01/10/2026
#বিরহ_বৃত্তান্ত
#পর্ব_৩৩
এই কনকনে শীতের মাঝে ঘুম থেকে উঠাটা ভারী যন্ত্রণার। গা থেকে উষ্ণ কম্বল সরিয়ে ঠান্ডা মেঝেতে পা রাখতে মুনের একটু বেশিই কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে তো সে তাই নামতেই চায় না। আরেকটু বেশি ঘুমানোর জন্য তার সেকি আবদার! কিন্তু ওসবে যে তার মায়ের মন গলে না। ঠিক ঠিক তাকে টেনে তুলে বিছানা থেকে। ওয়াশরুমের ওই কুসুম গরম পানি দিয়ে হাত মুখ ধুইয়ে দেয়। তাতেও মেয়ের শীত লাগে, গা কাঁপে।
আজ রবিবার। স্কুল খোলা। অথচ মেয়েটাকে এখনো বিছানা থেকে উঠানো যাচ্ছে না। মেয়ের মা আর না পেরে এবার রেগে বসল। ধমক দিল স্বল্প আওয়াজে, 'তুমি কি উঠবে, মুন? নাকি মা তোমাকে বাড়িতে একা ফেলেই অফিসে চলে যাব?'
মুন চোখ বন্ধ রেখেই ঠোঁট উল্টাল। হাত পা ছুড়ে বোঝাল তার আজ চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে ভারী। তাতে কী, ওসব কষ্টের ধার তার মা ধারে না। মেয়েটার এই স্কুল ফাঁকি দেওয়ার বাহানা হরহামেশাই চলে। মা তাই ওসব আর পোরোয়া করে না আজকাল। মেয়েকে টেনে উঠে বসাল। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,
'তুমি না লক্ষী মেয়ে, আমার প্রিন্সেস, এমন বায়না করলে হয়? স্কুলে না গেলে কত পড়া মিস হয়ে যাবে, তখন তো পরীক্ষায়ও খারাপ করবে। এমন করে না, মা। এই তো কয়টা দিন, বার্ষিক পরীক্ষাটা শেষ হলেই একটা লম্বা ছুটি পেয়ে যাবে।'
'এবার ছুটিতে আমায় কোথায় নিয়ে যাবে, মা?'
'তুমি কোথায় যেতে চাচ্ছ?'
'সী-বিচে।'
'কক্সবাজার?'
'হ্যাঁ। নিয়ে যাবে, বলো?'
একটু সময় নিয়েই মায়ের জবাবটা এল, 'বেশ, যাব।'
মেয়েটা খুশি হয়ে গেল অমনি। হাত তালি দিয়ে খিলখিল করে হাসতে আরম্ভ করল। তার মা তাকে ধরে বলল, 'তবে আমাকেও একটা ওয়াদা দিতে হবে, বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগ অবধি খুব মনোযোগ দিয়ে তোমাকে পড়াশোনাটা করতে হবে। একদম ফাঁকিবাজি করা যাবে না, কেমন?'
মেয়েটা মায়ের গালের সঙ্গে গাল ঘঁষে বলল, 'কোনো ফাঁকিবাজি করব না, মা। তোমার সব কথা শুনব।'
মা খুশি হয়ে মেয়ের গালে চুমু খেয়ে বলল, 'এবার তাহলে দ্রুত তৈরি হও। স্কুলের জন্য নয়তো দেরি হবে।'
মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে নিজের অফিসে চলে গেল মেহেরুন। মুনের স্কুল থেকে তার অফিসটা বেশি দূরে নয়। যাতায়াতে বেশ সুবিধা বলেই তার খাটুনি আজকাল একটু কম হচ্ছে। অফিসে আজ সকালেই একটা মিটিং আছে। সেখানে আবার প্রেজেন্টেশনটা তারই। বিদেশী এক কোম্পানির সাথে তাদের এই ডিলটা। মেহেরুন গত এক সপ্তাহ ধরে এটা নিয়ে দিন রাত খেটেছে। কোনোভাবে ডিলটা কনফার্ম করাতে পারলেই তার প্রমোশোন নিশ্চিত।
'আপনার গায়ে আকাশী রংটা দারুণ মানায়, মিস মেহেরুন। মনে হয় যেন এক টুকরো স্বচ্ছ মেঘ আকাশ থেকে নেমে এসেছে।'
শেষবারের মতো স্লাইটগুলোতে চোখ বুলাচ্ছিল মেহেরুন। কথাটা কানে যেতেই কপালে ভাঁজ পড়ল তার। কন্ঠস্বরটা চেনা বলে আর চোখ তুলল না। ওভাবেই বলল, 'ধন্যবাদ। তবে এই মুহূর্তে আমাকে একটু একা ছেড়ে দিলে আমি বরং বেশি খুশি হব। একটু পরেই আমার মিটিং।'
'আমি জানি আপনি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করবেন। তারপরেও অল দ্য বেস্ট। প্রমোশোনটা পেলেই কিন্তু ট্রিট চাই।'
না চাইতেও মেহেরুন হেসে বলল, 'জি, অবশ্যই।'
লোকটা চলে গেল সেখান থেকে। মেহেরুন বেশ জানে, ওই চোখগুলো কাঁচের দরজা ভেদ করে এখনো তাকেই দেখছে। আপাতত মিটিং এর চিন্তায় মেয়েটা আর ওদিকে মনোযোগ দিল না।
মিটিংটা শেষ হলো। মেহেরুন সত্যিই আজ দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছে। অফিসের বসসহ সবাই আজ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ডিলটাও কনফার্ম ইতোমধ্যে। মেহেরুনের খুশির অন্ত নেই। প্রমোশোনটা পেলে তার মাইনে বাড়বে। মেয়েটার ড্রয়িং এর প্রতি খুব ঝোঁক। প্রমোশোনটা পেলেই তাকে আগে ভালো একটা আর্ট স্কুলে ভর্তি করাবে। এরপর ভাইকেও কিছু হাত খরচ দিবে ভাবছে। আগে নিজের সংসার চালিয়ে মা-বাবাকে দিয়ে তার আর হাতে বাঁচত না কিছু। যদিও ছেলেটা টিউশনি করিয়েই নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলে তাও, বড়ো বোন হিসেবে ওইটুকু করার সাধ্যি তো এখন তারও আছে।
সবাই মেহেরুনকে অভিনন্দন জানাল। অথচ ওই লোকটা বাড়াবাড়ি করল একটু বেশিই। বিশাল একটা ফুলের বুকে এনে ধরল তার সামনে। অফিসের অতগুলো মানুষ, তার কলিগরা সেকি যে মজা নিল তখন। মেহেরুনের খুব মেজাজ খারাপ হলেও বলতে পারল না কিছুই। ভদ্রতা দেখিয়ে মুখে মেকি হাসি ফুটিয়ে গ্রহণ করল তা। ধন্যবাদও জানাল। মেহেরুন খেয়াল করল, লোকটা তার থেকেও বেশি খুশি। এমন ভাব, যেন প্রমোশোনটা সেই পাচ্ছে।
নিজের ডেস্কে ফিরে এল সে। মা-বাবাকে এই খবর জানাল। উনারা খুশি হলেন, দোয়া করলেন। কলটা কেটে দিতেই মেহেরুন দেখল, ওই লোকটা তার ডেস্কের সামনে। ইতস্তত ভঙিতে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। মেহেরুন ফোন রেখে জিজ্ঞেস করল, 'কিছু বলবেন?'
'আগামী শুক্রবার কি আপনি ফ্রি আছেন? আমার মা-বাবা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন?'
হতভম্ব না হয়ে পারল না মেহেরুন। রেগেও গেল বোধহয়। কপালে ভাঁজ পড়ল সঙ্গে সঙ্গেই। খানিকটা তপ্ত গলাতেই বলে উঠল, 'আপনি কি আদতে সজ্ঞানে আছেন, আলভি সাহেব? কী বলছেন এসব? আপনার মা-বাবা আমার সঙ্গে কেন দেখা করবেন?'
'কেন দেখা করবেন সেটা আপনিও খুব ভালো করেই জানেন, মিস মেহেরুন। ইনফেক্ট এই অফিসের সবাই জানে। সবাই বোঝেও, শুধু আপনি বাদে। এত কঠিন কেন হতে হবে বলুন তো? একটু কি নরম হওয়া যায় না? মনটাকে পাথর কেন বানাচ্ছেন? একটা সুযোগ দিন।'
আকুতি প্রকাশ পেল ওই স্বরে। মেহেরুনের মন গলল না। বরং রাগ বাড়ল আরো।
'আপনাকে আর কতবার বললে আপনি বুঝবেন, আলভি সাহেব? আমি বিবাহিতা। আমার একটা ছয় বছরের মেয়ে আছে। আমি আপনার থেকে দুই বছরের বড়ো। তাও, তাও কেন আপনি এসব করে যাচ্ছেন? অফিসের প্রত্যেকটা মানুষ এই বিষয়টা নিয়ে মজা নেয়, হাসি তামাশা করে। ওসব কি আপনার চোখে পড়ে না, আলভি সাহেব?'
'পড়ে। কিন্তু ওসবে আমার কিছু যায় আসে না। আপনার মেয়ে, আপনার বয়স কিংবা আপনার পরিচয় কোনোটাতেই আমার কিছু যায় আসে না, মিস মেহেরুন। আমি শুধু একটাই কথা জানি, আমি আপনাকে ভালোবাসি। এর ঊর্ধ্বে আমি আর কোনোকিছুকে বিশ্বাস করি না।'
'বয়স আপনার কম নয়, আলভি সাহেব। কলেজ পড়ুয়া টিনেজ ছেলেদের মতো কথাবার্তা এই বয়সে মানায় না। আমি এখন আমার জীবনের এমন একটা পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আমি ভালোবাসা মানে বুঝিই আমার মেয়েকে। আমার কাছে ও'ই সব। ওকে ঘিরেই আমার বেঁচে থাকা। এর বাইরে গিয়ে আমার আর কোনোকিছুতেই কোনো আগ্রহ আসে না। আর কখনো আসবেও না। তাই আবারও বলছি, আমার পেছনে সময় নষ্ট না করে ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করুন, সংসার করুন। আমার দোয়া থাকবে।'
মেহেরুন নিজের ফাইলের দিকে মনোযোগ দিল। লোকটা দাঁড়িয়ে থাকল কতক্ষণ। তাকিয়ে রইল মেহেরুনের দিকে। হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল, 'আপনি কি এখনো আপনার আগের স্বামীকে ভুলতে পারেননি, মিস মেহেরুন?
'এখন কিন্তু আপনি অনধিকার চর্চ করে ফেলছেন, আলভি সাহেব। এবার আপনার থেমে যাওয়া উচিত।'
বেশ কর্কশ স্বরেই বলল মেহেরুন। অথচ বিপরীতে লোকটা তখনও নির্লিপ্ত। পকেটে হাত পুরে সাবলীল স্বরে বলল, 'আপনার ব্যাপারে আপাতত আমি থামতে পারছি না। দুঃখিত তার জন্য। মনটার অবস্থা এতটাই বেহাল যে তা আর কোনোভাবেই সামলানো যাচ্ছে না। এবার আপনি দয়া না করলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত। এরপর বাকিটা আপনার উপর।'
এতক্ষণে সে বের হলো। গিয়ে বসল নিজের ডেস্কে। মেহেরুন দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল শক্ত হয়ে। কাজে আর মনোযোগ দিতে পারল না। সেই শুরু থেকেই লোকটা তার পিছে পড়ে আছে। অফিসে তার থেকে এক পোস্ট উপরে তার পজিশন। প্রথম দিকে লোকটা তার ভালো বন্ধু ছিল। মেহেরুন অতকিছু বুঝত না তখন, ওই লোকটাই তাকে হাতে ধরে সব শিখিয়েছে। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মেহেরুন তার সাথে দু একবার বাইরে গিয়ে খেয়েছেও। অথচ এসবের ফাঁকে ওই লোক যে তাকে কবে, কীভাবে পছন্দ করে বসল সেটা সে টের পায়নি। বিষয়ট বুঝতে পেরেছিল সেদিন, যেদিন সে মেহেরুনকে শাড়ির সঙ্গে একটা লাল গোলাপও উপহার দিয়েছিল, এবং ছোট্ট চিরকুটটাতে লিখেছিল, "আপনার সামনে এই ফুলের সৌন্দর্যও ভীষণ ফিকে।"
মেহেরুন এরপর আর দেরি করেনি। পরদিনই অফিসে এসে লোকটাকে সরাসরি বলে বসে, "আমি সিঙ্গেল মাদার, আমার একটা চার বছরের মেয়েও আছে।" শুনে কতক্ষণ নিষ্পলক চেয়ে থাকে সে। বিষয়টা হজম করতে সময় লাগে অনেকক্ষণ। পরে কিছুটা ধাতস্ত হওয়ার পর জিজ্ঞেস করে, 'সেপারেশন নাকি ডিভোর্স?'
'ডিভোর্সটা এখনো পুরোপুরি হয়নি। তবে আলাদা থাকছি।'
এরপরের দুটো দিন লোকটা একটু গম্ভীর হয়ে পড়লেও তিন দিনের মাথায় সে আবার আগের রুপেই ফিরে আসে। মেহেরুনকে সরাসরি গিয়ে জানায় নিজের পছন্দের কথাটা। মেহেরুন বোঝায় তাকে। এই সম্পর্কটা যে কোনোভাবেই সম্ভব না, তা তার মাথাতে গেঁথে দিতে চায়। তবে সে বুঝে না কিছুই। পিছেই পড়ে থাকে। তবে মেয়েটাকে কখনো সেভাবে বিরক্ত করে না। কিংবা তার জন্য মেহেরুনকে অস্বস্তিতে পড়ত হয়নি কখনো। ধীরে ধীরে অফিসের সবার সঙ্গে সঙ্গে মেহেরুনও বুঝতে পারে, লোকটা যে তাকে মন থেকেই পছন্দ করে। বুঝতে পারে, ওটুকুতে প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে। তবে ওসব মেহেরুনের মনে ঠাঁই পায় না একটুও। এখন অবধিও না। অফিসের সবথেকে কাছের কলিগটাও মেহেরুনকে কত বোঝাল, কত কিছু বলল, কিন্তু তাতেও লাভের লাভ হলো না কিছুই। মেহেরুনের ওই কঠিন, ইস্পাতের মতো দৃঢ় মনটা কিছুতেই আর নরম হলো না।
চলবে...
সংগ্রহীত....