19/06/2025
আমাদের ছেলেবেলার দিন গুলো কেমন যেন হারিয়ে গেলো, চেয়েও আর নাগালে আসে না । অথচ ছোটবেলায় বড়ো হয়ে যাওয়ার একটা আকুতি ছিলো সর্বদা, মনে হত কতই না মজা বড়ো হয়ে গেলে ।কিন্তু বড়ো হওয়ার পর বুঝলাম ছোটবেলার মতো সুখ শান্তির জীবন আর কোনো দিন ফিরে আসে না । ঠিক যেন রূপকথার গল্পের মতো সুন্দর ছিলো ছেলেবেলা টা । ছিলোনা কোনো দায়িত্ব,কর্তব্য, ঘ্যান ঘ্যানে সংসারিক জীবন, একরাশ চিন্তা,ছিলোনা লোক নিন্দার ভয়,কে কি বলবে ভাববের ভয়,ছিলোনা ভবিষ্যতের ভাবনা।পাখির শরীরের মতো হালকা ছিলো মন আর স্নিগ্ধ হাওয়ার মতো ছিলো ফুরফুরে মেজাজ। অনেক বেশি কিছু না পাওয়ার চেয়ে খুব অল্প কিছুর পাওয়ার আনন্দ ছিলো বড্ডো বেশি। মায়ায় ভরা চোখ আর মায়ায় ভরা বুক দিয়ে দুনিয়া টা যেন হাতের মুঠোয় রাখার ক্ষমতা ছিলো । ছিলোনা গ্লানি , ছিলোনা অভিযোগ ,ছিলো শুধু গাল ফোলানো অভিমান যা এখনিমেষে পালিয়ে যেতো ৫০ পয়সার লজেন্সেই । সবাই ছিলো খুব আপন , সবার ওপর উপচে পড়তো ভালোবাসা ।যে কোনো ভুল করলেই ক্ষমা মিলতো খুব সহজেই। ভাই বোন রা যেন ছিলো প্রাণ এর চেয়েও বেশি দামি যাদের ছেড়ে থাকা প্রায় ছিলো অসম্ভব। বোনেদের সাথে খুনসুটি আর আড়ির পর জীবনেও কথা বলবো না থেকে মাত্র আধ ঘন্টার ও কম সময় গলায় গলায় ভাব জমে যাওয়া টা ছিলো জীবনের সেরা প্রাপ্তি। স্কুল এর বাইরে দাঁড়িয়ে পেয়ারা মাখা, আচার খাওয়ার সুখ আর অন্য কিছুতে মিলতো না ।দুর্গা পুজোর আগে ঠাকুমার থেকে একটা লিপস্টিক, একটা নেইলপলিশ, একটা টিপ এর পাতা আর একটা সেন্ট পাওয়ার সেই যে আনন্দ তাতে ১সপ্তাহ ঘুম উড়ে যাওয়ার যোগার হতো।
না! চাইলেও আর ফিরে পাওয়া যাবে না সেই সব দিন । এখন সব ই খুব যান্ত্রিক , পাওয়ার আনন্দের চেয়ে না পাওয়ার দুঃখই বেশি, আন্তরিকতা পেয়েছে এখন লোক দেখানোর তকমা। অভিমান এখন অভিযোগ এ পরিণত, পাখির শরীরের মতো হালকা মন বদলে গেছে ভারাক্রান্ত মনে আর সর্বদা ভবিষ্যৎ এর আতঙ্ক এই হলো বড়ো হয়ে ওঠার পুরস্কার যা ছোটবেলায় পেতে চাইত সবাই না জেনেই । কথায় আছে আমরা যা মন থেকে চাই তা একদিন ঠিক পাই।ছোটবেলায় বড়ো হয়ে ওঠার জন্য ব্যাকুলতাই আমাদের এতটা বড়ো করে দ্যায় আর আমরা বুঝতেও পারিনা কখন আমরা সেই স্বর্গের মতো সুন্দর জীবন টা থেকে আসতে আসতে এমন কুম্ভীপাকে পদার্পণ করি । সুখ শান্তি এখন মানুষের মনে কম আর গাড়ি বাড়ি সম্পত্তি গয়না তে বসবাস করে বেশি। ভালোবাসা মনে কম নামি রেস্তোরাঁ , পি সি চন্দ্রর শোরুম, ইন্টারন্যাশনাল টুর , আই ফোন অথবা গোয়ার বিচেই বেশি । মানুষ মানুষের ভালো চায়না , অন্যের সুখে কষ্ট পায় , কেউ কারো থেকে একটু ভালো থাকলে সেই মানুষ অন্য মানুষের চক্ষু শুল । মানুষের কাছে প্রিয় হওয়ার চাবিকাঠি হলো সর্বদা তোষামোদ করা। ভুল ত্রুটি এখন আর ক্ষমার যোগ্য নয়। সকাল থেকে উঠে নাকে মুখে গুঁজে অফিস এ যাতা কলে পেশার নেশা তেই মানুষ বড়ো হয়ে উঠতে চায় , অবহেলায় বাঁচার জন্য ,রাশি রাশি জবাব দিহির জন্য বড়ো হয়ে উঠতে চায় , সংসার নামক রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করার জন্য ,পাওয়া না পাওয়ায় হিসেব করতে বড়ো হয়ে উঠতে চায় ।প্রিয় মানুষ দের মুখো দর্শন থেকে বিরত থাকা, সর্বদা নিন্দা শুনতে বড়ো হয়ে উঠতে চায় । কার কি হলো আমার কি হলো না ,ও কত সফল তুমি কেনো নয় শুনতে বড়ো হয়ে উঠতে চায়। সন্তান বড়ো করার পর আমার জন্য কি করেছো শুনতে বড়ো হয়ে উঠতে চায় । প্রিয় মানুষ ছেড়ে গেলে একা একা বাঁচতে,লড়াই করতে বড়ো হয়ে উঠতে চায় । যে কোনো বিষয় তেই খুব অল্প মেয়াদি ভালো লাগা পেতে,নিজের যা আছে তাতে খুশি না থেকে অন্যের কি আছে সেটা দেখে দুঃখ পেতে বড়ো হয়ে উঠতে চায়।
আর এই সব চাওয়া যখন পূর্ণ হয় তখন আবার সবাই সেই ছেলেবেলা টাই ফেরত পেতে চায় যেখানে বাস করতো সত্যি সত্যি সুখ আর সত্যি কারের শান্তি । এই সোনায় মোরা কিছু বছর বেশির ভাগ মানুষ ই ফিরে পেতে চায় কিন্তু আর কোনোদিন পেয়ে ওঠা হয়না ।
তাই আমার ছোট দুই ছেলে মেয়েদের ছেলেবেলা টা আমি খুব উপভোগ করি, ওদের এই রূপকথার মতো সাজানো জগৎ টাকে উপভোগ করি, ওদের শৈশব টা যেন হারিয়ে না যায় খুব সহজে সেই চেষ্টা করি কারণ বড়ো হয়ে গেলে ওরা আর এই সুখের, মধুর সময় গুলো আর ফিরে পাবে না। হয়তো এর জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়, চারিদিকে তাকালেই তন্নস্তিক ঘর, দেওয়ালে আঁকি বুঁকি, আলমারির ওপর লাফ ঝোপ, চিৎকার চেঁচামেচি, ওদের খুনসুটি সর্বদাই। এতে কখনো কখনো মাথা ধরে ঠিক ই,বিরক্তিও আসে কিন্তু তারপর ই যখন মাথায় আসে ওদের এই সময় টা আর কয়েক বছরের জন্যই তখন ওদের এই সব কিছু তে বাধ না সেঁধে উপভোগ করি মন প্রাণ দিয়ে । মাঝে মাঝে স্কুল কামাই করে বাড়ি বসে ওরা খেলা করে, বৃষ্টি তে ভিজে খেলা করে, বিকেলে পড়তে বসতে না চেয়ে খেলা করে ,দুপুরে না ঘুমিয়ে খেলা করে । আমি বারণ করি না কারণ আমি চাই মন প্রাণ দিয়ে ওরা খেলুক কারণ এই খেলার সময় টাই ওদের সুখস্মৃতি হিসেবে জীবনে থেকে যাবে অন্য কিছুর চেয়ে অনেক বেশি থেকে যাবে তাই এই সময় টা তে ওদের কোনো নিয়ম কানুন এ আমরা রাখি না ।পরীক্ষা তে এখন ফার্স্ট বা সেকেন্ড না হলেও কোনো অক্ষ্যেপ আমার নেই কারণ এর পর ই শুরু হবে অংকের ফর্মুলা, জীবন বিজ্ঞান এ জীব দের গঠন, বৃদ্ধি ও বিবর্তন, ইংলিশ এর টেন্স, শাকেস্পেয়ার এর হ্যামলেট ,জুলিয়াস সিসার, ইতিহাস এর হারাপ্পা কম্পিউটার এর জাভা আরো কত কি ,এসব পড়তেই জীবন জেরবার হয়ে যাবে এই খুদে পড়ুয়া দের আর তার পর ই শুরু হবে জীবনে মিথ্যে মিথ্যে লোক দেখানো সফল হয়ে ওঠার ইঁদুর দৌড় আর তারপর ই ঘ্যান ঘ্যানে সংসার জীবন।তাই এই সময় টাই ওদের সব চেয়ে সুন্দর সময় যেখানে জীবনের আসল সুখ শান্তি টা ওরা উপলব্ধি করতে পারে।তাই যা মন চায় করুক এখন না করলে আর কোনোদিন ওরা এই সুযোগ পাবে না ।স্বর্ণালী দিন গুলো ওদের জীবনে যতদিন থাকবে ওরা প্রাণ ভরে নিঃশাস নিতে পারবে।