলো বছর কেটে গেছে।
এখন দু'হাত ভরে প্রচুর টাকা কামাই। কাঁচা চুলে পাক ধরেছে। গায়ের চামড়াও কেমন কুঁচকে গেছে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা পরতে হয়। আমার ছেলে মেয়েরাও যার যার মতো প্রতিষ্ঠিত। যে আমি ছাত্র জীবনে মা কে একমুঠো ভাত খাওয়াতে পারিনি। সেই আমিই আজ প্রায় পনেরো হাজার মানুষের খাদ্যে, বস্ত্রের দায়িত্ব নিয়েছি। তারা যখন কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে, দুপুরে আয়েশ করে, ভাত খেতে বসে। আমি সি সি টিভি ফুটেজে তা মুগ্ধ চোখে দেখি। এই সাদা ফুলের মতো ভাতের প্রতি আমার প্রচুর দূর্বলতা থাকলেও কেন যে আজও ভাত খেতে পারি না। এখনো ভাতের প্লেট দেখলেই মায়ের মুখখানা চোখের সামনে ভেসে উঠে।
একটানা এতক্ষণ কথা বলে, এনামুল হক হাঁপিয়ে গেছেন। একরাশ মুগ্ধ জনতা পেছনে ফেলে সে আস্তে আস্তে স্টেজ থেকে নেমে গেলেন। এখন ঘড়িতে পাঁচটা বাজে। সন্ধ্যে ছ'টায় একটা পাচ তরা হোটেলে, বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে।এখন না গেলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। চারপাশে পুলিশ, সিকিউরিটি এনামুল হক কে গাইড দিয়ে গাড়িতে তুলে দিলেন।
————————————————————★
❣️❣️ সমাপ্ত ❣️❣️
————————————————————★
©️ব্যর্থতা_কিংবা_সফলতা
লেখা_Bobita_Ray