16/04/2025
একজন প্রবাসী ভাই যখন দীর্ঘ ১০-১৫ বছর বিদেশে কষ্ট করে টাকা জমিয়ে দেশে ফেরেন, তখন তাঁর স্বপ্ন থাকে—নিজের একটা খামার হবে। হয়তো দু-চারটা ষাঁড় কিনে ফ্যাটেনিং করে বিক্রি করবেন, কিংবা এক-দুটা গাভী কিনে দুধ ও বাচ্চা বিক্রি করে সংসার চালাবেন। কিন্তু দেশে ফিরে প্রথম ধাক্কাটা খায় গরু কেনার সময়, দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ফাঁদে পড়ে।
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, দেশে এখন প্রায় ৭ লাখ নিবন্ধিত খামারি আছেন। কিন্তু বাজারে কেনাবেচার ৬০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে অদৃশ্য দালালচক্র। এদের সাথে লেনদেন না করলে ভালো গরু, ভালো দামে পাওয়াই কঠিন।
প্রথম প্রতারণা হয় গরু ফ্যাটেনিং শুরু করার সময়।
ধরুন একজন প্রবাসী ৮০,০০০ টাকায় কেনার মতো গরু ৯৫,০০০ টাকায় কিনলেন, দালালের কথা শুনে। অথচ গরু ফ্যাটেনিং-এ গড় লাভ থাকে ৮-১০ হাজার টাকা, যা দামের অতিরিক্ত অংশ দিয়ে শুরুতেই শেষ হয়ে যায়। এরপর বাজারে বিক্রি করতে গেলে আবার দালালকে কমিশন দিতে হয়, ফলে লোকসান নিশ্চিত।
দ্বিতীয় প্রতারণা হয় গাভী কেনার সময়।
বাজারে কেউ বলেন গাভী ১৫-২০ লিটার দুধ দেয়, কিন্তু বাস্তবে ৩-৫ লিটার। অথচ এই পার্থক্যের কারণে দামেও বিশাল ফারাক।
১৫ লিটার দুধদাতা গাভীর দাম: প্রায় ২.৫-২.৮ লাখ টাকা
৪-৫ লিটার দুধদাতা গাভীর দাম: ১.৩-১.৫ লাখ টাকা
এখানে একজন প্রবাসী নতুন উদ্যোক্তার লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হয়ে যায়—শুধু ভুল তথ্যের কারণে।
জনকণ্ঠ, কালের কণ্ঠ, প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসারে, প্রতি বছর কোরবানির গরুর বাজারে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়, যার মধ্যে বিশাল অংশ দালালদের মাধ্যমে হয়। অথচ এই বিশাল অর্থনীতির উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বা পর্যবেক্ষণ কার্যত নেই।
একটা আশ্চর্য তথ্য:
২০২৪ সালে বিআইডিএস (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ)-এর একটি জরিপে উঠে এসেছে, প্রবাসীদের মধ্যে নতুন খামারিদের ৭২%-ই প্রথম বছরে লোকসানের মুখে পড়েন, যার অন্যতম কারণ ছিল গরুর দাম সংক্রান্ত ভুল তথ্য ও দালাল নির্ভরতা।
অন্যদিকে গ্রামের প্রকৃত খামারিরা—যারা ছোট পরিসরে নিজের হাতে গরু পালন করেন—তারা দামে প্রতারণা করেন না। কারণ তারা বিশ্বাস করেন, “অন্যের হক মেরে আমার লাভ হলে, সেটা একদিন না একদিন ফিরেও আসবে।”
কিন্তু সমস্যাটা দুই দিকেই—
প্রবাসীরা জানেন না কোথায় প্রকৃত খামারির খোঁজ পাবেন
আর খামারিরা জানেন না কীভাবে নিজের গরু প্রচার করবেন, কারণ ডিজিটাল মার্কেটিং ব্যয়বহুল
এখানেই দরকার একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
যেখানে থাকবে:
গরুর ওজন, জাত, বয়স, দুধ উৎপাদন, গর্ভধারণ সংখ্যা—সব তথ্যসহ প্রোফাইল
প্রতিটি গরুর ভিডিও, মেডিকেল রিপোর্ট
খামারির পরিচয় যাচাই
সরাসরি কেনা-বেচার ব্যবস্থা, কোনো দালাল ছাড়া
এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম (যেমন: PosurHut.com) শুধু দালালের ফাঁদ থেকে রক্ষা করবে না, বরং
প্রবাসীদের বিনিয়োগকে করবে সুরক্ষিত
খামারিদের দেবে ন্যায্য মূল্য ও পরিচিতি
সরকারের জন্য তৈরি করবে ট্যাক্সের স্বচ্ছ উৎস
মোট খামার খাতকে আনবে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণে
এই বাজারের ওপর যদি সঠিক নজরদারি এবং ডিজিটালীকরণ হয়, সরকার প্রতি বছর ৫০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার ট্যাক্স তুলতে পারবে খুব সহজেই।
সময় এসেছে—
দালাল-নির্ভর গরুর বাজারকে বিদায় জানিয়ে
তথ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ, এবং ন্যায়নিষ্ঠ একটি খামার অর্থনীতি গড়ে তোলার।