09/09/2026
ছোটবেলা থেকেই মেয়েকে এমনভাবে ঢেকে রাখেন, আটকে রাখেন, আগলে রাখেন, যেন সে মানুষ নয়, কাঁচের শোকেসে রাখা কোনো জিনিস। খেলতে দেওয়া যাবে না, দৌড়াতে দেওয়া যাবে না, রোদে দাঁড়ানো যাবে না, ছাদে-বারান্দায় যাওয়া যাবে না। মেয়েটার সারাজীবন ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এর অভাব আর পূরণ হয় না।
মেয়েটা একটু বড় হলেই পড়াশোনার বদলে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেন। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগেই তাকে অন্যের ঘরে পাঠিয়ে বলেন, এবার সংসার কর।
তারপর শ্বশুরবাড়ি যৌতুক চাইলে দেন না, নির্যাতন করলে চুপ থাকেন, আর মেয়েটা যখন একদিন লাশ হয়ে ফিরে আসে, তখন বুক চাপড়ে বলেন, আমার মেয়েটা কত ভালো ছিল!
জীবিত মেয়ের জন্য শিক্ষা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, কিছুই জোটে না, মৃত মেয়ের জন্য কান্নার বাজেট ঠিকই বরাদ্দ থাকে। নাটক কম কর প্রিয়!
এ কেমন অভিভাবকত্ব?
এভাবেই মুক্তারা হারিয়ে যায়।
মুক্তার মাত্র ২৫ বছর বয়সের তরুণী। স্বামী শিকদারের বয়স ৩১। ঢাকার খিলক্ষেতে তাদের সংসার। সংসারে ছিল ৫ ও ৪ বছরের দুটি ছোট্ট সন্তান, সাফওয়ান আর তাসফিয়া। যে ঘরটাকে মুক্তা সংসার ভেবেছিল, সেটাই একসময় তার জন্য কারাগার হয়ে উঠেছিল।
একটা ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল। খাটের সঙ্গে বাঁধা। স্বামী শিকদার চামড়ার বেল্ট দিয়ে একের পর এক আঘাত করছে। আর মুক্তা বলছে, আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।
কী ভয়ংকর একটা বাক্য!
যে মানুষটা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে, তার কাছেই তখনও সে ভালোবাসার সার্টিফিকেট জমা দিতে চাইছে। স্বীকৃতি চাইছে।
পাশের ঘরে দুই সন্তান কাঁদছে। মেয়েটা মার খেতে খেতেও বলছে, আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি। আহা মাতৃত্ব!
নিজের শরীরের ওপর যখন একের পর এক আঘাত নেমে আসছে, ব্যথায় যখন শরীর কুঁকড়ে যাচ্ছে, তখনও নিজের কথা ভাবছে না সে।
গত ১লা সেপ্টেম্বর ভাইয়ের কাছে ভিডিও পাঠিয়েছিল। বোনকে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। দুই দিন পর পরিবার জানতে পারল, মুক্তা আর নেই। এই দুই দিন এরা কোথায় ছিল?
ভাই কি একবারও ভাবেনি, ভিডিওতে যে মেয়েটাকে শিকল দিয়ে বেঁধে পেটানো হচ্ছে, তাকে আজই উদ্ধার করা দরকার? একবারও কি পুলিশকে জানানো যেত না? স্থানীয় মানুষজনকে নিয়ে যাওয়া যেত না? যেভাবেই হোক বোনটাকে বের করে আনা যেত না?
হয়তো যেত। কিন্তু তারা সেটা চায়নি।
এই মেয়েটাকে কেন পড়ালেখা করানো হলো না? কেন এমনভাবে বড় করা হলো না, যাতে প্রয়োজনে সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে?
স্বাবলম্বিতা কোনো মেয়েকে স্বামীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অস্ত্র শেখায় না, স্বাবলম্বিতা তাকে শেখায়, অন্যায় সহ্য করে বেঁচে থাকা তার একমাত্র বিকল্প নয়।
একটা মেয়ের গায়ে শুধু বিয়ের শাড়ি তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার হাতে একটা শিক্ষার সার্টিফিকেট দিতে হয়, একটা দক্ষতা দিতে হয়, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হয়, প্রয়োজনে নিজের এবং সন্তানের পেট চালানোর সামর্থ্য দিতে হয়।
কারণ জীবন সবসময় ফুলশয্যার মতো নরম হয় না। কখনো কখনো সেই জীবনই মেয়েটার সামনে কাঁটাতারের বেড়া হয়ে দাঁড়ায়। তখন শিক্ষা আর উপার্জনের ক্ষমতাই হতে পারে সেই বেড়ার বাইরে যাওয়ার দরজা।
আমরা মেয়েদের ছোটবেলা থেকে বলি, সংসার করো। স্বামীকে মানিয়ে চলো। মেয়েদের একটু সহ্য করতেই হয়। বিয়ে হয়ে গেলে ওটাই তোমার ঘর।
খুব কম মানুষ বলে, তোমার যদি সেই ঘরটাই একদিন কারাগার হয়ে যায়, তাহলে বেরিয়ে আসার ক্ষমতাটাও তোমার থাকতে হবে।
মুক্তার পায়ে শিকল ছিল।
কিন্তু শিকলটা শুধু তার পায়ে ছিল না, তার চারপাশে ছিল আরও অনেক অদৃশ্য শিকল।
নির্ভরশীলতার শিকল। সামাজিক লজ্জার শিকল। মানুষ কী বলবে, এই শিকল। সংসার ভেঙে যাওয়ার ভয়।
সন্তান নিয়ে কোথায় যাবে, এই ভয়। আর কখনো কখনো নিজের পরিবারের অসহায় নীরবতাও সেই শিকলেরই অংশ হয়ে যায়।
মেয়েদের শুধু বিয়ে দেওয়ার জন্য বড় করবেন না। তাদের এমনভাবে বড় করুন, যেন তারা চাইলে নিজের জীবনটাও বাঁচাতে পারে। একটা মেয়েকে শিক্ষিত করতে যত খরচ হয়, একজন নির্যাতিত মেয়েকে উদ্ধার করতে কখনো কখনো তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়।
মুক্তাদের গল্প যেন শুধু মৃত্যুর পর নয়, বেঁচে থাকতেই কারও কাছে পৌঁছাতে পারে, সেটাই হোক আমাদের সমাজের উদ্যোগ। শুধু অপরাধীর শাস্তি চাইলে হবে না।
আমাদের মেয়েদের এমনভাবে বড় করতে হবে, যেন তারা জানে, বিয়ে কোনো কারাগার নয়। স্বামী কোনো মালিক নয়। সংসার টিকিয়ে রাখার নামে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়া কোনো ধর্ম, কোনো নীতি, কোনো মহত্ত্ব নয়। মেয়েকে শুধু বিয়ের জন্য প্রস্তুত করবেন না। জীবনের জন্যও প্রস্তুত করুন।
পড়াশোনা শেখান। দক্ষতা শেখান। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া শেখান। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি দিন।
মুক্তার হাসি আর ফিরবে না। হয়তো অন্য কোনো মুক্তার হাসি এখনও বাঁচানো সম্ভব। মুক্ত তাদেরকে বাঁচতে দিন।