18/08/2026
১৩১। অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি (Agroforestry) বা কৃষি-বনবিদ্যা।
ভারতীয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা অপরিসীম, কিন্তু সমসাময়িক জলবায়ু পরিবর্তন, জমির উর্বরতা হ্রাস এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি আজ বৃহৎ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জানলে অবাক হবেন আজো গ্রামীণ ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ দিনে দুবেলা মৌলিক নিরামিষ আহার জোগাড় করতে অক্ষম। পশ্চিমবঙ্গর মতো রাজ্যগুলিতে, যেখানে বেশিরভাগ পরিবার ক্ষুদ্র কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল, জমির উৎপাদন ক্ষমতা এবং পরিবারের প্রকৃত চাহিদার মধ্যকার ফারাকটি প্রতি ঋতুতেই অনুভূত হয়। এই সংকট উত্তরণে ঐতিহ্যগত চাষাবাদের বাইরে বেরিয়ে টেকসই বিকল্প হিসেবে অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি (Agroforestry) বা কৃষি-বনবিদ্যা আজ অতি প্রাসংগিক একটি বিষয়।
এই বিষয়ের সংজ্ঞাটি একটু বিস্তারিত বুঝে নেয়া দরকার। অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি বা কৃষি-বনবিদ্যা হলো একই জমিতে খাদ্য ফসলের পাশাপাশি গাছ লাগানোর চর্চাকে বলা হয়। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম সর্বাধিক সমাদৃত এবং নথিভুক্ত উপায় বলতে পারেন। প্রকাশিত নানা গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে যে, কৃষি-বনবিদ্যা ব্যবস্থা গ্রামীণ জনপদের খাদ্য নিরাপত্তাকে সুদৃঢ় করার পাশাপাশি নগদ অর্থ ও জীবনধারণের রসদ জুগিয়ে তাদের খাদ্য অনিশ্চয়তার ঝুঁকি কমায়। এটি আমাদের গ্রামিন সমাজ ব্যাবস্থায় সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে তা শুধু মাটির পুনরুদ্ধারই ঘটাবেন না, বরং একটি পরিবারের পুরো অর্থনৈতিক অবস্থাই বদলে যাবে।
এই বিষয়ে বাংলার পুরোনো ইতিহাস ঘাটলে দেখাযাবে আধুনিক কৃষি-বনবিদ্যার আদি রূপ হলো 'তাংয়া' পদ্ধতি, যা ব্রিটিশ আমলে প্রথম ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে তৎকালীন ব্রহ্মদেশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চালু হয়। ১৮৯৬ সালের দিকে এটি বাংলায় পরীক্ষামূলকভাবে আনা হলেও পরবর্তীতে ১৯০৮ সালের পর এটি পাকাপোক্তভাবে বন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় বিস্তার লাভ করে। আর এই পদ্ধতিতে নতুন বন সৃজনের প্রথম কয়েক বছর স্থানীয় কৃষকদের বনভূমিতে গাছ লাগানোর পাশাপাশি চাষবাস করার অনুমতি দেওয়া হতো।
স্বাধীন ভারতে ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। কৃষিজমির আইলে, খালের ধারে এবং পঞ্চায়েতের উর্বর বা পতিত জমিতে গাছ লাগানোর জন্য 'সামাজিক বনসৃজন' প্রকল্প চালু হয়। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুরের মতো দক্ষিণবঙ্গের রুক্ষ ও খরা-প্রবণ জেলাগুলোতে এই ধারা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিগত কয়েক দশকে এটি শুধু বন বিভাগে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যক্তিগত কৃষকদের জমিতে (ফার্ম ফরেস্ট্রি ও হোমস্টেড গার্ডেন হিসেবে) ছড়িয়ে পড়ে। সুন্দরবন বদ্বীপ অঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের সমভূমি পর্যন্ত কৃষকরা এখন ধান বা আলুর পাশাপাশি ইউক্যালিপটাস, সেগুন, মেহগনি, এবং বিভিন্ন ফলজ গাছ বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন।
ভারতের গ্রামীণ এলাকায় পুষ্টির অভাব একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে এবং খণ্ডিত হয়ে পড়ছে। ঐতিহ্যগতভাবে অনেক কৃষক কেবল একটি বা দুটি প্রধান ফসলের ওপর নির্ভর করে আজো জীবিকা নির্বাহ করেন। আবার দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির প্রাকৃতিক স্বাস্থ্য নষ্ট হয়েছে, যার ফলে ফসলের উৎপাদনশীলতা ক্রমান্বয়ে কমছে। যা একটি চিন্তাজানক বিষয় বা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিষয়ে কিছু সচেতন পদক্ষেপ নিলে কৃষি-বনবিদ্যা সফল হওয়া সম্ভব। যেমন - একই জমিতে পশু চারণ ভূমির সঙ্গে গাছপালা বা পশু খাদ্য উৎপাদনকারী গাছ লাগানো। কৃষিজমির আইলে বা মাঝে ফলমূল ও কাঠ উৎপাদনকারী গাছ এবং তার ফাঁকে শাকসবজি বা খাদ্যশস্য চাষ করা। বাড়ির আশপাশের জমিতে বিভিন্ন শাকসবজি, ফল ও ছোট গাছ একসঙ্গে পরিচর্যা করা, যা পরিবারের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা মেটাবে। শুধু ভাত বা চালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন ফল, বাদাম, এবং পুষ্টিকর শাকসবজি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা। এর ফলে গ্রামীণ পরিবারগুলো বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অপুষ্টি দূর করা সম্ভব হবে। বছরের যে সময়ে প্রধান ফসল ওঠে না, সেই সংকটময় সময়ে ফলের গাছ বা অন্যান্য বনজ উৎপাদন পরিবারগুলোর খাদ্যের জোগান দিতে সক্ষম হবে।
এত সুফল থাকা সত্ত্বেও বাস্তব সমস্যা এবং প্রসারে কিছু বাধা পরিলক্ষিত হয়। ফল বা কাঠ উৎপাদনকারী গাছ থেকে রিটার্ন পেতে দীর্ঘমেয়াদি সময় লাগে, যা দিনমজুর বা প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষেত্রে কঠিন হতে পারে। কোন মাটিতে কোন গাছের সঙ্গে কোন ফসল মানানসই, সে সম্পর্কে আজো সঠিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে চারা বিতরণ, আর্থিক প্রণোদনা এবং বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি জোরদার করলে এই বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব। ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পাওয়া নিশ্চিত করলে আখেরে আমাদের প্রান্তিক কৃষকেরই দুর্দশা ঘুচবে।
By -শেফ মনু।
(Please Follow, likes, shears and comments)