গত বছর দুর্গাপূজোর আগে মা আর ছেলেকে নিয়ে দেবযানী আর মৌমিতা গিয়েছিলো শপিং করতে।শপিং সেরে বাড়ি ফিরতে রাত সাড়ে ন’টা বেজে গেলো। তখন আর রান্না করার ক্ষমতা নেই কারো। এদিকে খিদের চোটে সকলেরই তখন বেহাল অবস্থা। ভরসা সেই একমাত্র অনলাইন রেস্টুরেন্ট। সেইমতোন চটজলদি কাছেরই একটা রেস্টুরেন্ট থেকে হাল্কা বাঙালী খাবার অর্ডার করা হলো।
কিন্তু খাবার টেবিলে বসে বোঝা গেল হাল্কা বাঙালী খাবারের যে কল্পনা করা হয়েছিলো
আদপে তা মোটেই নয়। বাঙালী রেস্টুরেন্ট থেকে এসেছে তেল মশলাদার গরগরে রিচ্ সমস্ত খাবার। খিদের চোটে পেটে তো কিছু দিতেই হবে, কিন্তু মন তৃপ্ত একেবারেই হলোনা। বাঙালী খাবারের নামে যদি এমন তেলেঝালে ভরা খাবার খেতে হয় তবে তো শরীর দুদিনেই বারোটা বাজবে। তাছাড়া যারা প্রতিদিন হোম ডেলিভেরী নেন তাদের শরীর কি প্রতিদিন এতো তেল মশলা নিতে পারবে ? সাথে খরচের ব্যাপারটাও তো আর ছেড়ে দেওয়া যায়না।
খাওয়া সেরে রাতে শুতে যাওয়ার আগে অন্যদিন বেশ গল্প চলে, কিন্তু সেদিন দুজনেরই মুখে কুলুপ। কেমন খাবার চেয়েছিলো আর কি পেলো। সব চেয়ে চিন্তার কারন হলো বাচ্চাটার শরীর নিয়ে।
এমন সময় মৌমিতা প্রস্তাবটা রাখলো দেবযানীকে “আমরা নিজে এরকম কিছু একটা করলে হয়না”
“কিরকম?” বলল দেবযানী
“মানে আমরা যদি একটা এরকম হোম ডেলিভেরী খুলি ?” জিজ্ঞাসা করল মোমিতা
“একদম, যেখানে বাঙালী রান্না মানে সত্যিই হাল্কা ঘরোয়া রান্না হবে” বলল দেবযানী।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্ল্যানটা বাস্তবায়িত করার জন্য বাড়ির সকল সদস্যকে আলোচনার জন্য ডাকা হলো। পরিবারের সবাই কিছু না কিছু কাজ ভাগ করে নিলো।.. বাধ সাধলো নাম
কি রাখা যায়? কোনও নামই আর পছন্দ হয় না, বাঙালী রান্না বলে কথা, নামেও বাঙালীয়ানা না থাকলে হয় .... কয়েকদিনের মধ্যেই কোথায় রান্না হবে, মেনুতে কি কি থাকবে আর দামটাও মানুষের সাধ্যের মধ্যে যেন হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হলো।
এমন ভাবেই একদিন টেলিভিসনের চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে পুরোনো কলকাতা নিয়ে একটা তথ্যচিত্র চোখে পড়ল মোমিতার। “সুতানুটি” নামটা বেশ কয়েকবার ভেসে এলো .....
“সুতা” অর্থাৎ সুতো আর “নুটি” অর্থাৎ গোলা। ব্রিটিশ আমলে এই “সুতানুটি” নামক সুতোর গোলার বাজার থেকেই জায়গার নাম হয়েছিলো “সুতানুটি”।
সঙ্গে সঙ্গে মোমিতার ও মাথায় খেললো নিজেদের হোম ডেলিভেরীর বাঙালীয়ানা বজায় রাখতে মানুষের সাথে যদি এমনই সুস্বাস্থকর রান্না দেওয়ার ভরসা, সময়নিষ্ঠার বিশ্বাস. এই ব্যস্ততার জীবনে মা এর হাতের তৈরী রান্নার স্বাদের আশ্বাস আর আন্তরিক ভালোবাসা মেশানো এক কাল্পনিক সুতো দিয়ে যদি বৃহত্তর পরিবার তৈরী করতে হয় তবে এই “সুতানুটি” নামটাই সঠিক।
সাথে সাথে দেবযানীকে ফোন লাগালো মৌমিতা
“হ্যালো, সুতানুটি নামটা কেমন?”
“সুতানুটি .. হমম বেশ ভালো ... নাঃ মানে খুব ভালো” উচ্ছসিত হয়ে বলে উঠল দেবযানী
“ওকে তবে এটাই ফাইনাল হোক” বলে ফোন রাখল মৌমিতা ....
এরপর দিন কাটছে, মৌমিতা আর দেবযানী দুজনেই এখন চরম ব্যাস্ত, একদিকে গ্রাহকদের মূহুর্মূহু ফোনে বিভিন্ন বাঙালী পদের আবদার, অন্যদিকে দক্ষতার সাথে সেই সমস্ত পদ তৈরী করা তারপর তাদের সুন্দর প্যাকেজিং করে সোজা হোম ডেলিভেরী। ......
ব্যস্ততার মধ্যেই আবার দেবযানীর ফোনটা বেজে উঠল । তুলে হ্যালো বলতেই ভেসে এলো অচেনা কন্ঠ ...
“ হ্যালো সুতানুটি, আমার চারটে লাঞ্চের অর্ডার আছে, প্লিজ মেনুটা লিখে নেবেন “ ....