18/08/2026
পরকীয়া নিয়ে আমরা সাধারণত খুব দ্রুত একটি নৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই—কে ভালো, কে খারাপ, কে দোষী, কে নির্দোষ। কিন্তু সামাজিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, পরকীয়া শুধু দুজন মানুষের গোপন সম্পর্কের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আকর্ষণ, আবেগ, সামাজিক অনুমোদন, তুলনা, আত্মপরিচয়, মানসিক নির্ভরতা, দাম্পত্যের দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস এবং মানুষের নিজের সিদ্ধান্তকে ন্যায্য প্রমাণ করার প্রবণতা।
সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা চোখে পড়ল, যেখানে একজন বিবাহিত পুরুষ নতুন একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত বর্তমান স্ত্রীকে ছেড়ে নতুন মানুষটিকে বিয়ে করতে চাইছেন। তার যুক্তি—নতুন মানুষটি তাকে ছাড়া থাকতে পারবে না, আর তাকে হারালে সেই মানুষটির জীবনে আর কেউ থাকবে না। কথাটা শুনতে খুব আবেগপূর্ণ। কিন্তু সামাজিক মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোনো সম্পর্কের তীব্রতা কি তার স্থায়িত্বের প্রমাণ? সব সময় নয়।
বরং অনেক সময় তীব্র আবেগ আমাদের বাস্তবতার চেয়ে সম্পর্কটিকে অনেক বেশি নিখুঁত বলে মনে করায়। এই ধরনের ঘটনা আমি নিজেও কাছ থেকে দেখেছি। এমন দুই জোড়া দম্পতির ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের স্বামীর বক্তব্য শুনেছি—বর্তমান স্ত্রীকে ছেড়ে নতুন সম্পর্কের মানুষটির কাছে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, এবং সেই মানুষটিকে ছাড়া নিজের জীবন অর্থহীন মনে হওয়া। দুটো ঘটনা আলাদা হলেও বক্তব্যের মধ্যে আশ্চর্য মিল ছিল। তখন একটা বিষয় খুব ভাবায়—মানুষ কীভাবে এমন অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে বহু বছরের একটি সম্পর্ক, সংসার, পরিচিত মানুষ, সামাজিক বন্ধন—সবকিছু হঠাৎ করে নতুন একজন মানুষের তুলনায় তুচ্ছ মনে হতে শুরু করে?
এর একটি বড় ব্যাখ্যা হতে পারে novelty effect—নতুনত্বের প্রভাব। দীর্ঘদিনের সম্পর্কের মধ্যে মানুষ একে অপরকে খুব ভালোভাবে চিনে ফেলে। শুরুতে যে বিষয়গুলো নতুন ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে দৈনন্দিন হয়ে যায়। একজন সঙ্গীর হাসি, কথা বলার ধরন, অভ্যাস, দুর্বলতা—সবই পরিচিত হয়ে যায়। অন্যদিকে নতুন একজন মানুষকে ঘিরে থাকে অজানা অনেক কিছু। তার সঙ্গে প্রতিটি কথোপকথন নতুন, প্রতিটি দেখা নতুন, প্রতিটি মেসেজে উত্তেজনা থাকে।
এই নতুনত্ব অনেক সময় মস্তিষ্কে প্রবল আকর্ষণ তৈরি করে। তখন মানুষ ভুল করে ভাবতে পারে—“আমি এই মানুষটির সঙ্গে এতটা ভালো অনুভব করছি, নিশ্চয়ই এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা।” অথচ অনুভূতির তীব্রতা এবং সম্পর্কের গভীরতা সব সময় একই বিষয় নয়। নতুন সম্পর্কের উত্তেজনা কমে গেলে সেই মানুষটির সঙ্গে বাস্তব জীবনের সামঞ্জস্য কেমন হবে, সেটি তখনই বোঝা যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো idealization—নতুন মানুষকে বাস্তবের চেয়ে বেশি নিখুঁত করে দেখা। একজন বিবাহিত মানুষ যখন নিজের বর্তমান সম্পর্কের সমস্যাগুলো নিয়ে হতাশ থাকেন এবং একই সময়ে নতুন কারও কাছ থেকে মনোযোগ, প্রশংসা, আকর্ষণ ও মানসিক উত্তেজনা পান, তখন নতুন মানুষটি তার কাছে খুব সহজেই “পারফেক্ট” হয়ে উঠতে পারেন। কারণ নতুন মানুষটির সঙ্গে তখনও দৈনন্দিন জীবনের চাপ ভাগ করে নিতে হয়নি।
তার সঙ্গে বাজারের হিসাব, সংসারের দায়িত্ব, অসুস্থতা, আর্থিক চাপ, পরিবার নিয়ে মতবিরোধ, দীর্ঘদিনের অভ্যাসের বিরক্তি—এসব বাস্তবতা সামনে আসেনি। ফলে একজন মানুষ অন্যজনের সুন্দর দিকগুলোই বেশি দেখতে পান। অন্যদিকে নিজের জীবনসঙ্গীর ক্ষেত্রে তিনি দেখেন তার প্রতিটি দুর্বলতা, প্রতিটি অভ্যাস, প্রতিটি অসম্পূর্ণতা। ফলে তুলনাটা কখনোই সমান হয় না। একজনকে দেখা হচ্ছে বাস্তবতার আলোয়, আর অন্যজনকে দেখা হচ্ছে কল্পনার আলোয়।
এখানে সামাজিক মনোবিজ্ঞানের আরেকটি বিষয় কাজ করতে পারে—confirmation bias। মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্তের দিকে আবেগগতভাবে ঝুঁকে পড়ে, তখন সে এমন তথ্য বেশি গ্রহণ করতে শুরু করে যা তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে এবং বিপরীত তথ্যকে উপেক্ষা করে। ধরুন, একজন পুরুষ নতুন একজন নারীর প্রেমে পড়েছেন। তখন তিনি তার নতুন সঙ্গীর একটি ছোট ভালো কাজকে বিশাল প্রমাণ হিসেবে দেখবেন—
“দেখো, সে আমাকে কতটা বোঝে!” কিন্তু বর্তমান স্ত্রী বছরের পর বছর যে যত্ন করেছেন, সেটিকে হয়তো “স্বাভাবিক” বলে ধরে নেবেন। নতুন মানুষটির সঙ্গে একটি সুন্দর কথোপকথন হয়ে গেলে মনে হবে, “আমরা একে অপরকে অসাধারণ বুঝি।” অথচ বর্তমান স্ত্রীর সঙ্গে দশ বছরের সম্পর্কের মধ্যে হাজারো বোঝাপড়া এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে সেগুলো আর আলাদা করে চোখে পড়ে না। মানুষ অনেক সময় যা প্রতিদিন পায়, তার মূল্য কম অনুভব করে; আর যা নতুন করে পায়, তার মূল্য অতিরিক্ত অনুভব করে।
এই জায়গায় hedonic adaptation-এর ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ নতুন কোনো আনন্দের সঙ্গে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়। নতুন সম্পর্কের উত্তেজনা একসময় স্বাভাবিক হয়ে যায়। আজ যে মানুষটির একটি মেসেজে বুক ধড়ফড় করছে, কয়েক বছর পর তার সেই মেসেজও হয়তো দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যাবে। তখন সম্পর্কের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে। কারণ প্রেমের প্রথম দিকের উত্তেজনা ধরে রাখা সহজ নয়; কিন্তু সম্মান, দায়িত্ব, বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকা—এসবই দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে।
এখানে আরও একটি বিষয় আছে—emotional dependency।
“ওকে ছাড়া আমার কেউ নেই”, “ও আমাকে ছাড়া বাঁচবে না”, “ওকে না পেলে আমার জীবন শেষ”—এই ধরনের বক্তব্য শুনতে গভীর ভালোবাসার মতো মনে হলেও এগুলো কখনো কখনো অতিরিক্ত মানসিক নির্ভরতার লক্ষণও হতে পারে। একজন মানুষ অন্য একজনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারেন, কিন্তু “তাকে ছাড়া আমি অস্তিত্বহীন”—এই ধারণা সুস্থ সম্পর্কের জন্য সবসময় ভালো নয়। সুস্থ ভালোবাসা বলে—“তুমি আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।” অসুস্থ নির্ভরতা অনেক সময় বলে—“তুমি না থাকলে আমার কোনো জীবন নেই।” এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে। একজন সঙ্গীকে ভালোবাসা এবং নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় অন্য একজনের হাতে তুলে দেওয়া এক বিষয় নয়।
পরকীয়ার ক্ষেত্রে আরও একটি সামাজিক প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে—secrecy and shared intimacy। যখন দুজন মানুষ জানেন যে তাদের সম্পর্কটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বা গোপন রাখতে হবে, তখন তাদের মধ্যে একটি “আমরা বনাম পৃথিবী” ধরনের মানসিকতা তৈরি হতে পারে। তারা মনে করতে পারেন, “কেউ আমাদের বোঝে না, শুধু আমরা দুজন দুজনকে বুঝি।” এই গোপনীয়তা সম্পর্কের আবেগকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। কারণ নিষিদ্ধ বা গোপন কোনো বিষয় অনেক সময় মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় মনে হয়।
দুজন মানুষ যখন নিজেদের একটি আলাদা পৃথিবী তৈরি করেন, তখন সেই পৃথিবীটাকে বাস্তব জীবনের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ ও সুন্দর মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সম্পর্ক যখন প্রকাশ্য জীবনে আসে, তখন সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতা, দায়িত্ব এবং প্রত্যাশাগুলোও সঙ্গে আসে। তখন বোঝা যায়, গোপন সম্পর্কের আবেগ আর প্রকাশ্য জীবনের দায়িত্ব এক জিনিস নয়।
এখানে cognitive dissonance-এর কথাও আসে। একজন বিবাহিত মানুষ যদি একই সঙ্গে নিজেকে “ভালো মানুষ” মনে করেন এবং নিজের দাম্পত্যের বাইরে একটি সম্পর্ক তৈরি করেন, তাহলে তার নিজের পরিচয় ও আচরণের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। সেই অস্বস্তি কমানোর জন্য মানুষ নিজের সিদ্ধান্তকে যুক্তিযুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে।
তখন এমন চিন্তা আসতে পারে—“আমার স্ত্রী আমাকে বোঝে না”, “আমাদের সম্পর্ক আসলে অনেক আগেই শেষ”, “নতুন মানুষটিই আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসে”, “আমি এই সম্পর্কের জন্যই বেঁচে আছি।” এর কিছু সত্য হতে পারে, আবার কিছু হতে পারে নিজের সিদ্ধান্তকে মানসিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার উপায়। তাই কোনো পরকীয়ার গল্প শুনে শুধু কথাগুলোকে সত্যের সম্পূর্ণ ছবি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ মানুষ নিজের সিদ্ধান্তকে নিজের কাছেও যৌক্তিক করে তুলতে চায়।
তবে এখানে একটি ভারসাম্য খুব জরুরি। প্রতিটি বিবাহিত সম্পর্ক সুখী—এমন নয়। কেউ বছরের পর বছর মানসিক নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন, অবহেলা, অসম্মান বা গভীর অসামঞ্জস্যের মধ্যে থাকতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে একটি বিবাহ থেকে বেরিয়ে আসা সম্পূর্ণ যৌক্তিক হতে পারে। কাউকে শুধু “সংসার আছে” বলে একটি ক্ষতিকর সম্পর্কে আটকে থাকতে বলা উচিত নয়। কিন্তু যদি নতুন সম্পর্কের কারণে পুরোনো সম্পর্কের ভেতরের সমস্যাগুলো হঠাৎ আবিষ্কার করা হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের সঙ্গে সৎ হওয়া দরকার। সম্পর্কটি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে, নাকি নতুন মানুষের উপস্থিতি পুরোনো সম্পর্কটিকে আরও খারাপ মনে করাচ্ছে—এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।
আরেকটি সামাজিক বাস্তবতা হলো—আমরা অনেক সময় পুরুষের পরকীয়াকে রোমান্টিক করে দেখি। “ভালোবাসার জন্য সংসার ছেড়েছে”, “মনের মানুষকে পাওয়ার জন্য সবকিছু ছেড়ে দিয়েছে”—এই গল্পগুলো সিনেমায় সুন্দর লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তব জীবনে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অন্য একজন মানুষের মানসিক আঘাত, সন্তান থাকলে তাদের ওপর প্রভাব, দুই পরিবারের সম্পর্ক, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব। তাই প্রেমের সিদ্ধান্ত শুধু দুজন মানুষের আবেগের বিষয় নয়; বিশেষ করে বিবাহিত অবস্থায় এটি একটি সামাজিক সিদ্ধান্তও হয়ে যায়। একজন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আছে, কিন্তু তার সিদ্ধান্তের সামাজিক ও সম্পর্কগত পরিণতিও থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কাউকে ভালোবাসা আর কারও সঙ্গে জীবন কাটাতে পারা এক জিনিস নয়। প্রেমে আপনি একজন মানুষের আকর্ষণীয় দিকগুলো দেখতে পারেন। কিন্তু সংসারে আপনাকে তার দুর্বলতা, রাগ, ব্যর্থতা, অভ্যাস, আর্থিক বাস্তবতা, পারিবারিক দায়িত্ব—সবকিছুর সঙ্গে থাকতে হয়। তাই নতুন সম্পর্কের মানুষটি “আমার জীবনের সেরা” মনে হওয়া আর বাস্তবে দীর্ঘমেয়াদি সঙ্গী হিসেবে উপযুক্ত হওয়া—এই দুটোকে এক করে দেখা উচিত নয়।
আমার নিজের চোখে দেখা ওই দুই জোড়া সম্পর্কের কথা মনে পড়লে একটা বিষয় বিশেষভাবে মনে হয়—মানুষ কখনো কখনো বর্তমানের মূল্য বুঝতে না পেরে ভবিষ্যতের একটি কল্পনাকে আঁকড়ে ধরে। নতুন মানুষটি হয়তো সত্যিই ভালো। হয়তো সম্পর্কটিও সত্যিকারের। কিন্তু সিদ্ধান্তটি কি সৎ পথে নেওয়া হচ্ছে? সেটিই আসল প্রশ্ন। যদি বর্তমান সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, তাহলে আগে সেটিকে সম্মানের সঙ্গে শেষ করা উচিত। তারপর নতুন সম্পর্কের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। কারণ একজন মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও অন্য একজনের প্রতি দায়িত্বহীন হওয়ার অধিকার তৈরি হয় না।
দাম্পত্যে বছরের পর বছর পাশাপাশি থাকার কারণে আমরা অনেক সময় সঙ্গীর অবদানকে “স্বাভাবিক” ধরে নিই। তিনি অসুস্থ হলে পাশে থাকা, পরিবারের জন্য কাজ করা, কঠিন সময়ে সহযোগিতা করা, আপনার ভুল ক্ষমা করা, আপনার ব্যর্থতার সময় আপনাকে ধরে রাখা—এসব ধীরে ধীরে দৈনন্দিন হয়ে যায়। তখন নতুন একজন মানুষের সামান্য যত্নও অসাধারণ মনে হতে পারে। তাই দীর্ঘ সম্পর্কের মানুষের মূল্য বোঝার জন্য মাঝে মাঝে নিজের কাছে প্রশ্ন করা দরকার—“এই মানুষটি আমার জীবনে না থাকলে আমি কী কী হারাতাম?” কৃতজ্ঞতা সম্পর্ককে শুধু বাঁচায় না; সম্পর্ককে নতুন করে দেখতে শেখায়।
একই সঙ্গে সঙ্গীর প্রতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে—নিজেকে এমনভাবে ধরে নেওয়া উচিত নয় যে, “সে তো আমাকে ছেড়ে যাবে না।” কারণ কোনো মানুষই কারও সম্পত্তি নয়। ভালোবাসা পাওয়া অধিকার নয়; ভালোবাসার যত্ন নিতে হয়। একজন সঙ্গীকে অবহেলা করে, অসম্মান করে, বারবার তার আবেগকে অগ্রাহ্য করে তারপর আশা করা যে সে সারাজীবন একইভাবে থাকবে—এটিও বাস্তবসম্মত নয়। সম্পর্কের নিরাপত্তা তৈরি হয় দুজনের আচরণে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু “কে কাকে ছেড়ে গেল?” নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা সম্পর্কের মধ্যে মানুষটিকে কতটা মানুষ হিসেবে দেখেছি? তার অনুভূতি, আত্মসম্মান, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ—এসবের মূল্য কতটা দিয়েছি? নতুন সম্পর্কের উত্তেজনা যতই প্রবল হোক, একজন পরিণত মানুষ জানেন যে সিদ্ধান্তের সৌন্দর্য শুধু আবেগে নয়, তার নৈতিকতা এবং পরিণতিতেও। ভালোবাসা যদি সত্যিই এত গভীর হয়, তাহলে সেটিকে লুকিয়ে, প্রতারণার মাধ্যমে বা অন্য একজনের বিশ্বাস ভেঙে শুরু করার দরকার কেন হবে?
তাই আমার কাছে এই ধরনের ঘটনাগুলোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—নতুন মানুষকে পাওয়ার আগে পুরোনো সম্পর্কের সত্যিটাকে পরিষ্কারভাবে দেখতে শিখুন। আপনি যদি কোনো সম্পর্কে সুখী না হন, বেরিয়ে আসুন; কিন্তু সৎভাবে বেরিয়ে আসুন। আপনি যদি নতুন কাউকে ভালোবাসেন, নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করবেন না; কিন্তু সেই ভালোবাসার নামে অন্যের জীবনকে অকারণে ধ্বংস করবেন না। কারণ সম্পর্কের সৌন্দর্য শুধু “আমি তোমাকে চাই” বলার মধ্যে নেই; বরং “তোমার কারণে অন্যায় করব না”—এই নৈতিক সীমারেখাটিও ভালোবাসার অংশ।
আর যে মানুষটি মনে করছেন, “ওকে ছাড়া আমার কেউ নেই”—তারও মনে রাখা উচিত, ভালোবাসা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু পুরো জীবন নয়। একজন মানুষ আপনাকে অসাধারণভাবে ভালোবাসতে পারেন, কিন্তু আপনার নিজের পরিচয়, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব, পরিবার, কাজ, স্বপ্ন এবং ব্যক্তিত্বও আপনার জীবনের অংশ। কাউকে ভালোবাসতে গিয়ে নিজের পুরো পৃথিবীকে একজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলবেন না। কারণ সুস্থ ভালোবাসা মানুষকে পূর্ণ করে; নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে শেখায় না।
শেষ পর্যন্ত নতুন সম্পর্কও একদিন পুরোনো হবে। আজকের উত্তেজনা একদিন দৈনন্দিন জীবনে পরিণত হবে। তখনও যদি দুজন মানুষের মধ্যে সম্মান, সততা, দায়িত্ব, বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক যত্ন থাকে—তবেই বোঝা যাবে সম্পর্কটি শুধু মোহ ছিল না, এর মধ্যে সত্যিকারের ভিত্তিও ছিল। আর যদি সেই ভিত্তি না থাকে, তাহলে মানুষ বুঝতে পারে—সে আসলে একজন মানুষকে নয়, একটি অনুভূতিকে ভালোবেসেছিল।
তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু “আমি কাকে চাই?” এই প্রশ্নটি নয়; “আমি কীভাবে তাকে চাইছি, এই সিদ্ধান্তে কার কতটা ক্ষতি হচ্ছে, এবং এই সম্পর্ক বাস্তব জীবনের পরীক্ষায় কতটা টিকবে?”—এই প্রশ্নগুলোও করা দরকার। কারণ ভালোবাসা শুধু হৃদয়ের ব্যাপার নয়; পরিণত ভালোবাসার সঙ্গে বিবেক, দায়িত্ব এবং সামাজিক সচেতনতাও জড়িয়ে থাকে।
©️Kosturi.