14/09/2026
পর্তুগীজরা সর্বপ্রথম বাংলায় আসে ১৫১৭ সালে। তখনও উপমহাদেশে মুঘল শাসন শুরু হয়নি। চট্টগ্রাম ছিলো তখন বাংলার প্রধান বন্দর। তারা বাংলায় বেশ আয়েশী জীবনযাপন করতো।খাবারদাবারেও ছিলো দারুণ শৌখিন। তখন দাসপ্রথার জনপ্রিয়তা ছিলো তুংগে। তাই স্থানীয় অসংখ্য বাঙালিদের ভৃত্য হিসেবে নিয়োগ দেয় তারা।পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশে বসবাসরত আরাকানী ও মগ জনগোষ্ঠীদের নিয়ে গড়ে তুলে জলদস্যু বাহিনী। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মগ জাতিগোষ্ঠী আরব বনিকদের জাহাজে জাহাজি এবং বাবুর্চি হিসেবে কাজ করতো৷ তাই বাংলায় পর্তুগীজদের অন্দরমহলে খানসামা কিংবা বাবুর্চি হিসেবে মগ জনগোষ্ঠী ছিলো অটোচয়েস। এই মগ বাবুর্চিগণ পর্তুগীজদের থেকে খুব দ্রুতই অনেক ইউরোপীয় খাবার তৈরির কৌশল রপ্ত করে।
⭕বাঙালি কুইজিনে পর্তুগীজদের থেকে কোন কোন খাবার ঢুকে?
১/ আম, কমলা, লেবু, আদা,টমেটো, আনারস ইত্যাদি দিয়ে টক মিষ্টি চাটনি বানানো শিখিয়ে গিয়েছিলো পর্তুগীজরা।
২/পর্তুগীজরা বেকারিতে খুবই দক্ষ ছিলো।রুটি, কেক কিংবা বিভিন্ন ধরনের পেস্ট্রিকে ফ্লেভারফুল করে উপস্থাপন করতে এরা অসাধারণ পারদর্শী ছিলো। মগ খানসামারা এগুলো বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করে ফেলে আর ছড়িয়ে দেয় বাংলা কুইজিনে।
৩/ আলু, টমেটো, মরিচ এগুলোর সাথে বাংলাকে পর্তুগীজরাই প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয়।
(নিচে আরো লিস্ট দেয়া হলো যেখানে বিশদ ধারণা পাওয়া যাবে।)
৪/ শুক্তো,পোস্ত, ছেঁচকিতে আলু দেয়া পর্তুগীজ প্রভাবের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
৫/মাছ এবং মাংসের তরকারিতে আলু দেয়া, লাউ চিংড়ির তরকারি কিংবা নারকেলের দুধ দেয়া মালাই কারি,তরকারিতে ঢেঁড়স খাওয়া এসবই পর্তুগীজদের কাছ থেকে শেখা বলে অনেক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
৬/ পর্তুগীজ বেকাররাই আটার বদলে ময়দা দিয়ে ফুলকো লুচি বানানো শিখিয়েছিলো বাঙালিদের।
৭/ লেবুর রস কিংবা টক দই এর সাহায্যে দুধ থেকে ছানা বানানোর পদ্ধতি পর্তুগীজরা শিখিয়েছিলো। আর্য সভ্যতার শুরু থেকেই এটি ট্যাবু হিসেবেই ছিলো, তাই কুলীন হিন্দু পন্ডিতদের বারণ থাকায় ঘোষেরা মিষ্টি বানাতে ছানা ব্যবহার করতে পারতোনা, যা পর্তুগীজরা এসে দূর করে।মজার মজার রসগোল্লা,চমচম,ছানা,সন্দেশ, রসমালাই বাঙালি কুইজিনে আজ এত জনপ্রিয়।
৮/ উপরের পদ্ধতিতে গরুর দুধের মোলায়েম চীজ বানাতো পর্তুগীজরা। এই যেমন Bandel Cheese বানানো শেখানোর কারিগর তারাই।
৯/ ব্রেডক্রাম্ব দিয়ে আলুর চপ কিংবা উপমহাদেশীয় স্টাইলে কাটলেট বানানো জনপ্রিয় করে এই পর্তুগীজদের মগ খানসামাগণ।
১০/ ডিম,বাটার,ক্রিম, কাজু বাদাম, কিসমিস, এলাচ, দারুচিনি, জায়ফল, শুকনো ফল দিয়ে বিশালাকার ক্রিসমাস কেক বানানোর দক্ষতা পর্তুগীজ বেকারদের থেকেই বাঙালিরা পেয়েছিলো।
⭕যেসব ফল এবং সবজি যেগুলো পর্তুগীজদের হাত ধরে বাংলায় এসেছে কিংবা জনপ্রিয় হয়েছে
১/কাজুবাদাম (ব্রাজিলের স্থানীয় এই গাছটিকে ভূমিক্ষয় রোধে ভারতবর্ষের দক্ষিণ উপকূলে লাগানো হয়েছিলো)
২/ আনারস (১৫৯৪ সালে ব্রাজিল থেকে বাংলায় আনা হয়)
৩/ পেঁপে (মধ্য আমেরিকায় জন্ম। ফিলিপিন এবং মালয়েশিয়াতে স্প্যানিশরা নিয়ে আসে আর ওইখান থেকে পর্তুগীজরা ভারতবর্ষে নিয়ে আসে)
৪/ চীনাবাদাম (আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় প্রথম চীনাবাদাম আসে। বাংলা নাম চীনাবাদাম থেকে ধারণা করা হয় চীন কিংবা ম্যানিলা থেকে পর্তুগীজরা আমদানি করে।)
৫/ ম্যাংগোস্টিন ফল (মালাক্কা থেকে আমদানি করা হয়)
৬/ মিষ্টি আলু ( আফ্রিকা বা ব্রাজিল থেকে থেকে আনা হয়)
৭/ আলু ( স্প্যানিশরা ১৫৭০ সালে প্রথম ইউরোপে আনে। ১৭৮০ সালে কোলকাতায় ওয়ারেন হেস্টিংস এর সামনে এক ঝুড়ি আলু উপহার হিসেবে আনা হয়। ১৮৩০ সাল নাগাদ হিমালয়ের পাদদেশের অঞ্চলগুলোতে আলু চাষের বিবরণ পাওয়া যায়।১৮৬০ সাল নাগাদ বাংলায় মূলত জনপ্রিয় হয়ে উঠে এই আলু।)
৮/ টমেটো ( মেক্সিকো বা পেরুতে আবিষ্কৃত এই টমেটো ইংল্যান্ডের ভায়া হয়ে ১৮৫০ সালের দিকে ভারতবর্ষে আসে। তবে কারো কারো মতে টমেটো তারও আগে ১৬০০ সালের দিকে আসে কিন্তু সবজি হিসেবে তখন খাওয়া হতোনা)
৯/ মরিচ (মধ্য আমেরিকান আর এজটেকদের একান্ত নিজস্ব এই মরিচ ইউরোপকে প্রথম চেনান কলম্বাস। এরপর পর্তুগীজরা প্রথম ভারতবর্ষে নিয়ে আসে)
১০/ আতা ফল (দক্ষিণ আমেরিকান এই ফলটি ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে কেপ অব গুড হোপ বা ফিলিপিন হয়ে ভারতবর্ষে পর্তুগীজদের হাত ধরে ঢুকে)
১১/ তামাক (১৬০০ শতকে দক্ষিণ ভারতে প্রথম আনা হয়)
১২/ পেয়ারা ( পেরুর এই ফলটি ১৫৫০ সালে পর্তুগীজরা নিয়ে আসে)
১৩/ ভুট্টা ( ১৭ শ শতকে পর্তুগীজরা প্রথম ভারতবর্ষে নিয়ে আসে)
১৪/ লিচু (চীনের স্থানীয় এই ফলটিকে ১৭শ শতকে বাংলার সাথে পর্তুগীজরা পরিচয় করিয়ে দেয়)
১৫/ চিকু বা সফেদা ফল ( এজটেকদের এই ফল মোজাম্বিক থেকে গোয়াতে আমদানি করা হয়৷ কোনো কোনো সূত্রমতে ফিলিপিন থেকে মালয়েশিয়া এবং মালয়শিয়া থেকে ভারতবর্ষের পূর্ব উপকূলে আনা হয়)
১৬/ ঢেঁড়স ( আফ্রিকা থেকে আরব বণিকদের হাত ধরে ভারতবর্ষে প্রথম এটি এলেও পর্তুগীজরা প্রচুর পরিমাণে বাণিজ্যিকভাবে আমদানি করে সবজি হিসেবে খাওয়ার জন্য জনপ্রিয় করে তোলে।
⭕পুনশ্চঃ তথ্যসূত্র কমেন্টে দেয়া হলো।