19/06/2026
রিজিকের চাচা বলেন; আমার ভাতিজা #রিজিক গত প্রায় ৪ মাস বাবাকে পায়নি। বাবাকে না পেলেও এতদিন বাবার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হয়েছে। সে অন্তত নিশ্চিত ছিল, তার বাবা অন্তত আছে। দেখা না হলেও কথা তো হবেই! আজকের পর বাবার সাথে আর যোগাযোগ হবেনা বেশ অনেকদিন। কারণ, ওর বাবাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাগারে নেয়া হয়েছে।
আজ সকালে ওর বাবা ওকে বলে গিয়েছে, বাবা আমি নেপালে যাচ্ছি শ্যুটিং করতে। শ্যুটিং শেষ করে চলে আসব। কিন্তু ওর বাবা তো জানত না, আজকের পর ওর সাথে দীর্ঘসময় যোগাযোগ হবেনা। এখন রিজিক কে কিভাবে সামলাব?
ওর বাবা যখন নেপালে ছিল তখন, রিজিক ঘুমাতে পারত না। রাতে ২টা - ৩টা বেজে যেত। ওর বাবা দেশে এসেছে ২ সপ্তাহ হল। এ ২ সপ্তাহে ওর মেন্টাল পিস চলে এসেছিল। বাবাকে পেয়ে কি খুশি ছিল গত ২ টা সপ্তাহ!
আজকে হয়ত অনেকে ভাবছেন, আলভি ভাইয়া দোষী প্রমাণিত হয়েছেন। তাই কারাগারে গিয়েছেন। ব্যাপার টা আসলে তা নয়। কারণ, এখনো চার্জশীট ই হয়নি। তাই দোষ প্রমাণিত হয়নি। ট্রায়াল তো শুরুই হয়নি। কোর্ট কেবল তাকে কাস্টডিতে নিয়েছে। আইনের ভাষায় এটাকে কি বলা হয় জানা নেই।
আজকে কোর্টে জাস্টিস প্রত্যক্ষ করলাম। প্রথমে আমরা আমাদের যুক্তি তুলে ধরলাম কেন আমাদের জামিন প্রয়োজন। আমরা বক্তব্য খুব সাদামাটাভাবে উপস্থাপন করলাম। মূল বিষয় হল, ভাইয়া ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন না। তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার একটা বাচ্চা আছে। তিনি হাইকোর্টে রিট করে নো এরেস্ট ওয়ারেন্ট নিয়ে দেশে এসেছেন। অর্থাৎ ইমিগ্রেশন থেকে এরেস্ট হবেন না। আদালতে আত্মসমর্পণ এর পর আদালত সিদ্ধান্ত নিবেন। চার্জশীট জমা দেয়ার আগ পর্যন্ত জামিন দেয়া হোক। চার্জশীট আর এক সপ্তাহ পর দেয়ার কথা।
আমরা এত আস্তে কথা বলছিলাম যে কেবল পেছনে বসেও আমাদের পরিবার তা শুনতে পারছিল না। উল্লেখ্য, কোর্টে বেশ নয়েজ থাকে, অনেক মানুষ থাকে। তাই অনেক জোর দিয়ে কথা বলতে হয়। আমাদের বক্তব্য আমরাই বুঝতে পারিনি। জাজ আরো দূরে, মানে সামনে ছিলেন। উনার কিছু বুঝার কথাই না।
যাই হোক, এরপর বাদীপক্ষ তাদের যুক্তি আর প্রমাণ উপস্থাপন করলেন। তাদের প্রমাণ গুলো বানোয়াট ছিল। তার থেকেও বড় বিষয় তাদের ভয়েস খুব পরিস্কার ও হাই টোনের ছিল যা পুরো কোর্ট শুনেছে। এমন ভাবে বানোয়াট প্রমাণ উপস্থাপন করলেন যে সেগুলো সত্যি না মানলে নরকে যেতে হবে! প্রমাণ হিসেবে ফেসবুকে ছড়ানো কিছু স্ক্রিনশট ও যুক্ত করল। বেশ কিছু স্ক্রিনশট AI দিয়ে তৈরি করা। যেগুলোর এগেইন্সট এ আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ ছিল। সেই সাথে এমন কিছু ক্লেইম করল যা সম্পূর্ণ অপ্রাসংগিক হওয়ায় কোর্ট তা খারিজ করে দেয়। এছাড়া প্রমাণ হিসেবে আরো কিছু ডকুমেন্ট পেশ করে যেগুলো বাইরে থেকে দেখেই বোঝা যায় সেগুলো কয়েকদিন আগে বানিয়ে আনা হয়েছে, কারণ এতটাই চকচক করছিল। তারা দাবি করছিল, ভাইয়া নাকি ইমিগ্রেশনে টাকা খরচ করে দেশে ঢুকেছে। সেই ইমিগ্র্যান্ট অফিসার দের বিরুদ্ধেও তদন্ত হওয়া উচিত।
তাদের যুক্তির মূল ভিত্তি ছিল: এই ঘটনায় অনেক প্রতিবাদ হয়েছে, মানববন্ধন হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত যদি ছাড়া পেয়ে যায়, তবে দেশে একটা ব্যাড এক্সাম্পল তৈরি হবে।
এরপর আমরা কোন প্রটেস্ট করার প্রয়োজন মনে করলাম না। যুক্তি খন্ডন করলাম না। আমরা যুক্তি দিলাম না যে - হাইকোর্টে রিট করা হয়েছিল যাতে ইমিগ্রেশনে এরেস্ট না করা হয় ভাইয়া কে, হাইকোর্টের আদেশেই নিয়ম মেনে আলভি ভাই আত্মসমর্পণ করেছেন। তার যদি আইন থেকে পালানোর ই হত, তবে নিজে আদালতে এসে আত্মসমর্পণ করতেন না।
আমাদের জুনিয়র রা বার বার পয়েন্ট বলে দিচ্ছিলেন, আর শেষে বাদীপক্ষ কে ডিফেন্ড করার কথা বলছিলেন। কিন্তু আমরা রাজি হলাম না। আমরা অন্য কাউকে আমাদের পক্ষে কথা বলার সুযোগ দিইনি। যদিও বাদীপক্ষে একাধিক ব্যক্তি কথা বলেছেন।
যাই হোক, আমার কাছে এর কোন লজিকাল কারণ নেই। আমি জানিনা কেন এমনটা হল।
আমাদের স্ট্র্যাটেজিতে ভুল ছিল। আমরা আমাদের বক্তব্য সঠিক ভাবে উপস্থাপন করতে পারিনি। বাদীপক্ষ কে ডিফেন্স করার চেস্টাই করিনি।
সবথেকে অবাক করা বিষয় হল, প্রমাণগুলোর ফরেনসিক রিপোর্ট এর আবেদন ই করিনি। উপরন্তু, আমাদের বক্তব্য এত অস্পষ্ট ছিল যে কোর্ট হয়ত বুঝতেই পারেনি।
আমি জানিনা, কেন এমনটা হল। কোর্ট শুরুর আগে আমাদের বিজ্ঞ আইনজীবী বাদীপক্ষের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলছিলেন। বাদীপক্ষের সাথে অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীর কি কথা থাকতে পারে আমার জানা নেই।
তাই কোর্ট যা রায় দিয়েছে তাতে অসন্তোষ প্রকাশের কোন সুযোগ নেই। বরং প্রসিডিউর অনুযায়ী ই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবং সিস্টেমেটিক জাস্টিস ই করেছেন।
কোর্টের কিছু প্রসিডিউরে বাদী আসামি কারো জবানবন্দি নেয়ার সুযোগ থাকেনা। আলভি ভাইয়াও কোর্টে কিছুই বলতে পারেনি। এক্ষেত্রে আইনজীবীই কথা বলেন। তাই, আইনজীবী যদি ডিফেন্স এর চেস্টা নাই করেন সেখানে আমাদের কিছু করার থাকেনা। আর তিনি যদি খুব সিনিয়র হন, ফেসভ্যালু থাকে তাহলে পুরো দুনিয়া ও কিছু করতে পারবেনা।
কোর্টে যার স্ট্র্যাটেজি ভাল হবে, যিনি শক্ত ভাবে তার যুক্তি গুলো তুলে ধরবেন তিনিই বিজয়ী হবেন। এখানে কে দোষী, তার থেকেও বড় বিষয়, কার স্ট্র্যাটেজি কত ভাল। এজন্য কেউ দোষ না করেও জেল খাটে, আবার কেউ হত্যা করেও ছাড়া পেয়ে যায়। সব ই স্ট্র্যাটেজির খেলা।
যাই হোক, আমার কোন আফসোস একটাই, চার্জশীট ছাড়া, কেবল যুক্তি আর প্রমাণ দেখেই কোনরূপ যাচাই বাছাই ছাড়াই যে কাউকে হ্যারেজ করা সম্ভব, জেলে ভরে দেয়া সম্ভব। এজন্য প্রমাণ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন হয়না।
আমরা জাস্টিস পেলাম, ইনসাফ পেলাম না। যদি চার্জশীট হয়ে যেত, আর প্রমাণ গুলো এক্সপার্ট দ্বারা প্রমাণিত হত, যদি মিডিয়া ট্রায়াল থেকে নিশ্চিত প্রমাণ বেশি গুরুত্ব পেত, তাহলে মানসিক প্রশান্তি পেতাম। আফসোস থাকত না।
কোর্ট সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জনমত কে উপেক্ষা করে কোর্ট কোন সিদ্ধান্ত নেয় নি। দোষ প্রমাণ হওয়া থেকে জনগণের কাছে আইনের প্রয়োগকে বিশ্বাসযোগ্য করাই হয়ত কোর্টের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে।
আমি এখন অপেক্ষা করছি সেই দিনের যখন আসলে আলভি ভাইয়াকে আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী হিসেবে না দেখিয়ে হত্যাকারী প্রমাণ করে ফাসি দেয়া হবে। এটা প্রমাণ করা হবে, যে ইকরা ভাবির মৃত্যির সময় আলভি ভাইয়া নেপাল না বরং দেশে, ইকরা ভাবির সাথেই ছিল। এটা আত্মহত্যা না বরং পরিকল্পিত হত্যা!
সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন রিজিক কে তার বাবার থেকে সারাজীবনের জন্য আলাদা করে দেয়া হবে। মা তো নিজেই তাকে রেখে চলে গিয়েছে, এবার নাহয় বাবাও চলে যাক। কি আর করার, তার সবথেকে বড় অপরাধ, সে অন্য ঘরে জন্ম নেয়নি, সে জাহের আলভির ঘরে জন্ম নিয়েছে।
এ ঘটনায় যদি কোন নির্দোষ যদি ভুক্তভোগী হয় তবে সেটা রিজিক। তার পরিবারে আর কোন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই। হয়ত বাকিটা জীবন তাকে অন্যের দয়া আর করুণার উপর বেচে থাকতে হবে।
কারো চিন্তা নেই, তার বাবা ছাড়া তার পরিবার কিভাবে চলবে।
আপ্নারা ফেসবুকে, কোর্টে গালাগালি করে ওর বাবার ফাসি চাইতেই পারেন। কিন্তু ওকে কি বোঝাতে পারবেন? ওর কাছে ওর বাবাই একমাত্র হিরো।
এবার খুশি তো আপনারা? আমি জানি, আপনারা খুশি হন নি। যেদিন রিজিক তার বাবাকে চিরতরে হারিয়ে মানুষের করুণা নিয়ে এতিম হয়ে বেচে থাকবে সেদিন আপনারা সবথেকে খুশি হবেন।
আপনারা নাহয় জাস্টিস পেয়ে যাবেন কিন্তু রিজিক কি ইনসাফ পাবে? না, হয়ত পাবেনা। কারণ সে তো সাধারণ বাচ্চা না, তার বাবা তো জাহের আলভি! ইনসাফ পাওয়ার অধিকার তার নেই।