17/06/2026
৯৮। ক্যালদিলো দে কোংগ্রিও। (Caldillo de congrio)
চিলির দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং প্রশান্ত মহাসাগরের প্রাচুর্য দেশটির খাদ্যতালিকা নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে। চিলির মানুষ সমুদ্র সম্পদের ওপর ওতপ্রোতভাবে নির্ভরশীল। ক্যালদিলো দে কোংগ্রিও সেখানকার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে অভিজাত, সব শ্রেণীর মানুষের কাছেই জনপ্রিয়। খাবারটি মূলত সেখানে শীতের দিনে শরীর গরম রাখতে বা দীর্ঘ কর্মদিবসের ক্লান্তি দূর করতে এটি পুষ্টিকর এবং তৃপ্তিদায়ক খাবার হিসেবে বিশেষ পরিচিত। এই যা!! আপনাদের প্রথমেই বলতে ভুলে গেছি এই খাবারটি আসলে সেখানকার এক ধরনের স্যুপ। আর অন্য সব কথায় যাওয়ার আগে এই স্যুপের রেসিপি সমন্ধে একটু বলে নিই। যাতে মনে করলে আপনি বাড়িতে বানাতে পারেন।
প্রয়োজনীয় উপকরণ:
- ৫০০ গ্রাম কোংগ্রিও মাছ (বা যেকোনো সাদা সামুদ্রিক মাছ)
- মাছের মাথা ও কাঁটা ভালো স্বাদের জন্য স্টক তৈরিতে লাগবে
- ১ চা চামচ গ্রীন গোল মরিচ
- ১টি বড় পেঁয়াজ কুচি করা,
- ২-৩ কোয়া রসুন কুচি করা,
- ২ টি মাঝারি টমেটো কুচি করা,
- ১টি বড় গাজর গোল করে কাটা
- ২-৩টি মাঝারি আলু সেদ্ধ করা,
- ১/২ কাপ হেভি ক্রিম (ঘন দুধও ব্যবহার করা যায়),
- ২ টেবিল চামচ তেল বা মাখন,
- ধনেপাতা কুচি ও লবণ স্বাদমতো
রান্নার পদ্ধতি:
১.একটি পাত্রে মাছের মাথা, কাঁটা, গাজর, সামান্য লবণ এবং পরিমাণমতো জল দিয়ে ২০-২৫ মিনিট ফুটিয়ে ছেঁকে নিন এবং শুধু স্বচ্ছ স্টকটুকু আলাদা করে রাখুন।
২. অন্য একটি প্যানে তেল/মাখন গরম করে গ্রীন গোল মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও টমেটো হালকা লালচে হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। এরপর তাতে তৈরি করে রাখা মাছের স্টক টুকু ঢেলে দিন। স্টক ফুটে উঠলে এতে মাছের টুকরোগুলো দিয়ে মিনিট ১০ রান্না করুন। এরপর সেদ্ধ করে রাখা আলু ও ক্রিম মিশিয়ে দিন। মাছ ও সবজি ভালোভাবে মিশে গেলে নামানোর আগে প্রচুর ধনেপাতা কুচি ছিটিয়ে দিন। গরম গরম পরিবেশন করুন।
যাই হোক চিলির রাজনীতিতে কিন্তু এই স্যুপের একটি বিশেষ জায়গা রয়েছে। চিলির কমিউনিস্ট পার্টি ঐতিহাসিকভাবে প্রতি বছর গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের জন্য এই স্যুপের আয়োজন করে। আর চিলির সাহিত্যে এই খাবারের অমরত্বের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদা। পাবলো নেরুদাই সম্ভবত প্রথম আমাদের তার দেশকে নতুন ভাবে দেখার চক্ষুদান করেন। এই স্যুপ নিয়ে তার লেখা আস্ত এক কবিতা লেখেন, যার নাম - ওদা আল ক্যালদিলো দে কোংগ্রিও (Oda al Caldillo de Congrio) কবিতায় নেরুদা প্রথম শুরু করেন।
“In the storm-tossed
Chilean
sea
lives the rosy conger,”
আর শেষ পঙক্তিতে
“that in this dish
you may know heaven.”
এই কবিতায় তিনি স্যুপ তৈরির প্রক্রিয়াকে এক ধরণের রান্নার স্বর্গীয় জাদু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সামুদ্রিক মাছের রূপালী ত্বক, পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধ, টমেটোর রঙ এবং রান্নার সময় উপকরণের মিশ্রণকে এক অসাধারণ শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেন। তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন এই স্যুপ মাটির পাত্রে রান্না করলে এর আসল স্বাদ পাওয়া যায়।
১৯২৭ সালে নেরুদা যখন রেঙ্গুনে কূটনীতিক হিসেবে কাজ করেন, তখন তিনি রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করার প্রয়াস করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তাদের প্রথম সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে নেরুদা রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। তাদের সাক্ষাতের কথা নেরুদার নানা স্মৃতিচারনায় উল্লেখ করেছেন। নেরুদা তার ইসলা নেগ্রার বাড়িতে অতিথিদের আপ্যায়ন করতে খুব ভালোবাসতেন এবং সেখানে প্রায়ই ক্যালদিলো দে কোংগ্রিও রান্না হতো। তবে রবীন্দ্রনাথের সাথে তার সাক্ষাতের সময়গুলোতে খাবার নিয়ে এমন কোনো বিশেষ ব্যক্তিগত আখ্যান বা ভোজের আয়োজনের কথা ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায় না।
সমাপ্তিতে শুধু এটুকু বলা যেতেই পারে নেরুদা তার কবিতার মাধ্যমে চিলির সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ জীবনের ছোট ছোট বিষয় - যেমন এক বাটি গরম স্যুপ, মানুষের পরিশ্রমের সাথে গভীর ভাবে সংযোজিত। তার এই কবিতার কারণেই ক্যালদিলো দে কোংগ্রিও আজ চিলির জাতীয় গৌরবের প্রতীকে পরিণত।
By -শেফ মনু।
(Please Follow, likes, shears and comments)