18/06/2026
‘ডাকনাম ভুলে গেছি’
ওবায়েদ হক
একটি চরিত্রকে ছোট থেকে বড় করা হয়েছে প্রতিটি শব্দে শব্দে। হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছু শৈশব’-এর পর আরেকটি শৈশব পড়ে ভালো লাগল। এ শৈশব দস্যিপনা নয়, একাকীত্ব আর মায়ায় জড়ানো। এই বেড়ে ওঠার অংশটা প্রায় অর্ধেক বই জুড়ে। প্রতিটি শব্দ পড়তে ভালো লাগছিল, এত এত ‘সচরাচর চিন্তার বাইরের উপমা’ আমি এর আগে কোথাও পাইনি। উপমাগুলো পড়ে এটাই মনে হয়—প্রকৃতির চারপাশের সবকিছুই যেন এক একটি চরিত্র।
এই প্রায় অর্ধেক বইয়ের অংশ আমার পড়া সবথেকে সুন্দর লেখাগুলোর মধ্যে উপরের দিকে থাকবে। স্বাভাবিক কোনো লেখার চেয়েও এতে বেশি কিছু ছিল। মাঝে মাঝে প্রকৃতির এমন বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যা বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’-কেও ছাপিয়ে গিয়েছে বলে মনে হয়েছে।
প্রথম অর্ধাংশের স্বাভাবিক লেখার মাত্রা ছাড়িয়ে উড়তে থাকা বইটির বাকি অংশ জুড়ে একটি কাহিনি দাঁড় করাতে গিয়ে সচরাচর লেখা কোনো ফিকশনের পর্যায়ে নেমে এসেছে। এ ফিকশনে থ্রিল আছে, মোটামুটি ভালো একটি গল্প আছে, মায়া আছে।
পরিশেষে, পাঠকের ভাবনাকে সম্মান জানিয়ে অসমাপ্ত সমাপ্তি। শেষটা ঠিকঠাক জানতে না পারার হতাশা দিয়ে বই শেষ হয়ে যায়, এমন ফিনিশিং কখনোই পছন্দ হয় না।
সব মিলিয়ে আগ্রহ নিয়ে পড়ার মতো একটি বই।
[নিজের মনে রাখার জন্য—শৈশবের এক একটি লেয়ার হারানোর ব্যথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ঢাকার বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়া, গ্রামে চলে আসা, একঘরে জমিদার বাড়ির ভুতুড়ে ইতিহাস, মাকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলা, বাবার চলে যাওয়া, নিজের স্বয়ংসম্পূর্ণ একাকী পুরুষ হয়ে ওঠা, হুজুর ইখলাক হোসেনের আগমন-বউ মরিয়মের সাথে তার চিঠির অস্থিরতা-ইখলাক হোসেনের চলে যাওয়া-মরিয়মের মৃত্যু, মডেল হীরার আগমন, চোর রশিদ মিয়ার বর্ডারের চোরাকারবারিতে ফুলেফেঁপে ওঠা, হীরার বর্ডার পার হওয়ার থ্রিল, রশিদ মিয়ার মারা যাওয়া, হীরার সন্তানের অস্তিত্বহীন অবস্থার অস্তিত্ব দেওয়ার জন্য হাসানের ঢাকা যাওয়া, ফেলে আসা ঢাকার বাড়ি-ইখলাক হোসেন-বাবার নিদারুণ খোঁজ, নির্বাচনে প্রায় জিতে যাওয়া ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর শাকেরের থেকে সবার মুক্তি, গ্রামে ফিরে আসা, হীরার সন্তান হওয়া, অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা।]
‘ডাকনাম ভুলে গেছি’-র এক লাইনে মূল্যায়ন—একটি চ্যাপ্টার পড়ার পর আরেকটি চ্যাপ্টার পড়ার আগ্রহ নয়, বরং একটি শব্দ পড়ার পর আরেকটি শব্দ পড়ার আগ্রহও সৃষ্টি করা সম্ভব।