13/04/2025
গবাদিপশুর ক্ষুরারোগের কারণ,প্রতিকার,চিকিৎসা এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব :
---------------------------------------------------------------------
গবাদিপশুর ক্ষুরারোগ একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি পশুর মুখ ও পায়ের ক্ষুরে ফোসকা ও ঘা সৃষ্টি করে। এই রোগের কারণ, প্রতিকার ও চিকিৎসা নিচে আলোচনা করা হলো:
ক্ষুরারোগ কি কারণে হয়
------------------------------------
ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ (FMD) ভাইরাসের কারণে এই রোগ হয়। এই ভাইরাস RNA ভাইরাস শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
ক্ষুরারোগের ভাইরাস ও, এ, এশিয়া ১ এই ৩ টি স্ট্রেইন দিয়ে বাংলাদেশে মূলত ক্ষুরারোগ হয়ে থাকে। তবে সারা পৃথিবীতে মোট ৭টি স্ট্রেইন দিয়ে ক্ষুরারোগ হয় , ৭টি স্ট্রেইন ও, এ এবং এশিয়া ১, সি, স্যাট ১,২,৩ নামে পরিচিত।
সংক্রমণ:
--------------
১. আক্রান্ত পশুর লালা, মুখের ক্ষত থেকে বের হওয়া রস, মলমূত্র, দুধ এবং ব্যবহার করা জিনিসপত্রের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়।
২. বাতাসের মাধ্যমেও ভাইরাস ৬০-৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়াতে পারে।
৩. হাট-বাজার থেকে গবাদিপশুর মাধ্যমে এক পশু থেকে অন্য পশুতে সংক্রমণ হতে পারে।
৪. আক্রান্ত পশুর পরিচর্যাকারীর মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে।
প্রতিকার (প্রতিরোধ):
--------------------------------
১.টিকা: সুস্থ গবাদিপশুকে বছরে দুবার ক্ষুরারোগের প্রতিষেধক টিকা দেওয়া জরুরি। স্থানীয় উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে এই টিকা পাওয়া যায়।
২. আলাদা রাখা: আক্রান্ত পশুকে সুস্থ পশু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা স্থানে রাখতে হবে।
৩. পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা:
৪. গোয়ালঘর এবং অসুস্থ পশুর ব্যবহার করা জিনিসপত্র ১-২% কস্টিক সোডা বা ৪% সোডিয়াম কার্বোনেটের দ্রবণ দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
৫. আক্রান্ত পশুকে শুকনো জায়গায় রাখতে হবে, কোনো অবস্থাতেই কাদা বা পানিতে রাখা যাবে না।
৬. মৃত পশুর সৎকার: ক্ষুরারোগে মারা যাওয়া পশুকে ৪-৫ ফুট মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে, খোলা জায়গায় ফেলে রাখা উচিত নয়।
৭. জীবানুমুক্তকরণ: খামারে প্রবেশের আগে ও পরে হাত ও পায়ের জুতা জীবানুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। নতুন পশু আনার আগে কিছু দিন আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
চিকিৎসা:
--------------
ক্ষুরারোগ একটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় এর কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে লক্ষণ অনুযায়ী উপশমমূলক চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে:
১. আলাদা রাখা: রোগাক্রান্ত পশুকে সুস্থ পশুদের থেকে আলাদা করে একটি পরিষ্কার ও শুকনো জায়গায় রাখতে হবে।
২.ক্ষতস্থান পরিষ্কার:
* পায়ের ও মুখের ক্ষত পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (KMnO₄) বা আইওসান মিশ্রিত পানি দিয়ে দিনে ২-৩ বার ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
*. ফিটকিরির পানি (১০ গ্রাম/২ চামচ ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে) দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা যেতে পারে।
*. পায়ের ক্ষতের জন্য খাওয়ার সোডা (৪০ গ্রাম ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে) ব্যবহার করে পরিষ্কার করে সালফানাসাইড পাউডার লাগানো যেতে পারে।
*. এছাড়া এফএমডি কিউর বা এই ধরনের ঔষধ দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা যায়।
ওষুধ:
-------
* ক্ষতের সংক্রমণ কমাতে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সালফানাসাইড বা টেট্রাসাইক্লিন অথবা উভয় ওষুধ ৫-৭ দিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
* মাছি তাড়ানোর জন্য ক্ষতস্থানে সালফানাসাইড পাউডার ও নিগুভন পাউডার নারিকেল তেল বা ভ্যাসলিনের সাথে মিশিয়ে লাগানো যেতে পারে।
সহায়ক চিকিৎসা:
--------------------------
* মুখে ঘা এর কারণে পশু খাবার খেতে না পারলে দুর্বলতা কমাতে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্যালাইন (৫% গ্লুকোজ+০.৯% সোডিয়াম ক্লোরাইড) দেওয়া যেতে পারে।
* ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স ইনজেকশন দেওয়া যেতে পারে।
* নরম খাবার: আক্রান্ত পশুকে নরম ও সহজে হজমযোগ্য খাবার দিতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, ক্ষুরারোগের লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা করা উচিত।
এই রোগের অর্থনৈতিক গুরুত্ব:
-------------------------------------------
গবাদিপশুর ক্ষুরারোগের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ এই রোগে খামারিদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। যেমন--
১. দুধ উৎপাদনে হ্রাস:
আক্রান্ত পশুরা সাধারণত খেতে পারে না বা কম খায়, ফলে দুধের উৎপাদন ৫০%-৭০% পর্যন্ত কমে যায়।
রোগ সেরে গেলেও অনেক সময় দুধ উৎপাদন আগের মাত্রায় ফিরে আসে না।
২. প্রজনন ব্যর্থতা:
জ্বর ও দুর্বলতার কারণে গাভী গরমে আসে না বা গর্ভপাতের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
বকনা ও ষাড় গরুর উৎপাদনশীলতা কমে যায়।
৩. বাজারমূল্য হ্রাস:
আক্রান্ত পশুর বাজারদর অনেক কমে যায়।
রফতানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আসে, বিশেষ করে মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য।
৪. চিকিৎসা ও প্রতিরোধের খরচ:
রোগ প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত টিকা ও জীবাণুনাশক ব্যবহারের খরচ।
আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা, আলাদা রাখার ব্যবস্থা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার খরচ।
৫. মৃত্যু
যদিও মৃত্যুহার তুলনামূলক কম (সাধারণত ৫%-১০%), তবে বাছুরদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি।
দুর্বল পশু বা গর্ভবতী পশুর ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ে।
৬. শ্রম ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস:
খামারের কাজের গতি কমে যায়।
পশুর যত্ন ও চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত শ্রম ব্যয় হয়।
৭. জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব:
দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে গেলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পশুপালন নির্ভর মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যায়।
ক্ষুরারোগ শুধু পশুদের শারীরিক ক্ষতি করে না, খামারির আর্থিক ক্ষতির কারণ হয় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও সচেতনতা বাড়ালে এই ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।