10/06/2026
ক্ষমতার অলিন্দে যখন অন্ধ অহংকার বাসা বাঁধে, তখন শাসকেরা ভুলে যায় যে সময়ের চেয়ে বড় বলবান আর কেউ নেই। যারা একদিন ভিন্নমতকে স্তব্ধ করতে রাষ্ট্রশক্তি বা পেশ পেশির জোরে মুখ বন্ধ রাখার ফতোয়া জারি করেছিল, আজ ইতিহাসের এক অদ্ভুত নিয়তিতে তারা নিজেরাই বাক্যহারা। এই নীরবতা কোনো কৌশল নয়, এ হলো নৈতিক দেউলিয়াপনার চরম বহিঃপ্রকাশ।
একটি সমাজের মানুষের ভেতর কতটা পুঞ্জীভূত অপমান জমা হলে, বহু বছরের চেনা 'মাননীয়' সম্বোধনটা এক রাতের ঝড়ে ধূলিসাৎ হয়ে ‘তুইতুকারি’র ক্রোধে পরিণত হয়, তা আজ স্পষ্ট। রাজপথে আজ কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষের তাড়া খাচ্ছেন সদ্য প্রাক্তনরা। কোথাও ধেয়ে আসছে ডিম, কোথাও আবার একদা দাপিয়ে বেড়ানো জনপ্রতিনিধিদের প্রকাশ্য রাস্তায় মাথা নিচু করে গণ-আদালতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এগুলো কোনো পরিকল্পিত আন্দোলন নয়, এ হলো দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সাধারণ মানুষের এক চরম সামাজিক প্রতিক্রিয়া।
এই বারুদের স্তূপে আগুন লেগেছে দীর্ঘদিনের কিছু ক্ষত থেকে
যোগ্য যুবকদের মেধা যখন সর্ষের তেলের মতো খোলা বাজারে বিক্রি হয়ে যায়, সমাজ তখন বিচার চেয়ে গুমরে মরে। যখন কোনো নির্মম নারী নির্যাতনের ঘটনাকে স্রেফ একটা 'ছোট্ট দুর্ঘটনা' বলে লঘু করার ধৃষ্টতা দেখানো হয়, তখন সাধারণ মানুষের ঘরের মা-বোনেদের বিবেক কেঁদে ওঠে। একদিকে যখন সৎ কর্মচারীরা তাদের হকের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, আর অন্যদিকে খোদ পাড়ার বুথ স্তরের নেতার ঘরেও যখন কোটি টাকার পাহাড় বা ত্রাণের সামগ্রী লুকানো থাকে—তখন খেটে খাওয়া মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। একজন সাধারণ ছোট ব্যবসায়ীও আজ বুক ঠুকে বলতে পারেন যে, দুর্নীতির এই শিকড় কতটা গভীরে ঢুকে গিয়েছিল।
সবচেয়ে বড় বিস্ময় লুকিয়ে আছে এই পতনের পরের স্তব্ধতায়। যে দলটা গতকাল পর্যন্ত রাজ্যের প্রতিটা মোড়ে নিজেদের একাধিপত্য কায়েম করে রেখেছিল, আজ তাদের কোনো এক শীর্ষ নেতার লাঞ্ছনার পরও রাজপথ সম্পূর্ণ জনশূন্য। কোনো পাল্টা মিছিল নেই, কোনো প্রতিরোধ নেই। অথচ, নামমাত্র শক্তি অবশিষ্ট থাকা বিরোধী দলগুলোকেও আজ মানুষের অধিকার রক্ষায় বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে দেখা যাচ্ছে।
এই সদ্য ক্ষমতাচ্যুতরা আজ কেন এমন দিশেহারা? কেন তাদের শীর্ষ থেকে তলানি পর্যন্ত সবাই আজ অদৃশ্য?
আসলে, প্রতিবাদের জন্য একটা ন্যুনতম নৈতিক ভরসার প্রয়োজন হয়। যখন নিজেদের তৈরি করা আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সাহসটুকু হারিয়ে যায়, তখন মুখের ভাষাও কেড়ে নেয় প্রকৃতি। অতীতে বহু রাজনৈতিক চাণক্যই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, আদর্শহীন এই ক্ষমতার ইমারত ভাঙলে তা তাসের ঘরের মতো মিলিয়ে যাবে। আজ যেন সেটাই বাস্তব। মহানগরের সর্বোচ্চ পুর-প্রশাসক থেকে শুরু করে সাংসদ-বিধায়কদের একাংশ আজ হয় পদত্যাগের আড়ালে মুখ লুকাচ্ছেন, নয়তো দল ছাড়ার পথ খুঁজছেন।
প্রতিদিন সকালের খবরের কাগজ কিংবা সামাজিক মাধ্যমের পাতা ওল্টালেই যে সমস্ত কীর্তিকলাপের খতিয়ান সামনে আসছে, তা দেখে সাধারণ নাগরিক আজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। পাড়ার চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে আজ মানুষ বলছেন, 'সময়মতো এই পরিবর্তনটা না এলে, হয়তো এই সমাজের মেরুদণ্ডটাই চিরতরে ভেঙে যেত।'
ইতিহাস সাক্ষী, যারা একদিন অন্যের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিল, আজ তারা নিজেরাই নিজেদের পাপের বোঝায় নির্বাক, নিস্তব্ধ এবং পথহারা।
অজয় মজুমদার।