24/09/2026
একটা মেয়েকে পড়াতে যাচ্ছেন - এই অপরাধে তাঁর গায়ে ছোড়া হতো গোবর, কাদা আর পাথর। কিন্তু তিনি থামেননি।
প্রতিদিন শাড়ি নোংরা হয়ে যেত। তাই স্কুলে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে আরেকটি শাড়ি নিয়ে যেতেন। স্কুলে পৌঁছে নোংরা শাড়ি বদলে নিতেন। তারপর সামনে বসা মেয়েদের হাতে তুলে দিতেন বই।
তিনিই হলেন সাবিত্রীবাই ফুলে।
ভারতের প্রথম নারী শিক্ষিকা হিসেবে যাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গল্পটা শুরু হয়েছিল আরও আগে।
১৮৩১ সালের ৩ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের নাইগাঁওয়ে জন্ম সাবিত্রীবাইয়ের। মাত্র ১০ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় জ্যোতিরাও ফুলের সঙ্গে। বিয়ের সময় সাবিত্রীবাই ছিলেন অশিক্ষিত। কিন্তু জ্যোতিরাও তাঁকে পড়াতে শুরু করেন।
একসময় যে মেয়েটি নিজেই পড়তে জানতেন না, তিনিই হয়ে উঠলেন একজন শিক্ষিকা। পরে তিনি শিক্ষক প্রশিক্ষণও নেন।
তারপর এল সেই ঐতিহাসিক দিন - ১৮৪৮ সাল।
পুনের ভিড়ে ওয়াড়ায় মেয়েদের জন্য স্কুল শুরু করলেন জ্যোতিরাও ও সাবিত্রীবাই। সেখানে মেয়েদের পড়ানোর দায়িত্ব নিলেন সাবিত্রীবাই। প্রথম দিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ছোট উদ্যোগই বড় আন্দোলনের রূপ নেয়।
আর সমাজ? সমাজ তখন প্রস্তুত ছিল না।
মেয়েরা পড়াশোনা করবে - এটাই অনেকের কাছে ছিল ভয়ংকর ধারণা। তার ওপর দলিত ও বঞ্চিত পরিবারের মেয়েরা পড়বে - এটা যেন আরও বড় অপরাধ।
স্কুলে যাওয়ার পথে সাবিত্রীবাইকে অপমান করা হতো। তাঁর দিকে কাদা, গোবর, পাথর ছোড়া হতো। কিন্তু প্রতিদিন তিনি আবারও স্কুলে যেতেন।
কারণ তিনি জানতেন - আজ যে মেয়েটির হাতে তিনি বই তুলে দিচ্ছেন, আগামীকাল সে হয়তো নিজের জীবন নিজেই বেছে নেওয়ার সাহস পাবে।
শুধু মেয়েদের স্কুল নয়, সাবিত্রীবাই ও জ্যোতিরাও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্যও শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছিলেন। তাঁরা একের পর এক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিক্ষাকে সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন।
সাবিত্রীবাইয়ের লড়াই শুধু স্কুলের দরজায় থেমে থাকেনি।
বিধবা নারীদের জন্য আশ্রয়, বিধবা বিবাহের পক্ষে অবস্থান, বাল্যবিবাহ ও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে কাজ - বিভিন্ন সামাজিক প্রশ্নে তিনি সক্রিয় ছিলেন। ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সত্যশোধক সমাজের কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
তিনি ছিলেন কবিও। ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতার সংকলন ‘কাব্য ফুলে’। তাঁর লেখার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল শিক্ষা ও সামাজিক মুক্তি।
জীবনের শেষ অধ্যায়টাও তাঁর কাজের মতোই সাহসী।
১৮৯৭ সালে পুনেতে প্লেগ ছড়িয়ে পড়লে তিনি রোগীদের সেবায় নেমে পড়েন। এক অসুস্থ শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় নিজেই সংক্রমিত হন।
১৮৯৭ সালের ১০ মার্চ সাবিত্রীবাই ফুলে মারা যান। কিন্তু তাঁর গল্প সেখানেই শেষ হয়নি।
আজ আমরা যখন মেয়েদের স্কুলে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, নিজের পেশা বেছে নেওয়া - এসবকে স্বাভাবিক বলে মনে করি, তখন মনে রাখা দরকার, এই স্বাভাবিকতার পেছনে বহু মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম আছে।
সাবিত্রীবাই ফুলে সেই সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম।
তিনি শুধু মেয়েদের পড়াতে যাননি।
তিনি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে জন্মের কারণে কেউ জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হবে না। আর তাই তাঁর গল্প শুধু ইতিহাসের গল্প নয়। এটা মনে করিয়ে দেওয়ার গল্প - একজন মানুষের সাহসী পদক্ষেপ কখনো কখনো একটি পুরো প্রজন্মের পথ বদলে দিতে পারেন।
আপনার কাছে সাবিত্রীবাই ফুলের জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী দিক কোনটি - তাঁর শিক্ষার লড়াই, নাকি সামাজিক সংস্কারের সাহস?
কমেন্টে জানাতে পারেন।
#নারীশিক্ষা #নারীজাগরণ #ইতিহাস
- ফারজানা আক্তার
#০২