23/06/2026
কেন মানুষ বারবার হজে যেতে চায়?
হজের আগে আমি একটা বিষয় কখনো বুঝতাম না।
কেন মানুষ বারবার হজে যেতে চায়?
কেন কেউ ফরজ হজ আদায় করার পরও আবার সেই সফরের জন্য অপেক্ষা করে?
মনে হতো, পৃথিবীতে তো আরও অনেক ভালো কাজ আছে। সেই অর্থ দিয়ে গরিবের সাহায্য করা যায়, মানুষের কর্মসংস্থান করা যায়, সমাজের জন্য অনেক কিছু করা যায়।
কিন্তু হজ থেকে ফিরে এসে আমি বুঝেছি—যে প্রশ্নটা আমি একসময় করতাম, আজ আমি নিজেই সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে গেছি।
হজের সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়তো আরাফাতের রোদ নয়।
মিনার ভিড় নয়।
মুজদালিফার খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানোও নয়।
হজের সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো—
˹ ফিরে আসা ˺
বিমান যখন নিজের দেশের মাটিতে নামে, মানুষ ভাবে হজের সফর শেষ হয়েছে।
বাস্তবে তখনই শুরু হয় আরেকটি সফর—
˹ হৃদয়ের সফর ˺
যেখানে মানুষ বুঝতে শুরু করে—
সে কিছু একটা রেখে এসেছে।
কিন্তু কী রেখে এসেছে, সেটা ভাষায় বলতে পারে না।
অনেক হাজীকে বলতে শুনেছি—
“মনে হয় কিছু একটা নেই।”
“খালি খালি লাগে।”
“কেন জানি ভাবতেই কান্না চলে আসে।”
“মনে হয় মনটা এখনও মক্কাতেই রয়ে গেছে।”
আমিও সেই অনুভূতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি।
সলাতে দাঁড়ালে হঠাৎ মনে পড়ে যায় হারাম মাসজিদের জামাত।
কোনো ছবিতে বা ভিডিও তে কাবা দেখলে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
আযানের শব্দ শুনে মনে হয় আমি যেন আবার মাসজিদুল হারামের দিকে হাঁটছি।
কখনো মনে হয়, মাকামে ইব্রাহিমের পিছনেই দাঁড়িয়ে আছি।
কখনো মনে হয়, মদিনার কোনো রাস্তায় হাঁটছি।
তারপর বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়—
আমি দেশে ফিরে এসেছি।
তখন বুঝলাম, আমি শুধু একটি শহর ছেড়ে আসিনি।
আমি এমন একটি পরিবেশ ছেড়ে এসেছি, যেখানে দিনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বায়তুল্লাহ।
যেখানে প্রতিটি রাস্তা মানুষকে মাসজিদের দিকে নিয়ে যায়।
যেখানে হাজারো মানুষ একসাথে দোয়ায় কাঁদতে পারে।
যেখানে পৃথিবীর নানা ভাষা, নানা বর্ণ, নানা দেশের মানুষ একই রবের সামনে মাথা নত করে।
যেখানে লক্ষ মানুষের চলাচলের কোলাহল থেমে যায় ইকামতের এক তাকবিরে।
হজ আমাকে শিখিয়েছে—
কিছু সৌন্দর্য আছে, যা বারবার দেখলেও পুরোনো হয় না।
বরং যত কাছে যাওয়া যায়, ততই নতুন লাগে।
কাবা তেমনই এক সৌন্দর্য।
মদিনা তেমনই এক ভালোবাসা।
যে সত্যিকার অর্থে আল্লাহর নিদর্শনগুলোকে ভালোবেসেছে, তার কাছে প্রতিটি তাওয়াফ নতুন, প্রতিটি সালাম নতুন, প্রতিটি দৃষ্টি নতুন।
তখন আমি আরেকটি বিষয় বুঝলাম।
মানুষ কাবা ঘরকে মিস করে না শুধু।
মানুষ মিস করে সেই মানুষটিকে, যে মানুষটি সে কাবার সামনে গিয়ে হয়েছিল।
আরাফাতে যে মানুষটি চোখের পানি ফেলেছিল।
মুজদালিফায় যে মানুষটি আকাশের নিচে শুয়ে ছিল।
মদিনায় যে মানুষটি রাসূল ﷺ-এর উম্মত হওয়ার সৌভাগ্যে কেঁদেছিল।
সে মানুষটিকে আবার ফিরে পেতে চায়।
হজ থেকে ফিরে আসার পর সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল —
আমরা কাবা ছেড়ে আসি, কিন্তু কাবার মালিককে ছেড়ে আসি না।
মদিনা থেকে বিদায় নেওয়া যায়, কিন্তু রাসূল ﷺ-এর শিক্ষা থেকে বিদায় নেওয়া যায় না।
ইহরাম খুলে ফেলা যায়, কিন্তু আত্মসমর্পণের চেতনাকে খুলে ফেলা যায় না।
হয়তো এ কারণেই ফিরে আসার পরও হৃদয় বারবার বলে ওঠে—
“হে আল্লাহ!
আর একবার… দুইবার নয়…
বারবার…
আপনার ঘরের মেহমান হওয়ার তাওফিক দিন।”
আর তখন আমরা বুঝি—
আমরা শুধু হজ করে ফিরিনি।
আমাদের হৃদয়ের একটি অংশ এখনও মক্কা-মদিনায় রয়ে গেছে।