18/07/2026
ভার্সিটির মেধাবী ছাত্র ছিল ইয়ামিন। শুধুমাত্র পড়াশোনাতেই ভালো ছিল না বন্ধুদের প্রতিও ভীষণ টান ছিল তার।
১৭ জুলাইয়ে তার কিছু বন্ধুরা গ্রামের বাড়িতে যেতে পারেনি বিধায় আটকা পড়ে যায় ঢাকাতে। ইয়ামিন তার সেই বন্ধুদেরকে সাহায্য করতে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করে তাদের নানুর বাসাটা খালি আছে কি না।
ইয়ামিনের বাবা হ্যাঁ বলে এবং তাদেরকে সেখানে থাকতে বলে। এর পরদিন ১৮ জুলাই মিরপুরে ইয়ামিনের কিছু বন্ধু গুরুতর আহত হয়।
তখন আন্দোলনে আহত ছাত্রদের পরিচিত কারো রেকমেন্ডেশন ব্যতিত হাসপাতালে ভর্তি নিচ্ছিল না। তাই সকালে যখন ইয়ামিনের বাবা বাসা থেকে বের হয় সে ও তার বাবার পেছন পেছন গ্যারেজ পর্যন্ত যায়।
ইয়ামিনকে আসতে দেখে তার বাবা জিজ্ঞেস করে কিছু বলবে কি না।
ইয়ামিন নির্ধিদ্বায় জানায় মিরপুরে তার কিছু বন্ধু আহত হয়েছে তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। কোন পরিচিত হাসপাতাল আছে কি না সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করে।
কিন্তু তার বাবার পরিচিত না থাকায় তিনি না বলেন এবং টেকনিক্যালের দিকের হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন।
বাবার কাছ থেকে সাহায্য না পেয়ে রাগ করে ইয়ামিন।
এই রাগের জের ধরে ইয়ামিনের বাবা যখন বাড়িতে ফিরে আসে তখনও সে বাবার সাথে কথা বলে না। তার বাবাও কিছুটা চুপ করে থাকে।
এরপর দুজন মিলে মসজিদে যায় জোহরের নামাজ পড়তে। ইয়ামিনের নামাজে দেরি হওয়ায় তার বাবা একটু আগেই বেরিয়ে পড়েন। মসজিদ থেকে বের হয়ে রাস্তায় থাকা অবস্থাতেই কল পান ইয়ামিনের বাবা।
কল দিয়ে ইয়ামিনের মা বলে- আপনার ছেলে মসজিদ থেকেই আন্দোলনের দিকে রওনা দিছে। সে না কি তার বন্ধুদেরকে দেখতে যাবে। আমি না করেছি কিন্তু আমার কথা শুনেনি। আপনি দেখেন কি করা যায়।
সকালে বাবার সাথে খানিকটা রাগ করায় ইয়ামিনের বাবা বুঝতে পারছিলেন না তার কল ধরবে কি না। তাই তিনি আবার কল করেন ইয়ামিনের মাকে এবং সে কোনদিকে গিয়েছে জিজ্ঞেস করতে বলেন।
কিন্তু এবারে আর কল ধরে না ইয়ামিন। বাসার ফিরে তার বাবাও অনবরত কল দিতে থাকে কিন্তু এবারে ধরে না। ইয়ামিনের মা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
ইয়ামিনের বাবা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতে থাকেন- মিছিলের কারণে হয়তো কলের আওয়াজ শুনতে পায়নি। তুমি টেনশন করো না, আমাদের ছেলে ফিরে আসবে।
এভাবেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয় তবুও কোন খোঁজ নেই ইয়ামিনের। দুশ্চিন্তা আরও বাড়তে থাকে বাবা-মায়ের। এরপর আনুমানিক বিকেল তিনটার দিকে অপরিচিত নাম্বার থেকে একটা কল আসে।
কল দিয়ে বলে- আপনি কি ইয়ামিনের বাবা? তাড়াতাড়ি সাভার এনাম মেডিকেলে চলে আসেন।
ছেলের কি হয়েছে সেটা জিজ্ঞেস করার সুযোগ পায়নি ইয়ামিনের বাবা-মা। দৌঁড়ে ছুটে যান হাসপাতালে।
অন্যদিকে নামাজ শেষ করেই ইয়ামিন চলে এসেছিল সাভার মহাসড়কের আন্দোলনে। সেদিন রোজাও রেখেছিল সে।
ওখানে তখন প্রচুর শিক্ষার্থী ছিল। তাদেরকে মোকাবিলা করার জন্যে বিপরীত দিকে অসংখ্য পুলিশ বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে ছিল।
ছাত্ররা নিজেদের মত করে স্লোগান দিচ্ছিল। কিন্তু পরমুহূর্তে কিছু বুঝে উঠার আগেই পুলিশ গু*লি করা শুরু করে। এতে ছাত্ররা কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পুলিশের টার্গেট করা গু*লি এসে লাগে ইয়ামিনের গায়ে।
ইয়ামিন মাটিতে বসে পড়ে। ইয়ামিনকে গু*লিবিদ্ধ হতে দেখে ছাত্ররা তাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে কিন্তু কোনভাবেই পারছিল না। তার আগেই পুলিশ এসে তাকে এপিসি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।
সবাইকে ভয় দেখানোর জন্যে পুলিশ ইয়ামিনের দেহটাকে গাড়ির উপরে তুলে সবাইকে দেখাতে থাকে। ইয়ামিনের তখন কোন সেন্স ছিল না কিন্তু সে তখনও জীবিত ছিল।
তারপর পুলিশ তার দেহটাকে গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেয়। টানতে টানতে নিয়ে আসে বিপরীতে পাশের রাস্তায় এবং সেখানে ফেলে দিয়ে চলে যায়।
ইয়ামিনের দেহটাকে ফেলতে দেখে দৌঁড়ে ছুটে আসে ছাত্ররা। তারপর ধরাধরি করে নিয়ে যেতে চায় হাসপাতালে। এটা দেখে পুলিশ আবারও গু*লি করে।
অনেকক্ষণ পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ইয়ামিনের বাবা-মা খুঁজতে থাকেন তাদের ছেলেকে। একতলায় খুঁজে না পেয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকেন।
উপরতলায় উঠার পরপরই একজন মহিলা ডাক্তার দৌঁড়ে এসে জিজ্ঞেস করে- আপনারা কি ইয়ামিনের বাবা-মা?
তারপর কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরে ইয়ামিনের মাকে।
তারপর ওই ডাক্তার তাদেরকে নিয়ে আসে নিচতলায়। ইয়ামিনের বাবা ভেবেছিলেন সামান্য অসুস্থ হওয়ায় হয়তো নিচে অক্সিজেন দিয়ে রেখেছে। একটু আশা নিয়ে নেমে আসেন নিচতলায়।
কিন্তু নিচতলায় এসে দেখতে পান তাদের ছেলে ইয়ামিন শুয়ে আছে একটা স্ট্রেচারে। পা দুটো এলোমেলো আর মাথাটা ডান দিকে কাত হয়ে আছে। বুকের মধ্যে অজস্র গু*লির চিহ্ন। ছেলেকে এ অবস্থায় দেখে বাবা-মা দুজনেই কান্নায় ভেঙে পড়ে।
ডাক্তার তাদেরকে বলে- আপনার ছেলেকে কোন চিকিৎসা করতে পারিনি আমরা। তাকে মৃত অবস্থাতেই আনা হয়েছিল এখানে।
ইয়ামিনের বাবা এবার নিজেকে একটু শক্ত করার চেষ্টা করেন।
তিনি ডাক্তারকে বলেন- যেহেতু মৃত অবস্থাতেই তাকে আনা হয়েছে তাই আমি আমার ছেলেকে নিয়ে যেতে চাই। পোস্টমর্টেম করাতে চাই না।
কিন্তু ডাক্তাররা সেটাতে রাজি হয়না। তারপর ছাত্ররা ইয়ামিনের বাব-মায়ের পক্ষে দাঁড়ালে এবারে আর না করতে পারে না তারা। এরপর ইয়ামিনের লা*শ নিয়ে আসা হয় বাসায়।
ইয়ামিনের বাবার ইচ্ছে ছিল তাকে কুষ্টিয়ায় নিজেদের গ্রামের বাড়িতে কবর দিবে। কিন্তু তার আগেই কুষ্টিয়ার থানা থেকে কল করে বলা হয় লা*শ যেন কুষ্টিয়াতে আনা না হয়। এটা শুনে নিদারুণ কষ্ট পান ইয়ামিনের বাবা।
অতঃপর সাভারেই কবর দেওয়া হয় তাকে। কয়েকদিন পর ইয়ামিনের মা যত্ন করে সেই কবরে একটা ফুলগাছ লাগিয়েছে।
ইয়ামিনের মা কেঁদে কেঁদে বলছিল- এই ফুলগাছের ফুল দেখলে মনে হবে আমাদের ইয়ামিন বেঁচে আছে, আমাদের সাথেই আছে।
দেখতে দেখতে ২ টা বছর পার হয়ে গেছে। কবরের মাটি হালকা হয়েছে, ফুলগাছে ফুল ধরে ঝরেও গেছে অথচ ইয়ামিনের খু*নী পুলিশরা এখনও আরাম আয়েসে দিন কাটাচ্ছে।