25/05/2026
আজ তারবিয়াহর দিন
আজ ৮ই জিলহজ্জ সৌদি আরবের চাঁদ অনুযায়ী ।
হাজিরা এখন মিনার পথে রওনা হচ্ছেন।
কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে —
এই দিনটাকে কেন "তারবিয়াহর দিন" বলা হয়? এই দিনটা কি শুধুই হাজিদের জন্য? ঘরে বসে থাকা আমাদের জন্য এই দিনে করার কিছু আছে?
কারণ তারবিয়াহর দিন শুধু একটা তারিখ না। এই দিনটার পেছনে আছে ইতিহাস, আছে নাম রাখার গল্প, আছে আমাদের জন্যও বিশেষ সুযোগ।
আজকের পোস্টে আমরা সেই ৪টি কথার দিকে তাকাবো — যা অনেকেই জানেন না।
তারবিয়াহর দিন সম্পর্কে সংক্ষেপে
৮ই জিলহজ্জকে "ইয়াওমুত তারবিয়াহ" বলা হয়।
হজের মূল কার্যক্রম এই দিন থেকেই শুরু।
হাজিরা এই দিন মক্কা থেকে মিনায় যান। সেখানে রাত কাটান। তারপর ৯ই জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর আরাফাহর দিকে রওনা হন।
কিন্তু এই দিনটার ৪টা কথা আছে, যা অনেকেই জানেন না।
কথা ১: "তারবিয়াহ" নামের পেছনে একটা অসাধারণ গল্প আছে
"তারবিয়াহ" শব্দটা আরবি।
এর অর্থ নিয়ে দুটো ব্যাখ্যা আছে।
প্রথম ব্যাখ্যা — এই শব্দ এসেছে "রাওয়া" থেকে, যার অর্থ পানি পান করানো। প্রাচীনকালে হাজিরা এই দিনে মিনার দীর্ঘ পথের জন্য পানি সংগ্রহ করতেন। তাই এই দিনকে "পানির দিন" বলা হতো।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা আরও গভীর।
ইব্রাহিম (আ.) ঠিক এই রাতে স্বপ্নে দেখলেন — তিনি তাঁর পুত্রকে কুরবানি দিচ্ছেন।
সকালে উঠে তিনি গভীরভাবে ভাবলেন — এটা কি আল্লাহর পক্ষ থেকে, নাকি শয়তানের ওয়াসওয়াসা?
আরবিতে এই গভীরভাবে চিন্তা করাকে "তারাওয়ায়া" বলে।
সেই চিন্তার দিন থেকেই এই দিনের নাম হয়েছে তারবিয়াহ।
এই কথার শিক্ষা কী?
এটা শেখায় — বড় সিদ্ধান্তের আগে গভীরভাবে ভাবতে হয়।
ইব্রাহিম (আ.) তাড়াহুড়া করেননি। থেমেছিলেন। ভেবেছিলেন। নিশ্চিত হয়েছিলেন। তারপর এগিয়েছিলেন।
আজ আমরা অনেক সিদ্ধান্ত আবেগে নিই, ভেবে নিই না।
তারবিয়াহর দিন মনে করিয়ে দেয় — থামো। ভাবো। নিশ্চিত হও। তারপর আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও।
কথা ২: মিনা শুধু তাঁবুর শহর নয়
হাজিরা এই দিন মিনায় যান।
মিনা হলো মক্কার কাছে একটি উপত্যকা। হজের সময় সেখানে লক্ষ লক্ষ সাদা তাঁবু।
কিন্তু মিনার গুরুত্ব শুধু তাঁবুর জন্য নয়।
এখানেই ইব্রাহিম (আ.) ইসমাঈল (আ.)-কে কুরবানি দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এখানেই শয়তান তিনবার তাঁকে বিভ্রান্ত করতে এসেছিল। এখানেই তিনি শয়তানকে পাথর মেরে তাড়িয়েছিলেন।
সেই স্মৃতিতেই আজও মিনায় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
নবীজি ﷺ নিজেও এই দিন মিনায় এসেছিলেন এবং এখানে রাত কাটিয়েছিলেন।
এই কথার শিক্ষা কী?
এটা শেখায় — কিছু কিছু জায়গায় শুধু শরীর নয়, আত্মাও যায়।
যে হাজি মিনায় যান, তিনি শুধু একটি তাঁবুতে ওঠেন না। তিনি যুক্ত হন ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের ইতিহাসের সাথে।
আমাদের জন্য শিক্ষা — ইতিহাসকে শুধু পড়বেন না, অনুভব করুন। কুরবানির গল্প পড়ার সময় নিজেকে জিজ্ঞেস করুন — আমি কি আল্লাহর জন্য কিছু ছেড়ে দিতে প্রস্তুত?
কথা ৩: মিনার রাত আসলে আরাফাহর প্রস্তুতি
হাজিরা আরাফাহর আগের রাতটা মিনায় কাটান।
এটা সুন্নাত।
কিন্তু কেন?
কারণ আরাফাহর দিনটা এত বড়, এত মহান, যে তার আগে একটু থামা দরকার। প্রস্তুত হওয়া দরকার। মনকে গুছিয়ে নেওয়া দরকার।
মিনার রাত হলো আরাফাহর আত্মিক প্রস্তুতির রাত।
এই কথার শিক্ষা কী?
এটা শেখায় — বড় মুহূর্তের আগে প্রস্তুতি নেওয়াটাও ইবাদতের অংশ।
আমরা অনেক সময় আরাফাহর রোজা রাখি, কিন্তু আগের রাতে কোনো প্রস্তুতি নেই। কোনো তাওবা নেই। কোনো দোয়া নেই।
আজ রাতটা একটু আলাদাভাবে কাটান। এটাই আপনার মিনার রাত।
কথা ৪: ঘরে বসে থাকাদের জন্যও এই দিনটা বিশেষ
এই কথাটা অনেকেই জানেন না।
তারবিয়াহর দিনটা শুধু হাজিদের নয়।
এই দিনটা জিলহজ্জের সেই বরকতময় দশ দিনের একটি। নবীজি ﷺ বলেছেন — আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মহান দিনগুলো হলো জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন।
(সহীহ বুখারি: ৯৬৯)
৮ই জিলহজ্জও সেই দশ দিনের একটি।
ঘরে বসেও আজ করুন — রোজা, তাকবির, তাওবা, বেশি বেশি দোয়া।
এই কথার শিক্ষা কী?
এটা শেখায় — ইবাদতের সুযোগ সবার জন্য সমান।
আল্লাহ কাবার কাছে থাকা মানুষকে বেশি ভালোবাসেন না। তিনি ভালোবাসেন তাকওয়াওয়ালা বান্দাকে।
যে ঢাকায় বসে আজ রাতে তাওবা করে কাঁদে, আল্লাহ তার দিকেও তাকান।
তারবিয়াহর দিন আসলে আমাদের কী শেখায়?
এই ৪টা কথা আলাদা আলাদা হলেও, এগুলো একটাই বার্তা দেয়।
নামের গল্প শেখায় — বড় সিদ্ধান্তের আগে থামো, ভাবো।
মিনার গুরুত্ব শেখায় — ইতিহাসকে শুধু পড়ো না, অনুভব করো।
মিনার রাতের শিক্ষা বলে — বড় মুহূর্তের আগে প্রস্তুত হও।
ঘরে থাকাদের বার্তা বলে — আল্লাহর রহমত সবার জন্য।
আজ রাতে কী করবেন?
ঘুমানোর আগে একটু থামুন।
কাল আরাফাহ। বছরের সেরা দিন।
আজ রাতে একটু তাওবা করুন। একটু দোয়া করুন। একটু কুরআন পড়ুন।
নিজেকে প্রশ্ন করুন —
আমার মনে কি কোনো পুরনো গুনাহের বোঝা আছে, যা আজ রাতে আল্লাহর কাছে রেখে দিতে চাই? আমি কি আরাফাহর রোজার নিয়ত করেছি? আমি কি আগামীকালের জন্য সত্যিকারভাবে প্রস্তুত?
যখন এভাবে আজ রাতটা কাটাবেন, তখন তারবিয়াহর দিনটা শুধু একটা তারিখ থাকবে না — আরাফাহর দিকে আত্মিক যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ হয়ে যাবে।
হৃদয়ে রাখার মতো কথা
হাজিরা আজ মিনার পথে।
আমরা ঘরে।
কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে আমরা দূরে নই।
ইব্রাহিম (আ.) যেমন থেমে ভেবেছিলেন, আমরাও আজ রাতে একটু থামি।
নিজেকে জিজ্ঞেস করি — আমার জীবনে আমি কি আল্লাহর জন্য কিছু ছেড়ে দিতে প্রস্তুত?
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তারবিয়াহর এই রাতটা সঠিকভাবে কাজে লাগানোর, আরাফাহর জন্য আত্মিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার, এবং তাঁর কাছে ফিরে আসার তাওফিক দিন। আমিন।
রেফারেন্স:
— সহীহ বুখারি: ৯৬৯
— ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনা
— ফাতহুল বারি, ইবনে হাজার আসকালানি: কিতাবুল হজ
— লিসানুল আরব: তারবিয়াহ অর্থ প্রসঙ্গ
©©