02/10/2025
পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ: গবাদিপশু নীতির দুই ভিন্ন কাহিনী
নিচের ফটো গুলো সব পাকিস্তানি একটা ব্রিডিং ফার্ম থেকে নেয়া ফটো যেখানে তারা ব্রাজিল থেকে ভালো ভালো জাত ইম্পোর্ট করে নিয়ে এনেছেন ।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতিতে পশুপালন খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু দুধ ও মাংস সরবরাহই নয়, এটি গ্রামীণ জীবিকারও একটি প্রধান ভরসা। তবে গবাদিপশু উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাকিস্তান যেখানে বিশ্বমানের গবাদিপশুর জাত আমদানি ও উন্নয়নে সুন্দর এগিয়ে চলছে, বাংলাদেশ সেখানে এসব জাতের আমদানি নানা অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। বাংলাদেশ লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) এবং ডিপার্টমেন্ট অব লাইভস্টক সার্ভিসেস (ডিএলএস) এই নীতির মূল প্রণেতা। এর ফলশ্রুতিতে কৃষকদের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যতের পশুসম্পদ শিল্পের ওপর গভীর প্রভাব পড়ছে।
পাকিস্তানের অগ্রগামী কৌশল:
পাকিস্তান বৈজ্ঞানিক ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী পথ বেছে নিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে নেলোরে, গুজেরা, গির, রেড শিন্দি , গিরোল্যান্ডো এবং ব্রাহমানের মতো শীর্ষমানের জাত আমদানি করেছে। এসব জাত গরম আবহাওয়ায় মানিয়ে নিতে সক্ষম, উষ্ণমণ্ডলীয় রোগ প্রতিরোধী এবং দুধ, মাংস বা ডুয়াল পারপাস এ অত্যন্ত কার্যকর।
তারা কেবল দেশীয় জাত যেমন সাহিওয়াল ও রেড সিন্ধির সাথে ক্রসব্রিডই করছে না, বরং খাঁটি আমদানি করা জাতগুলোকেও সংরক্ষণ করছে। এর ফলে ভবিষ্যতের জাত উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে উঠছে। কৃষকরা পাচ্ছেন এমন গরু, যারা বেশি দুধ দেয়, এমন ষাঁড় যারা দ্রুত বড় হয় এবং বেশি মাংস দেয়, এবং এমন পশু যারা দক্ষিণ এশিয়ার কঠিন আবহাওয়ায় ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো—পাকিস্তানের খামারি রা এখন উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যেমন ভ্রূণ প্রতিস্থাপন (embryo transfer) ও কৃত্রিম প্রজননের (AI) আধুনিক পদ্ধতি। এর মাধ্যমে তারা দ্রুত উচ্চমানের জাত তৈরি করছে এবং আন্তর্জাতিক মানের পশুর জেনেটিক্স স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছে দিচ্ছে।
অবশেষে, পাকিস্তানের নীতি কৃষকদের ক্ষমতায়ন করছে, দুধের গুঁড়ো আমদানির প্রয়োজন কমাচ্ছে এবং একটি টেকসই পশুসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করছে। এটি বিজ্ঞানের সাথে বাস্তবতা এবং অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার মেলবন্ধনকে প্রতিফলিত করে।
বাংলাদেশের সীমাবদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ নীতি:
অন্যদিকে বাংলাদেশ বিপরীতমুখী এবং অত্যন্ত কনসারভেটিভ। বিএলআরআই , বিদেশি জাত যেমন ব্রাহমান, গির, গুজেরা ও নেলোরে আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাদের যুক্তি হলো—ব্রাহমান জাত ব্যবহার করলে দেশীয় জাতের সাথে ক্রসব্রিডের প্রথম প্রজন্মে (F1) দুধের উৎপাদন কমে যাবে। কিন্তু এই উক্তি তেমন যৌক্তিক নয়। বাস্তবে বাংলাদেশের দেশীয় গরুরা গড়ে মাত্র ২–৪ লিটার দুধ দেয় (বাছুরকে খাওয়ানোর পর)। অথচ আমেরিকার খাঁটি ব্রাহমানও এর চেয়ে বেশি দুধ দেয়। আর ডুয়াল পারপাস গির, গুজেরা ও গিরোল্যান্ডো প্রতিদিন ১০–৪০ প্লাস লিটার পর্যন্ত দুধ দিতে পারে, যা স্থানীয় জাতের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
এছাড়া আরেকটি দিকও আছে। বাংলাদেশের কিছু খামারি ব্রাহমান নিয়ে অতিরিক্ত হাইপ তৈরি করে এবং অত্যধিক দাম দাবি করে জাতটিকে খারাপ ভাবমূর্তির দিকে ঠেলে দেয়। ফলে ব্রাহমান একটি উপকারী জেনেটিক সম্পদ না হয়ে “লোভ ও শোষণ”-এর প্রতীকে পরিণত হয়। সরকারও এই সুযোগে আমদানি আরও বন্ধ করে দেয় এবং কৃষকদের বলে যে বিদেশি জাত বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত নয়।
অন্যদিকে, সরকার বেছে বেছে হোলস্টেইন ও ফ্রিজিয়ান জাতকে অনুমতি দেয়—যারা ইউরোপীয় জাত এবং বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় দুর্বলভাবে মানিয়ে নিয়েছে , রোগে বেশি আক্রান্ত হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেশি। এ জাতগুলো গ্রামীণ বাস্তবতায় ব্যর্থ হয়েও সরকারি প্রকল্পে চালু থাকে। অথচ আবহাওয়া-সহনশীল ব্রাজিলের জাতগুলোকে আটকানো হয়। এই দ্বিমুখী নীতি আসলে অন্য প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কারসাজি ও একাধিপত্য:
ঘনিষ্ঠভাবে দেখলে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশ সরকার , BLRI বিজ্ঞানের চেয়ে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার দিকেই বেশি মনোযোগী। কৃষকদের বৈশ্বিক গবাদিপশুর জেনেটিক সম্পদে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিয়ে তারা কৃষকদেরকে তাদের কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচি ও ক্রসব্রিড প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল করে রাখছে। এসব প্রকল্প অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না, কিন্তু সরকারি বাজেট ও প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা নিশ্চিত করে।
ফলে সাদারণ মানুষ রা বিভ্রান্ত হচ্ছেন যে ব্রাহমান বা বিদেশি উল্লেখিত জাত আমদানি করলে জাতীয় পশুর ক্ষতি হবে। বাস্তবে এটি উল্টো—বাংলাদেশ এমন জেনেটিক সম্পদ হারাচ্ছে, যা তার জলবায়ু ও কৃষি প্রয়োজনের জন্য একেবারে উপযোগী।