26/05/2026
আমরা তো জানি আরাফার দিনের দু'আ সবচেয়ে উত্তম দু'আ তাই না? আল্লাহ এ দিনের দু'আ পছন্দ করেন সেটাও তো জানি।
এটাও জানি আল্লাহ থেকে অধিক সংখ্যক মানুষকে এদিনে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন। এই অধিক সংখ্যক বান্দাদের মধ্যে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে না?
জিলহজের দশ দিনের আমল হোক কিংবা দু'আ সবকিছুর সওয়াব ই অন্য দিনের থেকে অনেক বেশি। আরাফের দিনে তা আবার আরো পছন্দের। তাই আরাফার দিনে আমাদের মুখময় বেশি বেশি দু'আ থাকুক।
কিন্তু দু'আ করতে নিলেই তো সমস্যা শুরু?
দু'আ করতে গেলেই মাথা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যায় আমাদের অনেকের তাই না? কত দু'আ প্রয়োজন অথচ কিছুই মনে আসে না।
এমন ব্লাঙ্ক হলে গেলে এই পোস্ট টা দেখে ধরে ধরে দু'আ করবেন। আজ বলবো নিজের জন্য যেসব দু'আ চাইবেন সেগুলো। চলুন দেখি কী কী দু'আ করবো?
• আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার প্রশংসা করে নিবেন। তারপর দুরুদ পড়বেন এবং তারপর দোয়া শুরু করবেন। প্রশংসার জন্য যত সুন্দর শব্দ ব্যবহার করা যায় করবেন। নিজের যতটুকু আবেগ আছে ততটুকু দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করবেন। তারপর নিজের দু'আ করবেন।
• নিজের জন্য দু'আর সময় প্রথমে গুনাহ দিয়ে শুরু করবেন। আপনি অনুতপ্ত, এই বিষয় টা আল্লাহ খুব পছন্দ করেন। গুনাহের কথা বলে-বলে, কেঁদে-কেঁদে আল্লাহর কাছে গুনাহের জন্য ক্ষমা চাইবেন। আল্লাহ তওবাকারীদের পছন্দ করেন। আল্লাহর গুণবাচক নাম গফুরুর রহিম ও আফুয়ুন গফুর ধরে বারংবার অনুতপ্ত হবেন। আরাফার সারাদিন তওবার উপরেই থাকবেন। কান্না যদি না আসে কান্নার অভিনয় করবেন। বারংবার তওবা আল্লাহ পছন্দ করেন তাই বারংবার তওবা করবেন। আল্লাহ অবশ্যই মাফ করবেন।
• আল্লাহর কাছে আল্লাহকে চাইবেন। আমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রসুল ﷺ কে সবথেকে বেশি ভালবাসতে পারি সেই তৌফিক চাইবেন। একসাথেই আল্লাহর কাছে আল্লাহর ভালোবাসা চাইবেন। আল্লাহর ভালোবাসা পেয়ে গেলে আর কিছুর প্রয়োজন হবে না ইনশাআল্লাহ।
• আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইবেন ও জাহান্নাম থেকে পানাহ চাইবেন, জাহান্নামের কাঠিন্যে বর্ণনা করে পানাহ চাইবেন। আপনি কমজোর, আপনি জাহান্নামের আগুন সহ্য করতে পারবেন না, জাহান্নামের শাস্তি সহ্য করতে পারবেন না আল্লাহ কে এসব বর্ণনা করবেন। আল্লাহকে বলবেন, "আল্লাহ আমি গুনাহ করেছি কিন্তু শাস্তি সহ্য করার মতো ক্ষমতা আমার নেই, তাই আপনার রহমতের ওসিলায় আপনাকে মাফ করে দিন।"
• আল্লাহর কাছে নিজের জন্য উত্তম আখলাক চাইবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে সব থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ আখলাক চাইবেন। আপনি যেন বিনয়ী, ভদ্র, নম্র ও উত্তম বান্দা হতে পারেন তা চাইবেন। উত্তম আখলাকের গুণগুলো ধরে ধরে চাইবেন। সাথেই বদ গুণের উপর যেন আপনার নিয়ন্ত্রণ থাকে সেই তৌফিক চাইবেন। যেমন- যদি আপনার রাগ বেশি থাকে, তবে আল্লাহকে বলবেন, "ইয়া আল্লাহ, আমার রাগের উপর আমার কন্ট্রোল দিন এবং রাগকে কমিয়ে দিন। "
• আল্লাহর কাছে হিকমাহ বা প্রজ্ঞা চাইবেন। সঠিক সময়ে সঠিক কথা এবং সঠিক সময়ে সঠিক কাজ যেন করতে পারেন সেই তৌফিক চাইবেন।
• কুরআনের প্রতি অঢেল মুহাব্বত চাইবেন। কুরআন যেন আমাদের জীবনের পাথেয় হয় তা চাইবেন। কুরআন যেন আমাদের হৃদয়ের বসন্ত হয় তা চাইবেন। কুরআনের সাথে যেন পথ চলা সহজ হয় সেটাও চেয়ে নিবেন।
• জীবনে সহজতা চাইবেন খুব করে। যে পরিস্থিতি ই আসুক আপনার জন্য যেন তা সহজ হয়ে যায়। কঠিন পরিস্থিতিও সহজ লাগে। সাথেই আফিয়াত চাইবেন, কল্যাণ চাইবেন।
• যারা অবিবাহিত তারা উত্তম স্বামী চাইবেন। আপনি একজন উত্তম স্বামীর মধ্যে গুণ কল্পনা করেন সে সকল গুন ধরে ধরে দু'আ করবেন। বিনয়ী, রাগ কম থাকা, ম্যাচিউর, দায়িত্বশীল আরও যেসব গুণ আপনি চান সব ধরে দু'আ করবেন। সাথেই দু'আ করবেন তিনি যেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আদর্শের অনুসারী হন। মনে রাখবেন আপনার হাসবেন্ড শুধু আপনার হাসবেন্ড না বরং পরিবারের অংশ হবেন এবং আপনার সন্তানের পিতা হবেন। তিনি যদি উত্তম না হযন সন্তান উত্তম কামনা করা ও লালনপালন করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। তাই দু'আতে কৃপণতা করবেন না। যেসব বোনেরা বিবাহিত তাদের বেশিরভাগ বোনেরাই বলেছেন তারা চাওয়ার থেকে অধিক পেয়েছেন, তাই ধরে ধরে চাইতে কৃপণতা করবেন না।
• নিরাপত্তা চাইবেন আল্লাহর কাছে। বর্তমানের যে পরিবেশ-পরিস্থিতি, সেই পরিবেশ- পরিস্থিতিতে নিরাপদ থাকা একটা নিয়ামত। আল্লাহর কাছে নিজের ও নিজের পরিবারের জন্য নিরাপত্তা চাইবেন। আল্লাহকে বলবেন, "আল্লাহ এমন কোন কিছু দ্বারা আমাদের পরীক্ষা করবেন না, যা আমরা সহ্য করতে পারবো না। সম্মানহানি থেকে আমাদের রক্ষা করুন এবং সব সময় যেন আমরা নিজের আব্রু রক্ষা করে চলতে পারি সেই তৌফিক দান করুন। "
• বিবাহিত হন কিংবা অবিবাহিত উত্তম সন্তান চাইবেন। প্রত্যেক নারী তার সন্তান নিয়ে কল্পনা করে তাই না? যে পর্যায়ে আপনি আপনার সন্তানকে দেখতে চান। সেই অনুযায়ী দু'আ করবেন। কী কী দু'আ করা যেতে পারে পরের পোস্ট এ বলবো ইনশাআল্লাহ।
• দ্বীন পালনের মতো শিথিল পরিবেশ চাইবেন রব্বানার কাছে। যে পরিবেশ আপনি থাকেন সে পরিবেশ যেন দ্বীন পালনের জন্য সহজ হয়। সাথেই ভবিষ্যতে যে পরিবেশগুলোতে আপনি যাবেন এই পরিবেশগুলো যেন দ্বীন পালনের জন্য উত্তম হয় সেই দু'আ করবেন।
• উত্তম সহবত চাইবেন, যত উত্তম মানুষদের সাথে মিশতে পারবেন তত বেশি ঈমান তাজা হবে এবং আমলে আগ্রহ আসবে। সাথেই দ্বীন পালন সহজ হবে। তাই আজীবন উত্তম সহবতের মাঝে যেন থাকতে পারেন আল্লাহর কাছে তা চাইবেন, অবশ্যই চাইবেন।
• আল্লাহর কাছে উত্তম জ্ঞান অর্জন করার তৌফিক চাইবেন। যদি আপনি হাফেজা হতে চান, হিফজ করার তৌফিক চাইবেন। আল্লাহ যেন স্মরণশক্তি মজবুত ও বৃদ্ধি করে দেন সেই দু'আ অবশ্যই চাইবেন। যেসব উত্তম জ্ঞান আমরা অর্জন করেছি সেই জ্ঞানগুলো যেন মনে থাকে এবং জ্ঞান অনুযায়ী আমল করা যায় সেই তৌফিক চাইবেন।
• উত্তম আমল করার তৌফিক চাইবেন বেশি বেশি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার তৌফিক ছাড়া কিছুই হয় না। তাই আমলের ক্ষেত্রে তৌফিক চাইবেন। যখন চাইলেও আমল করতে পারবেন না তখন আল্লাহর কাছে নিজের কমজোরি দেখাবেন, আপনি পারছেন না প্রকাশ করবেন। আল্লাহ যেন সেই শক্তি ও মনোবল দিয়ে দেন তা চাইবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ফরজ নামাজের পর সুন্দর একটি দু'আ শিখিয়ে গেছেন।
দু'আটি হলো-
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
অর্থ:হে আল্লাহ! আপনার জিকির (স্মরণ) করতে, আপনার শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় করতে এবং সুন্দরভাবে আপনার ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন।
• শোকরগুজার বান্দা হওয়ার তৌফিক চাইবেন। সূরা ইবরাহীমে আল্লাহ বলেছেন শোকোরগুজার বান্দাদের নিয়ামত আল্লাহ বাড়িয়ে দেন। তাই এমন বান্দা হতে যে শোকোরগুজার। যদি পরিপূর্ণভাবে শোকরগুজার বান্দা হতে পারেন তবে আপনার নিয়ামত আপনি গণনা করে শেষ করতে পারবেন না ইন শা আল্লাহ। তাই অধিক পরিমাণে শুকরিয়া আদায় করতে থাকুন। যখন আলহামদুলিল্লাহ পড়বেন অন্তর থেকে সন্তুষ্টি চিত্রে পড়বেন। বারংবার পড়বেন।
• আল্লাহর কাছে সবরকারী বান্দা হতে চাইবেন না। একজন আলেমের পোস্ট দেখেছিলাম যিনি বলেছিলেন, যে বান্দা যত বেশি সবরকারি তার জন্য পরীক্ষাও তত বেশি। তাই সবরকারী হতে চাইবেন না। তবে আল্লাহকে বলবেন," প্রতিটা পরিক্ষায় যেন আমি সবরকারী বান্দা হতে পারি সেই তৌফিক দিন আল্লাহ। প্রতিটা পরীক্ষায় যেন আমি আপনার উপর ভরসা করতে পারি, তাওয়াককুল করতে পারি এবং কষ্ট হলেও সবর করতে পারি। "
• সুস্থতা আল্লাহর অনেক বড় নিয়ামত যে নিয়ামতের বিষয়ে আমরা সবথেকে বেশি গাফেল থাকি। তাই সুস্থ সময় অসুস্থতা থেকে পানাহ চাইবেন। হর হামেশাই আল্লাহর কাছে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা চাইবেন। সুস্থ না থাকলে কোন আমলই উত্তমভাবে করতে পারবেন না। সাথেই আল্লাহর কাছে অন্তরের প্রশান্তিও চাইবেন।
• সঠিক পথ জানা ও বোঝাই যথেষ্ট না। আমৃত্যু তাতে অটল থাকাই সাফল্য, অন্যথায় ধ্বংস। তাই সঠিক পথের উপরে অটল থাকার দু'আ করবেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ নিজে এ বিষয়ে দু'আ করেছেন ও আমাদের শিখিয়ে গেছেন।
দু'আটি হলো- يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
অর্থ- হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আপনি আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন।"
• বাইতুল্লাহ সফর করার তৌফিক চাইবেন। সামর্থ্য থাক না থাক অবশ্যই চাইবেন! বারংবার উমরাহ করার তৌফিক চাইবেন।
• বেশি বেশি নিয়ামত চাইবেন আল্লাহর কাছে। জামার প্রয়োজন হোক, জুতার হোক, সাজসজ্জার জিনিসপাতির হোক সব আল্লাহর কাছেই চাইবেন। দেখবেন মিরাকালি সেসব পেয়ে গেছেন।
• আপনার সকল আকাঙ্ক্ষা সব আল্লাহর কাছে পেশ করবেন। আল্লাহ সকল কিছু শুনেন এবং আল্লাহর ভান্ডারে কোন কিছুর কমতি নেই, তাই নিজের জন্য যা যা প্রয়োজন আল্লাহর কাছে চাইবেন।
• অধিক পরিমাণ আল্লাহর রাস্তায় বিনিয়োগ যেন করতে পারেন সেই তৌফিক চাইবেন। অন্তরে যেন কৃপণতা না আসে। মুক্ত হস্ত যেন বিনিয়োগ করা সহজ হয় তা চাইবেন।
• সবশেষে উত্তমভাবে যেন আপনি শা/হা/দাত পান সেই দু'আ অবশ্যই অবশ্যই চাইবেন। চলে তো যেতেই হবে তাহলে সব থেকে উত্তম পন্থায় না কেন?
বেশ অনেকগুলো দোয়া দিয়ে ফেললাম, আমার দৃষ্টিতে এ প্রত্যেকটা দেওয়াই অনেক বেশি জরুরী। আরাফার দিনে যেন কোন দু'আই মিস না যায়। বেশি বেশি দু'আ করে আল্লাহর প্রিয় হয়ে যাই চলুন?
- Tasnim