14/08/2026
প্রথম দিন, সেদিন আমরা মক্কা পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভোর ৪ টা বেজে যায়। জেদ্দা থেকে মক্কা; হোটেল রুমে গিয়ে ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। কোনো রকম খাবার খেয়ে ঘুম থেকে উঠি ৮ টায়।
মোয়াল্লেম আংকেল কে মেসেজ দেই আংকেল আপনি কই? আমার রুমে একা একা ভালো লাগছে না। আমরা কখন যাবো?
এতো বড় জার্নির পর বায়তুল্লাহ দেখার জন্য মন টা অস্থির হয়ে গিয়েছিল।
একটু পর আমার ভাই ফোন দিয়ে বলে তুই রেডি হয়ে নিচে নাম। আমরা কিছু খাই। আংকেল একটু পর উমরাহ করাবেন। নিচে নামার সাথে সাথে দেখি এই অরেঞ্জ ক্যাট টা শুয়ে আছে। কতক্ষণ ওর সাথে খেলে পাশের একটা কফি শপ থেকে চা আর স্যান্ডউইচ কিনে খাই।
এরপর আংকেল এসে বলেনঃ চলো আমরা আগাই।
সেইদিন যতো কাছে যাচ্ছিলাম মনে হচ্ছিলো বুক ধড়ফড় করতে করতে কলিজা টা ফেটে যাবে। কেমন যে সেই অনুভূতি!! মনে হচ্ছিলো এমন কারো সাথে দেখা হবে, যাকে দেখার জন্য মন প্রাণ ছুটে গেছে, এত অস্থির আর আকুলতা
সারাজীবন টিভিতে দেখেছি কাবা। আজকে দেখবো একদম সামনাসামনি।
হেঁটে এগিয়ে যেতে দেখি প্রথমে WC6 . আংকেল বললেন কখনো দেখা করার দরকার হলে এইটার সামনে এসে দাঁড়াবে। জায়গাটা ভিড় কম থাকে, হারাবে না।
একটু একটু করে এগোতে এগোতে দেখি 79 নাম্বার লেখাটা দেখা যাচ্ছে। বুক মনে হচ্ছে ফেটে যাবে চিন্তায়!!
ভিতরে একটু এগিয়েই দেখি কাবার কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। আমার দুই চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে, মনে হচ্ছে একদম সামনে দাঁড়িয়ে কি বলব!!
এরই মধ্যে স্যান্ডেল চেঞ্জ করে ওখানে থেকে প্যাকেট নিয়ে স্যান্ডেল ব্যাগে দিয়ে যখন একদম ভিতরে ঢুকে যাই মাতাফ এর দিকে তখন আংকেল ইন্সট্রাকশন দিচ্ছিলেন এমন এমন করবে। আমি কাবা পুরোটা সামনে দেখে শুধু কান্না করতে লাগলাম। কোনো কিছুই যেন মনে রাখতে পারছি না, কানেও ঢুকছে না কিছু। আমি এক দৃষ্টিতে কাবার দিকে তাকিয়ে আছি।
পড়ে আবারও আমার ভাইকে বললাম কি করবো আমি তো কিছু মনে রাখতে পারছি না। তখন আংকেল বললেন, তুমি এত চিন্তা করো না। আসো আমরা তাওয়াফ শুরু করি। আমাকে শুধু হারিয়ে ফেলো না এখানে।
এত্ত রোদ, রোদে মনে হচ্ছে চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাওয়াফ শুরু করার পর আমার কি হলো আমি একবার কান্না করে দুআ করছি, একবার কাবার দিকে তাকিয়ে হেসে দিচ্ছি, যে কীভাবে আমি আসলাম এইখানে। একবার আকাশের দিকে তাকাই যে হয়ত আল্লাহ আমার এই পাগলামি গুলো দেখছেন, যে একবার হাসছি, একবার কাদছি।
আমার যত দুআ ছিল, আমি সব ফোনের Google Notes এ রেখেছিলাম। যেন কোনোভাবেই না হারায়। তাওয়াফ করতে করতে দুআ গুলো করছিলাম। এতো তীব্র রোদ, কিন্তু মনে হচ্ছে সেই ঝলমলে রোদে কাবা ঝকঝক করছে।
এই সময় কত মানুষ আমাকে ধাক্কা দিয়েছে, আমিও ধাক্কা দিয়েছি যেন আংকেল কে হারিয়ে না ফেলি। তখন বার বার মনে হয়েছে আহারে প্রথম উমরাহ, সবাই চান যেন কোনো ভাবেই কিছু ছুটে না যায়।
তাওয়াফ ও সাই শেষ করে আমরা দুই রাকাত নামায পড়ে এরপর হোটেলে ফিরে যাই। ঐদিন আংকেল আমাকে বলেন, তোমার জন্য মাতাফ সব সময় খোলা। তুমি যখন ইচ্ছা তাওয়াফ করতে পারবে। আমরা ইহরাম খুললে আর মাতাফ এ আসতে পারব না।
আমি যতবার পেরেছি, যত কষ্ট হোক না কেন আমি বার বার নফল তাওয়াফ করেছি। শুরু করাটাই কষ্ট, একবার গায়ের জোর দিয়ে শুরু করলে আর কষ্ট হয় না।
উমরাহ এর দিনই মাকামে ইব্রাহিম এর ভিতরেও দেখতে পারি। যদিও অনেক ভিড় ছিল, তবে দেখতে পেরেছি।
বায়তুল্লাহ - আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ একটা স্মৃতি। আজ প্রায় ৯ মাস হয়ে গেছে ওখানে থেকে এসেছি। কিন্তু মনে হয় আজও আমি ওদিক গুলো দিয়ে ঘুরি, হাটি। সেই তপ্ত রোদ অনুভব করি, গুনগুন আওয়াজ আর বাখুরের মিস্টি ঘ্রাণ নাকে আসে, ঠান্ডা মাতাফ এর স্পর্শ পায়ে লাগে। নামাজ শেষ এ সবার King Fahd গেট দিয়ে বের হওয়া। সব সব মনে পড়তে থাকে।
আবারও রব যেন দ্রুত তাওফিক দান করেন। আমিন
অন্তরা
১৪ আগষ্ট, ২০২৬