05/05/2024
এটা দু'বছর আগের লেখা। এই সুবিশাল নিবন্ধ লিখতে আমাকে পড়াশোনা করতে হয়েছিলো প্রায় তিন দিন। ইন্টারনেট ঘেঁটে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় ভারতবর্ষের আমের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে হয়েছিলো। তার সঙ্গে, আমের দেশের মানুষ হিসেবে অতীত অভিজ্ঞতা, বাবা-চাচাদের স্মৃতি ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে, অনেক খেটেখুটে লেখাটা দাঁড় করিয়েছিলাম। সেই লেখা কারো কোনো কাজে লেগেছিলো কি না, আমার জানা নেই। তবে আমার নিজের কোনো কাজে লাগেনি - এ কথা স্পষ্ট করে বলে দেয়া যায়।
এরকম নতুন কোনো গবেষণামূলক লিখা আর পোস্ট করবো না ফেসবুকে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অতএব, পুরনো লিখাই পড়ুন।
---
আমের মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। কিছু কিছু পাকা আম ইতোমধ্যেই বাজারে দেখা পাওয়া যাচ্ছে। তবে জাতের আম এখনও পর্যন্ত গাছ থেকে নামার কথা নয়। আমাদের লোভ এত বেশি যে, আমরা ধৈর্য ধরতে পারি না। মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই আমরা পাগল হয়ে যাই মৌসুমী ফল, সবজি, মাছের স্বাদ নেয়ার জন্য। এসব কথা ভেবে "জনস্বার্থে" আম বিষয়ক একটা বড় লেখা লিখেছিলাম গত বছর। সেটাই আবার পোস্ট করলাম। জাতের আম কোনটা কোন্ তারিখ থেকে পাওয়া যাবে মিলিয়ে নিন, সেই অনুযায়ী আম কিনে খান।
---
বাংলাদেশের আম
---------
চাঁপাই নবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর আম সবচেয়ে সুস্বাদু হয় কেন? ভৌগলিক কারণে।
আমগাছের পুষ্টির জন্য মাটি হতে হয় এঁটেল। বরেন্দ্র অঞ্চলের লালমাটি এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযোগী। এর পাশাপাশি, আমবাগানের আবহাওয়া হতে হবে কিছুটা চরমভাবাপন্ন। শীতকালে প্রচণ্ড শীত পড়তে হবে, গরমকালে মারাত্মক গরম। অন্য অনেক গাছের মতো আমগাছ শীতকালে পাতা ঝরায় না। বরং এর পাতায় পাতায় শিশির জমে, কুয়াশায় শাদাটে এক ধরনের স্তর পড়ে যায়, যেটা ঠিক ছত্রাকও না। এখান থেকেই আমগাছ অধিকাংশ পুষ্টি গ্রহণ করে। যে বছর যত শীত পড়ে, সে বছর আমের ফলন তত বেশি হয়। বাংলাদেশের সব জায়গার মাটি এঁটেল নয়, সবখানে ঠিকমতো শীতের তীব্রতাও অনুভূত হয় না। এই কম্বিনেশন যেখানে মিলে যায়, সেখানকার আম সুমিষ্ট ও সুগন্ধি হয়। অনেক দেরিতে এই ব্যাপারটা টের পেয়েছে বান্দরবান, খাগড়াছড়ির পাহাড়িরা। লক্ষ্য করবেন, গত পাঁচ-দশ বছর ধরে পাহাড়ি এলাকায় বিশেষ করে আম্রপালি জাতীয় আমের খুব ভালো ফলন হচ্ছে। কারণটা ওই একই, ভূ-প্রকৃতি ও আবহাওয়ার কম্পিনেশন মিলে যাওয়া। অথচ, উত্তরবঙ্গেরই বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম ইত্যাদি অঞ্চলের আম তেমন সুমিষ্ট নয়। দিনাজপুরের লিচু বিখ্যাত হলেও আম সব বাগানে ভালো হয় না। কারণ, দিনাজপুরের মাটিও পুরোপুরি এঁটেল ও রাঢ় অঞ্চলের মতো লালচে নয়। যেখানে লালমাটি, সেখানে আমবাগান থাকলে সেই বাগানের আম অনেক ভালো স্বাদের হয়। কিন্তু এই একই জমি আবার লিচুর জন্যও আবশ্যক বিধায় বেশি লাভজনক ফল হিসেবে স্থানীয় অধিবাসীরা আমের চেয়ে লিচু বাগানই করে থাকেন বেশি। ভালো জাতের আম বলতে আমি রাজশাহী-চাঁপাই নবাবগঞ্জের আমকেই বুঝি। দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্তঘেষা আরও কয়েকটি জেলায় ইদানিং ভালো আমের ফলন হচ্ছে। সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল ইত্যাদি জেলাগুলোতেও আজকাল বেশ ভালো আম পাওয়া যাচ্ছে। যা হোক, আমের জন্য উপযোগী মাটি ও আবহাওয়া, তথা ভৌগলিক এলাকা সম্পর্কে এর বেশি কিছু বলার নেই। এবার গাছ সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারণা দিই।
ভালো জাতের আমের জন্য এর গাছ হতে হবে উন্নত জাতের। আমরা জানি, আম গাছের চারা জন্মে আমের আঁটি থেকে। কিন্তু খুব উন্নত জাতের আঁটি থেকে জন্মানো চারা বড় হয়ে ওইরকম উন্নত জাতের আম ফলাবে – এটা আশা করা যাবে না। আশা করা দূরে থাকুক, এটা সম্ভবই নয়। আম গাছের গুণ এর ফলে প্রবাহিত হলেও আঁটিতে প্রবাহিত হয় না। তাই রাজশাহী-চাঁপাই নবাবগঞ্জের সকল নার্সারিতে জাতের আমের চারা তৈরি হয় কলম করার মাধ্যমে। আঁটি থেকে যে চারাটি গজালো, সেটি মোটামুটি মাস-খানেক বয়স হয়ে গেলে, তার সাথে গ্র্যাফটিং এবং আরও অন্যান্য উপায়ে কলম করা হয় উন্নত জাতের একটি আমের গাছ থেকে সংগ্রহ করা ডালের। নির্দিষ্ট সময় পর দুটো ডাল মিলে গিয়ে একটি নতুন গাছে পরিণত হয়। সেই চারাটিই মাটিতে রোপন করে একটি উন্নত জাতের আমগাছের আশা করা যেতে পারে। অনেক সময় আঁটি থেকে জন্মানো চারা ব্যবহারই করা হয় না। সরাসরি গাছ থেকে কলম করে ভালো জাতের চারা তৈরি করে ফেলা হয়। আমি আমার গ্রামের বাড়ি চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার হরিনগর গ্রামে কাউকে আঁটি থেকে আমের চারা উৎপাদন করতে দেখিনি। সেখানে বরং আঁটিগুলো রোদে শুকিয়ে চূলায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে দেখেছি।
আরেকটা ব্যাপার প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় জানিয়ে রাখি। আমি ছোটবেলায় দেখতাম, আমাদের আম বাগানে পরপর দুই বছর আমের ফলন হতো না। এক বছর বাম্পার ফলন তো, আরেক বছর একেবারে শূন্য। তাই বলে কিছু আম কি ধরবে না একেবারেই? ধরে, বাজে ফলনের বছরেও অনেক আম ধরে। কিন্তু চাচাদেরসহ স্থানীয় অধিবাসীদের দেখতাম, তাঁরা সেই আম ঝরিয়ে দিতেন মুকুলেই। বড় হতে দিতেন না। বড়আব্বাকে প্রশ্ন করে জেনেছিলাম, পরপর দুই বছর ভালো আম ধরানোর মতো সাধ্য গাছের থাকে না। তাই একটা বছর তাকে রেস্ট দিতে হয়। ফল না ধরিয়ে সে তার পুষ্টি নিশ্চিত করে। তবেই পরের বছরের আম অনেক সুস্বাদু হবে, নচেৎ এ বছর যেমন সামান্য ক'টা আম ধরলো, পরেরবার গাছ ঝেঁপে আম ধরবে বটে, কিন্তু সেই আম স্বাদের হবে না।
যা বলছিলাম। আচ্ছা, আঁটি থেকে কি একেবারেই গাছ হয় না? এমন গাছ যদি গজিয়েই যায়, সেই গাছ বড় হয়ে ফল দিতেই পারে। সেই ফল কি তাই বলে খাবে না কেউ? না, খাবে না। কারণ, সেই আমকে বলা হবে গুটি আম। চাঁপাই রাজশাহীর বাইরের মানুষের ধারণা, গুটি আম মনে হয় আমের একটা জাত। ছোট ছোট আম, যা চুষে খাওয়া যায়, সেই আমকেই অনেকে গুটি আম বলে থাকেন। এটা ভুল ধারণা। গুটি কোনো জাত নয়, বরং অজাত। এমনকি ফজলি আমেরও গুটি হতে পারে, যদি সেই ফজলি আমের গাছটা আঁটি থেকে সরাসরি জন্মানো হয়। সেই আম স্থানীয়রা কেউ মুখে দেবে না। কেউ সেই আম খেতে দিলে তার প্রতি বেজার হবে। আমি স্বচোক্ষে দেখেছি আমার চাচার ক্ষোভ, বিয়াই বাড়িতে তাঁকে গুটি আম খেতে দেয়া হয়েছিলো, ঘ্রাণ শুঁকেই তিনি টের পেয়ে গেছিলেন এবং তৎক্ষণাৎ সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তাঁকে অপমান করা হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে! … আজকাল অভাবের তাড়নায় স্বভাব নষ্ট হচ্ছে, বাজারে হরহামেশাই পাওয়া যাচ্ছে ল্যাংড়া, খিরসাপাত, গোপালভোগের গুটি আম! সেসব আমের না আছে ঘ্রাণ, না স্বাদ। অনেকে হয়তো বুঝতেই পারবে না, কিন্তু যারা আমের দেশের মানুষ, তারা আকার-আকৃতি দেখে, ঘ্রাণ শুঁকেই টের পেয়ে যান, কোনটা আসল জাতের আম আর কোনটা গুটি। নয়তো, আগেকার দিনে এসব গুটি আম ব্যবহার হতো আচার বানানোর জন্য। আমার বাপ-চাচাদের মুখে শুনতাম, গুটি আম পাকিয়ে খাওয়ার মতো ছোটলোকি আর হয় না। … ও হ্যাঁ, ওই যে ছোট আকৃতির আম, যেগুলো চুষে খেতে খুব মজা, সেই আমগুলোর নাম গুটি নয় যদি, তাহলে কী? রাজশাহী-চাঁপাই নবাবগঞ্জে এর নাম মধুচুষকি। আর কেতাবি নামটা বেশ মজার। রাণীপসন্দ! ইংল্যাণ্ডের রাণীর কাছে নাকি এদেশ থেকে অনেক রকমের আম পাঠানো হয়েছিলো, তিনি বিশেষ করে এই আমটা খুব পছন্দ করেছিলেন। সেই থেকে এর নাম রাণীপসন্দ।
তো, ধরুন, আম পাকার সময়কালের ক্রমানুসারে রাণীপসন্দ বা মধুচুষকি আসবে অনেক পরে। তার আগে আছে, ধরুন শুরুতেই – গোপালভোগ। এই আমটা একেবারে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাজারে চলে আসে, দুম করে আবার হাওয়া হয়ে যায়। জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হলো কি হলো না, বাজারে গোপালভোগ চলে এলো। আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট, বোঁটার কাছে ঢ্যাপা মোটা কিন্তু নিচের দিকে প্রায় সূচালো এই আম অনেকটা আতাফলের মতো দেখতে। সুঘ্রাণ আছে, ভালোমতো গাছেই পাকাতে পারলে খুব মিষ্টি। কিন্তু অত ধৈর্য কেউ ধরতে চায় না। বছরের প্রথম আম বলে হাউমাউ করে খেতে শুরু করে দেয়। ফলে, গোপালভোগের খানিকটা টক আম বলে দুর্নাম লেগেই থাকে। তবে, আমটা আঁশবিহীন, কিন্তু খোসা মোটা।
খোসা পুরু খিরসাপাত আমেরও। হ্যাঁ, সেই খিরসাপাত, যাকে হিমসাগর বলে চেনে বাংলাদেশের মানুষ। অথচ, অরিজিনাল হিমসাগরের চেয়ে খিরসাপাত এগিয়ে থাকে প্রায় সকল বিবেচনায়। হিমসাগর কেবল একটা দিক থেকে এগিয়ে থাকে – এই আমের খোসা আর আঁটি মিলিয়ে মাত্র ত্রিশ ভাগ, সত্তর ভাগই খাদ্যোপযোগী। খিরসাপাতের সেটা পঁয়ষট্টি থেকে সাতষট্টি ভাগ। এছাড়া, দুটো আম দেখতে প্রায় একই। তাহলে আলাদা করবেন কীভাবে? এক. খিরসাপাত পেকে নরম হয়ে গেলেও এর খোসা প্রায় সবুজ থাকবে, বড়জোর বোঁটার কাছে খুব সামান্য হলুদ রঙ ধরবে। অপরদিকে, হিমসাগর পাকলে প্রায় হলুদ হয়ে যাবে। দুই. হিমসাগরের ভেতরটাও হলুদাভ, কিন্তু খিরসাপাত ভেতরে টকটকে কমলা রঙ ধারণ করবে। খিরসাপাতেরও অতি-উন্নত একটা জাত আছে, যার নাম খুদি-খিরসা। এই আম যত পরিপুষ্ট হবে, তত এর বাইরেটা কালচে সবুজ হতে থাকবে। পুরোপুরি পুষ্ট ও পাকা আম কালচে সবুজ। কিন্তু ভেতরটা গাঢ় কমলা। আঁটির চারপাশে টকটকে লাল একটা আবরণ থাকে, জেলির মতো। ওই জেলি দিয়ে আঁটি থেকে পাল্প বিচ্ছিন্ন থাকে। এই আমের স্বাদ কোনোকিছুর সাথে তুলনা দিয়ে বোঝানো যাবে না। আজকাল খুদি খিরসার সন্ধান কালেভদ্রে পাওয়া যায়। এই মৌসুমেরই শুরুতে, মানে মাত্র ক’দিন আগে রাজশাহীর এক বন্ধু আম পাঠালেন, সেই চালানে বেশ ক’টি খুদি-খিরসা ভাগ্যক্রমে মিলেছিলো। … খিরসাপাত আর হিমসাগরে আকৃতিগত পার্থক্যও আছে। হিমসাগর অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির, খিরসাপাতের মতো বোঁটার চারপাশটা অত ভরাট নয়। এই জাতটা মূলত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের। তার বাইরে সমগ্র উত্তর ভারতেই হিমসাগর কমবেশি ফলতে দেখা যায়, এমনকি মহারাষ্ট্রেও অল্প পরিমানে ফলে। হিমসাগরের জিআই সনদ ভারতের দখলে (নম্বর ১১২), কিন্তু খিরসাপাত বাংলাদেশের চাঁপাই নবাবগঞ্জের অনুকূলে (সনদ নম্বর ৩)। বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তের জেলাগুলোতে আজকাল ব্যাপক হারে হিমসাগর উৎপাদিত হচ্ছে। হিমসাগরের বয়স খিরসাপাতের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। বড়জার দু’শো বছর ধরে এর প্রচলন, যেখানে খিরসাপাত মুঘল সম্রাট বাবরের পছন্দের তালিকায় ছিলো বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। … বাংলাদেশে প্রচলিত আমগুলির মধ্যে খিরসাপাতই এক নম্বর। দেশের মোট আমের ত্রিশ ভাগই খিরসাপাত।
নোট: রাজশাহী চাঁপাই নবাবগঞ্জে হিমসাগর আম একেবারেই জন্মে না। সে দেশের মানুষেরা হিমসাগর নামটাই শুনতে পারে না। ঢাকায় বা অন্য কোথাও কোনো আমবিক্রেতা যদি আপনাকে রাজশাহীর হিমসাগর বলে আম বিক্রি করতে চায়, তার থেকে দূরে থাকুন। কারণ, ওই আমওয়ালা নির্ঘাৎ রাজশাহী থেকে আম কিনে আনেননি। যদি রাজশাহী থেকে কিনতেন, তাহলে তিনি জানতে পারতেন, আমটার নাম হিমসাগর নয়, খিরসাপাত। … তবে হ্যা, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, নড়াইল, কুষ্টিয়া ইত্যাদি জেলার হিমসাগর কিন্তু অনেক সুস্বাদু। সাতক্ষীরার হিমসাগর জেনেবুঝে, নিশ্চিত হয়ে কিনুন, ঠকবেন না।
খিরসাপাত শেষ হয়ে গেলে বাজারে আসে ল্যাংড়া আম। এই আমের আরেকটা নাম আছে – বারানসি আম। মূলত ভারতের বেনারস অঞ্চলের আদি ফলন বলে এর নাম বারানসি আম। খুব সুস্বাদু এই আম বিখ্যাত এর খুবই পাতলা খোসার জন্য। উপমহাদেশের আমগুলোর মধ্যে ল্যাংড়া আমের খোসাই সবচেয়ে পাতলা। সুপুষ্ট ও পরিপক্ক ল্যাংড়া আম খুবই সুস্বাদু হয়ে থাকে। সুঘ্রাণও আছে এর খুব। তবে, এই ঘ্রাণ অনেকেই সহ্য করতে পারেন না। বকুল ফুলের ঘ্রাণ যেমন মাদকতাময় (বকুল ফুলের মধু থেকে রাম নামক মদ্যপানীয় তৈরি হয়ে থাকে), গাছপাকা ল্যাংড়ার ঘ্রাণও তেমনই। এই আমের ভেতরটা হলুদ থাকে। আকৃতি উপরে নিচে প্রায় একই রকম। ছোটদের ছবি আঁকার বইপত্রে আদর্শ আমের যে ছবি আঁকা হয়, সেটা ল্যাংড়া আমের। এই আমের নাম কেন ল্যাংড়া হলো, তা নিয়ে একটা লোককাহিনী আছে। মোঘল আমলে ভারতের বিহার রাজ্যের দ্বারভাঙায় এই আম চাষ শুরু হয়। আঠারো শতকে এক ফকির সুস্বাদু এই আমের চাষ করেন। এই খোড়া ফকিরের নামে আমটির নামকরণ হয়েছে। ফকিরের আস্তানা থেকে এই জাতটি প্রথম সংগৃহীত হয়েছিল। খোড়া ফকির যেখানে বাস করতেন তার আশেপাশে শত শত আমের গাছ ছিল। তারই একটি থেকে ল্যাংড়া নামের অতি উৎকৃষ্ট জাতটি বেরিয়ে এসেছে। সেই ফকিরের পায়ে একটু সমস্যা ছিল। সেই থেকে এই আমের নাম হয়ে যায় ‘ল্যাংড়া’। এই আমের খাওয়ার উপযোগী অংশ ৭৩ ভাগ! খোসা পাতলা, তা তো বললামই, এর আঁটিও খুবই সরু হয়ে থাকে। আর এর স্থায়িত্বও অপেক্ষাকৃত বেশি মেয়াদী। জুনের মাঝামাঝিতে বাজারে আসে, জুলাইয়ের শেষ অবধি পাওয়া যায়।
আম্রপালি অপেক্ষাকৃত আধুনিক আম। এটা একটা হাইব্রিড জাত। ১৯৭১ সালে এই হাইব্রিড জাতটি উদ্ভাবন করা হয়। ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ড. পিযুষ কান্তি মজুমদার 'দশেরী' এবং 'নিলম' জাতের দুটি আমের সংকরায়নের মাধ্যমে নতুন এ জাতটি উদ্ভাবন করেন। যার নাম দেয়া হয় আম্রপালি। এই আমেরও খোসা পাতলা, সুমিষ্ট। খানিকটা লম্বাটে এই আম দেখতে ফজলি ছোটবেলার মতো। আমার তো একে গরীবের ফজলি ডাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু স্বাদে-ঘ্রাণে ফজলির ধারেকাছে না। আম্রপালি খুব সুমিষ্ট ও সুস্বাদু, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু প্রাকৃতিক আমের যে একটা বুনো সুগন্ধ আছে, সেটা আমি কোনোদিনই পাইনি এই আমে। শংকর আম হওয়ায় এর দুটো জাত দেখা যায়। একটার ভেতরটা হলুদ, অন্যটা কমলা। খেতে দুটোই মিষ্টি, তবে হলুদটা মাঝে মাঝে টক লাগে। পাহাড়ি আম্রপালি সমতলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি স্বাদের।
হাঁড়িভাঙ্গা রংপুর অঞ্চলের আম। রংপুরের তাজহাটের হাঁড়িভাঙ্গা আমের অনেক সুনাম শুনেছি। আমি ঢাকার বাজার থেকে যে ক’বার এই আম কিনেছি, প্রতিবারই কানে ধরেছি, আর কিনবো না। মানুষ প্রতিজ্ঞা করেই সেটা রাখতে পারবে না জেনেবুঝে, আমিও প্রতিজ্ঞা রাখতে পারিনি। বাজারে আর কোনো আম নেই, আমার ছোট মেয়েটা আমের পোকা। তাই দোকানে আম রেখে সামনে দিয়ে চলে আসতে পারিনি। এ থেকেই বোঝা যায়, এই আম হলো অগতির গতি। … রংপুরের বন্ধুরা এই পর্যন্ত পড়ে মহাখাপ্পা হয়ে গেছেন, টের পাচ্ছি। আমাকে ক’জন প্রায়ই স্মরণও করিয়ে দেন, আসল হাঁড়িভাঙ্গা খেতে হলে রংপুরে আসতে হবে বা রংপুরের বাগান থেকে সংগ্রহ করতে হবে। তা, আমের সময়ে রংপুর থেকে কেউ আমন্ত্রণও জানান না, কিনে নিতে চাইলেও কেউ পাঠাতে আগ্রহ দেখান না। তো কী করা যাবে? আপনাদের হাঁড়ি আপনারা ভাঙ্গুন কিংবা জোড়া লাগান, আমার এর বেশি কিছু বলার নেই। … হ্যাঁ, গোপন তথ্য হচ্ছে, রংপুরের খিয়াড় অঞ্চলের হাঁড়িভাঙ্গা নাকি সত্যিই সুস্বাদু। এখন, খিয়াড় অঞ্চলটা রংপুরের কোথায়, তা আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না। কিশোর বয়সে মহিমাগঞ্জে থাকার কালে জানতাম, খিয়াড় এক রহস্যময় অঞ্চল। কপোত-কপোতি পারিবারিক অসম্মতির ভয়ে যুগলবন্দী হয়ে ভেগে গিয়ে যদি একবার খিয়াড় এলাকায় পৌঁছুতে পারে, তাহলেই হয়ে গেল! স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও এদের খোঁজ পাবে না, ফেলুদা-বোমকেশ-শার্লক হোমস যৌথ প্রযোজনায় তদন্ত করলেও নাকি তাদের হদিস বের করতে পারবে না! সত্য-মিথ্যা জানি না, কারণ সেই লেভেলের প্রেম করতে পারিনি যে, প্রেমিকাকে নিয়ে খিয়াড় ঘুরে আসার সৌভাগ্য হবে। গরীবী হালের প্রেম একটা করতাম বটে, তবে মাহতারেমা ছিলেন বোরকাওয়ালী। খিয়াড়-জাতীয় প্রস্তাব দিতে গেলে গণধোলাই খাওয়ার মারাত্মক আশংকা ছিলো, বলাই বাহুল্য।
এবার ফজলির কথা বলা যাক। এই আমের অপর একটা নাম হলো ফকিরভোগ। ফকিরভোগ থেকে এর নাম ফজলি হলো কী করে? কথিত আছে, ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে মালদহের কালেক্টর র্যাভেন সাহেব ঘোড়ার গাড়ি চেপে গৌড় যাচ্ছিলেন। পথে তাঁর পানির তৃষ্ণা পেলে, তিনি স্থানীয় গ্রামের এক মহিলার কাছে পানি খেতে চান। ফজলু বিবি নামে সেই মহিলার বাড়ির আঙিনায় বড় একটি আমগাছ ছিল। ফজলু বিবি সেই আম দিয়ে ফকির-সন্ন্যাসীদের আপ্যায়ন করাতেন বলেই বৃহদাকার এই আমের নাম তখন ফকিরভোগ বলে প্রচলিত ছিলো। ফজলু বিবি কালেক্টর সাহেবকে পানির বদলে একটি আম খেতে দেন। আম খেয়ে কালেক্টর সাহেব ইংরেজিতে তাকে আমের নাম জিজ্ঞেস করেন। বুঝতে না পেরে ওই মহিলা তাঁর নিজের নামটাই বলে বসেন। কালেকটর সাহেব ধরে নেন, আমটার নামই ফজলি। তিনি জেলায় ফিরে এর সুনাম সবার কাছে করতে থাকেন আর সেই থেকে ওই আমের নাম হয়ে যায় ফজলি।
ফজলি আমের খোসা সবচেয়ে মোটা। আঁটি খুব সরু। আকার-আকৃতিতে এই আম সবচেয়ে বড়। সুপুষ্ট একেকটি ফজলি দেড় থেকে দুই কেজি পর্যন্ত ওজনের হতে পারে। সুস্বাদু, মিষ্টি এই আমের সুঘ্রাণ আছে। তবে স্বাদের বিবেচনায় খিরসাপাতের সমকক্ষ নয়। এই আম এর বড় আকৃতির জন্যই মানুষের কাছে সমাদৃত। ফজলির অনেকগুলি জাতভেদ আছে। তার মধ্যে সুরমা ফজলি সবচেয়ে সুস্বাদু হয়ে থাকে। এর আরেকটা নাম চিনি-ফজলি। সুরমা ফজলির আদি নিবাস নাটোর জেলার নারদ নদের তীরবর্তী আমবাগান হলেও বর্তমানে চাঁপাই নবাবগঞ্জের কানসাটে এই আমের সবচেয়ে বড় বাগান দেখা যায়। আগেকার আমলে সুমিষ্ট সুরমা ফজলি ছাড়া অন্য জাতের ফজলিগুলো স্থানীয়রা খুব একটা পছন্দ করেন না বিধায় কাঁচা থাকতেই পেড়ে নিয়ে আচার বানাতেন। আজকাল তো জম-টক আশ্বিনী আমও ফজলি বলে বেচে দিচ্ছে অভাবে-স্বভাব-নষ্ট ফলওয়ালারা।
আশ্বিনীর কথা যখন উঠলোই, এর কথাও একটু বলতেই হয়। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, এটা আশ্বিন মাসের ফল। তবে আজকাল শ্রাবণ মাস থেকেই এটা বাজারে উঠে যায়। ফজলির সাথে পিঠাপিঠি বাজারে হাজির হয়ে ফজলির নামে ধোকাবাজি করে আরকি। বড় বজ্জাত এই আমকে আমি বলি আম সমাজের বাঙ্গি। এটা বিধাতার মিস্টেক। নানান জাতের ভালো ভালো আম বানানোর সময় একটু বেখেয়ালে এটা হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে। আমড়ার মতো টক এই আম নাকি পুষ্ট হলে এবং ভালোমতো পাকলে খুব মিষ্টি হয়। কিন্তু এটা কবে পুষ্ট হয় আর কবেই বা পাকে, তা কে বলবে? আম্রপালির কসম, আমি কোনোদিন মিষ্টি আশ্বিনী চেখেও দেখতে পারিনি, কেউ খেয়েছেন বলেও ফার্স্টহ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স জানতে পারিনি। আচার বানানো আর ডাল-তরকারির স্বাদে ভিন্নতা আনা ছাড়া এই আমের আর কোনো উপকারিতা আছে কিনা, আমার জানা নেই।
তো, এই হলো সংক্ষেপে আমের ইতিহাস। এর বাইরেও অনেক আম থেকে গেলো হয়তো, সেসব নিয়ে আমার খুব একটা জানা নেই, তাই তাদের উল্লেখ করছি না। আমি চাঁপাই নবাবগঞ্জের মানুষ, আমি ছোট থেকে এই ক’টা আমকেই প্রধান আম বলে জেনে আসছি। বাকি আমগুলোকে, ইনক্লুডিং আম্রপালি, আমার বাপ-চাচারা স্বীকৃতি দেননি, আমিও দিলাম না। চাচাদের যৌথ আমবাগানে বড়আব্বার ছোট ছেলে একদিন আম্রপালির চারা রোপন করেছিলেন জানতে পেরে চাচা পঁয়ষট্টি বছর বয়সে তাঁর আঠাশ বছর বয়সী ছেলেকে হরিনগর থেকে লাঠি হাতে তাড়া করে রানীহাটি বাজার পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার রাস্তা খেদিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। লাঠিটা কীসের লাঠি অনুমান করুন তো? ঠিকই ধরেছেন। ওই আম্রপালির চারাটা উপড়িয়ে সেটাকেই লাঠি বানিয়ে নিয়েছিলেন বড়আব্বা!
সর্বশেষ তথ্য: জ্যৈষ্ঠকে মধুমাস বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে, যেটা আদতে ঠিক নয়। বাংলার মধুমাস হলো চৈত্র। ফাল্গুন মাসে সবচেয়ে বেশি ফুল ফোটে প্রকৃতিতে, ফাল্গুন মাসে সেই ফুল আহরণ করে চৈত্র মাসে মৌচাকগুলো টইটুম্বুর করে রাখে মৌমাছিরা। দুই বাংলা মিলিয়ে বছরের আশি ভাগ মধু সংগ্রহ করা হয় চৈত্র মাসে। এ জন্যই চৈত্র মধুমাস। জ্যৈষ্ঠ মাসে সবচেয়ে বেশি সুমিষ্ট ও রসালো ফল পাকে যদিও, কিন্তু ফলের রস থেকে এক বিন্দু মধু সংগ্রহ করে না কোনো মৌমাছি। মধু মানেই তা ফুলের নির্যাস, ফলের নয়। সেই ফল মধুর মতো মিষ্টি হলেও। আর হ্যাঁ, অভিধানে ও ক্লাসিক সাহিত্যেও মধুমাস হিসেবে চৈত্রের নামই লিপিবদ্ধ আছে। তাই এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
©️গুঞ্জন রহমান
[দৃষ্টি আকর্ষণ: একটি পাঠোপযোী লেখা তৈরি করতে অনেক কষ্ট করে অনেক খেটেখুটে, খুঁজেপেতে, পড়াশোনা করতে হয়, সাজিয়ে গুছিয়ে লিখতে হয়, তাতে মূল্যবান সময় ব্যয় হয় অনেক। এত কষ্টের লেখাটা মাউসের কয়েকটা ক্লিকে ঝাটপট কপি করে নিজের টাইমলাইনে সাঁটিয়ে দেয়া কোনো বিবেকবান, শিক্ষিত, ও সভ্য লোকের কাজ নয়। আপনি হয়তো লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আমাকে ট্যাগ করবেন, কিন্তু আপনার ফ্রেন্ড লিস্টেরই কেউ সেই লেখাটা কপি করে নিজের টাইমলাইনে দিয়ে দেবে আপনার এবং আমার নাম সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে। এবং ক'দিন পরে অভিযোগ উঠবে আমারই বিরুদ্ধে - আমিই নাকি তার/তাদের লেখা বিনা অনুমতিতে চুরি করেছি। অতএব, ভাইয়েরা এবং বোনেরা আমার, এই লেখা যদি আপনাদের ভালো লাগে, তো আলহামদুলিল্লাহ। আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন, আমি তাতেই খুশি। ডেকে ডেকে জনে জনে এই লেখা পড়ানোর দরকার নেই। এমন তো না যে, যত বেশি মানুষ পড়বে, তত আমার পকেটে রয়ালটি আসবে। অতএব, আমার লেখা আমার টাইমলাইনেই রাখুন, শেয়ার কিংবা কপিপেস্ট কোনোটারই অনুমতি, আমার পক্ষ থেকে নেই।]